বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

হোসেনি দালানে মধ্যরাতে শিয়াদের সমাবেশে বিস্ফোরণ: নিহত ১

Huseni-Dalan

রাজধানী ঢাকার পুরান শহরে নাজিমউদ্দিন রোডে হোসেনি দালানের সামনে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তিনটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। বিস্ফোরণে একজন মারা গেছেন এবং আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাাতালে ভর্তি হয়েছেন অর্ধশত মানুষ। ঘটনার সময় ওই এলাকায় ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ ছিলেন বলে প্রত্যক্ষ্যদর্শীরা জানিয়েছে। আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলাচালে শুক্রবার রাত ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে হোসেনী দালান চত্বরে পরপর তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে বলে চকবাজার থানার ওসি আজিজ আহমেদ জানিয়েছেন। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০/১২ বছরের একটি ছেলের মৃত্যু হয়।

তিনি বলেন, “তাজিয়া মিছিলের জন্য শিয়া মতাবলম্বীরা হোসেনী দালানে সমবেত হলে বিস্ফোরণগুলো ঘটে।”

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল হাসান বলেছেন, “ককটেল জাতীয় হাতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এগুলো বাইরে থেকে ছুড়ে মারা হয়েছে বলে আমাদের ধারণা।”

বিস্ফোরণে আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালসহ আশপাশের ক্লিনিকে নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০/১২ বছরের একটি ছেলের মৃত্যু হয় বলে মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক জানান। ঢাকা মেডিকেলে আহত ৪৪ জনকে ভর্তি করা হয়েছে বলে পরিদর্শক মোজাম্মেল জানান।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে এসে ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজি মোহাম্মদ সেলিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘হোসেনি দালান এলাকায় কখনো এরকম ঘটনা ঘটেনি। দুইজন বিদেশিকে হত্যা করে যেমন অস্থিরতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তেমনি বোমা মেরে অস্থিরতা সৃষ্টি করার জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। যেন দেশের মানুষ অস্বস্তিতে ভুগে।’ পরে তিনি আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান।

এদিকে মিটফোর্ড হাসপাতালে আহত ৩১ জনকে নেওয়া হয় বলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মাসুদুর রহমান জানান। তিনি বলেন, “অন্য আহতদের মধ্যে কারও অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়। তবে তিন জনের বেশ জখম হয়েছে।”

আহতদের অনেকে মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ফিরে গেছেন বলে চকবাজার থানার ওসি জানিয়েছেন।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেনের (রা.) শহীদ দিবস আরবি মহররমমাসের ১০ তারিখকে ত্যাগ ও শোকের প্রতীক হিসেবে পালন করেন শিয়া মতাবলম্বীরা। সপ্তম শতকে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে শহীদ হন ইমাম হোসেন।

দিবসটি উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো শনিবার ভোররাতে তাজিয়া মিছিলের জন্য হোসেনী দালানে সমবেত হন শিয়া মতাবলম্বীরা।

এ সময় সেখানে ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ ছিলেন বলে ফিরোজ হোসেন নামে তাদের এক নেতা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “মিছিল শুরুর আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা হোসেনী দালানের চারপাশ পরিদর্শন করেন। এর পরপর বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।”

বিস্ফোরণের পরেও হোসেনী দালান চত্বর থেকে টেপে মোড়ানো বোমা সদৃস দুই/তিনটি বস্তু পুলিশ নিয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

হোসেনী দালান ছাড়াও রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মগবাজার ও পল্টন থেকেও তাজিয়া মিছিল বের করেন শিয়া মতাবলম্বীরা।

শনিবার পবিত্র আশুরা। কারবালার শোকাবহ ঘটনাবহুল এদিন মুসলমানদের কাছে ধর্মীয়ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দিনটি মুসলিম বিশ্বে ত্যাগ ও শোকের প্রতীকের পাশাপাশি বিশেষ পবিত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

পবিত্র আশুরা উপলক্ষে শোক মিছিল, মর্সিয়া, জিকির-আসকার ও বয়ানসহ নানা আচার-অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে পুরনো ঢাকার হোসেনি দালানের ইমামবাড়ায়। আয়োজকরা জানান, ১০ মহররম মানবজাতি তথা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য অনেক ইতিহাস-ঐতিহ্য বহন করে।

তবে কারবালা প্রান্তরে ইমাম হোসেনের সপরিবারে শহীদ হওয়ার ঘটনাটি হৃদয় বিদারক। সেই শোকাবহ স্মৃতিকে স্মরণ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তারা।

প্রতিবছরের মত এবারও ১০ই মহররমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শোক মিছিলের আয়োজনকে ঘিরে প্রস্তুতি চলছে হোসেনি দালানে। কারবালা প্রান্তরের শোকাবহ স্মৃতির স্মরণে মিছিলটিতে থাকে বিভিন্ন প্রতীকী উপস্থাপনা। ধর্মীয় বাণী লেখা পতাকা, অংশগ্রহণকারীদের গায়ে বিশেষ পোশাক আর তলোয়ার-খঞ্জরসহ নানা উপকরণ। তাজিয়া ও ঘোড়া এ মিছিলের অন্যতম উপকরণ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিবছরই আশুরাকে কেন্দ্র করে চল্লিশ দিনের বিশেষ কর্মসূচি থাকে। এসময়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুধু মুসলমানরাই নন, ভিন্ন ধর্মের মানুষও আসেন চকবাজারের এ ইমামবাড়ায়। মহররম মাসে মূলত মানত পূরণ করতেই বেশি মানুষের সমাগম ঘটে।

আয়োজকদের দাবি, বিপুল সংখ্যক মানুষের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থারও আয়োজন করেছেন তারা। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, পল্টনসহ আরও কয়েকটি স্থানে শোক মিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবারও কয়েকটি সড়কে দেখা গেছে এরই মহড়া।

আরও পড়ুন