বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিজ্ঞাপনে অংশ নিতে মমতাকে আদালতের নিষেধাজ্ঞা

mamata-ad-295x200আগামী বছরের মে মাসের দিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন। প্রচারণার জন্য মমতা বন্দোপাধ্যায় ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেস কিছু বিজ্ঞাপন তৈরি করতে চেয়েছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞাপনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। রাজ্য তাই বিজ্ঞাপনে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ছাপতে দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। কিন্তু লাভ হল না তাতে। কেন্দ্রীয় সরকার মাঝপথে এই মামলায় ঢুকে পড়ায় ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়েছে শুনানি। ফলে আরও মাস আড়াই রাজ্য সরকারের বিজ্ঞাপনে মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ছাপার কোনও সুযোগই নেই। আর এর
পরে ভোটের ঘোষণা হয়ে গেলে নির্বাচনী আচরণবিধির লাগামে বাঁধা পড়বে সরকার।

সরকারি বিজ্ঞাপনে নেতা-মন্ত্রীদের ছবি দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ মেটানোর বিরুদ্ধে জনস্বার্থ মামলা করেছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। তারই সূত্রে সুপ্রিম কোর্ট গত মে মাসে রায় দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি ছাড়া আর কারও ছবি ব্যবহার করা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গ, অসম, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও কর্নাটকের মতো অ-বিজেপি রাজ্য সরকার রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়।

তারই শুনানিতে আজ সব রাজ্যের বক্তব্য শোনার কথা ছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল রোহতগি জানান, তাঁরাও এই রায়ের পুনর্বিবেচনা চাইছেন। গত কালই কেন্দ্র এ বিষয়ে আর্জি জমা দিয়েছেন। বিচারপতি

রঞ্জন গগৈয়ের বেঞ্চ জানায়, কেন্দ্রের বক্তব্য খতিয়ে দেখে পরের শুনানি হবে ১২ জানুয়ারি।

এতেই বিপাকে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। হতাশ রাজ্যের আইনমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। আদালতের খবর শুনেই ফোনে তিনি রাজ্য সরকারের আইনজীবী কপিল সিব্বলের সঙ্গে কথা বলেন। ফের আদালতে আর্জি জানানো যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হয়। কিন্তু সিব্বল তাঁকে জানান, আপাতত আর কিছু করার নেই। তৃণমূলের নেতারা প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ঘরোয়া আলোচনায় কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকারকেই দুষছেন এর জন্য। তাঁদের মতে, এমন বন্ধু পেলে আর শত্রুর দরকার কী!

শুনানির পরে রাজ্যের আইনজীবী কবীরশঙ্কর বোস বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকার এত দিন পরে সবেমাত্র গত কালই রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জমা দিয়েছে। এর ফলেই গোটা বিষয়টি পিছিয়ে গেল।’’ সরকারি কর্তাদের একটি অংশ অবশ্য এর মধ্যে রাজ্যের মঙ্গলই দেখছেন। কারণ, নেতা-মন্ত্রী, মায় মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ছাপা বন্ধ থাকায়, বিজ্ঞাপনের ব্যয়বহরও কমে এসেছে। আর্থিক সঙ্কটে ভোগা রাজ্যের সাশ্রয়ই হচ্ছে এতে।

মোদী সরকার অবশ্য এই মামলায় ঢুকেছে নিজেদের রাজনৈতিক দায় থেকে। অ্যাটর্নি জেনারেল রোহতগি আদালতে জানিয়েছেন, রাজ্যগুলির বক্তব্যকে কেন্দ্রও সমর্থন করছে। তবে সরকারির সূত্রের খবর, মমতা, জয়ললিতা, অখিলেশ যাদব, নবীন পট্টনায়কের মতো বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীরাও রাজ্যের বিজ্ঞাপনে তাঁদের ছবি রাখতে চাইছেন। ছত্তীসগঢ় বা মধ্যপ্রদেশের বিজ্ঞাপনে আগে রমন সিংহ বা শিবরাজ সিংহ চৌহানের বড় বড় ছবি থাকত। মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর সেই ছবি-সহ বিজ্ঞাপন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আজ পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের আইনজীবী হিসেবে সিব্বল যুক্তি দিয়েছেন, কেন্দ্রে যেমন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত সরকারের প্রধান, রাজ্যের নির্বাচিত সরকারের প্রধান মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর ছবি থাকলে, মুখ্যমন্ত্রীর ছবিতে আপত্তি কোথায়? কার্যত সেই বক্তব্যকেই সমর্থন জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

আদালত পরের শুনানির দিন জানিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও পরের শুনানি পর্যন্ত রাজ্যের জন্য সুরাহা আদায়ের একটা শেষ চেষ্টা চালান সিব্বল। তিনি আর্জি জানান, জানুয়ারির এখনও অনেক দেরি। পরের শুনানি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে। তাই রাজ্যকেও মুখ্যমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারের সুবিধা দেওয়া হোক। কিন্তু বিচারপতি গগৈ জানান, আপাত ভাবে ১২ জানুয়ারির অনেক দেরি বলে মনে হলেও আসলে আর ৩০টি কাজের দিন বাকি।

কেন্দ্র ও রাজ্যের পাশাপাশি শীর্ষ আদালতে যে বেসরকারি সংগঠন মূল জনস্বার্থ মামলাটি করেছিল, তার আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কিছুটা বদল চাইছেন। তাঁদের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহারও বন্ধ করা হোক। ভূষণ আজ এজলাসে যুক্তি দেন, সরকার নিজের নীতি ও প্রকল্প বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের অর্ধেক জুড়ে থাকছে প্রধানমন্ত্রীর ছবি। শীর্ষ আদালতের রায়েরও অবমাননা হচ্ছে। অভিযোগ জানানোর জন্য সংস্থা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তা-ও এখনও পালন হয়নি। এখন কেন্দ্রও রায় পুনর্বিবেচনার আর্জি জমা দিয়েছে। যত দিন এই স্থিতাবস্থা বজায় থাকবে, তত দিন কেন্দ্রেরই লাভ। কারণ বিজ্ঞাপনে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ছবিই দেখা যাচ্ছে।

আরও পড়ুন