পেটে খিদে মুখে লাজ! নয়াদিল্লিতে গত তিন দিন ধরে নরেন্দ্র মোদী সরকারের আতিথ্যে আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় সমস্ত শীর্ষনেতার এখন এটাই হাল। তৃতীয় ভারত-আফ্রিকা সম্মেলনে যোগ দিতে আসা আফ্রিকার ৫৪টি দেশের মন্ত্রী, বাণিজ্য কর্তা, সাংবাদিকেরাও ভুগছেন এই রসনা অতৃপ্তিতে! কেন?
মাছ, মুর্গি, মটন থাকলেও, নয়াদিল্লির মধ্যাহ্নভোজ এবং নৈশাহারে কোথায় সেই কাঙ্খিত বিফ স্টেক, রোস্ট আর কারি? বরং স্থানীয় সংবাদপত্রের প্রথম পাতা পড়ে রীতিমতো ছ্যাঁকা খাচ্ছেন তিউনিশিয়া, সোমালিয়া, মরক্কো, লিবিয়া-সহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলির নেতা-মন্ত্রীরা। সে সব দেশের কোথাও ৬০ শতাংশ, কোথাও বা ৮০ শতাংশ মানুষই গো-মাংসভোজী। তাঁদের প্রিয় খাদ্য নিয়ে ভারতে রাজনীতি ও হিংসা যেন কিছুটা অবাক করেছে প্রতিনিধিদের। ঘরোয়া ভাবে সে কথা জানাচ্ছেনও তাঁরা।
৭০০ জন সাংবাদিক এবং ২ হাজারের উপর প্রতিনিধি আফ্রিকা থেকে নয়াদিল্লি এসেছেন। গত কাল দুপুরে মরক্কোর এক দল সাংবাদিককে নিয়ে দিল্লির একটি নামজাদা রেস্তোরাঁতে খেতে গিয়েছিলেন বিদেশ মন্ত্রকের কিছু কর্তা। সূত্রের খবর, খেতে বসে আফ্রিকার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা ‘আমিষ’ খাবার চান। বিস্মিত হন ভারতীয় কর্তারা, কারণ টেবিল থেকে তখন ছড়িয়ে পড়ছে চিকেন কারি আর মটন কোর্মার গন্ধ! কিন্তু তাতে কী! এ সব নয়, গোমাংসকেই যে আমিষ বলে মনে করেন ওই সাংবাদিকরা। বঙ্গসন্তানের কাছে যেমন মাছ-ভাত, তেমনই বিফ স্টু ওঁদের প্রিয়তম খাদ্যধর্ম।
সাধারণ ভাবে কূটনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল খাদ্য। আম থেকে ইলিশ—অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে ভারতীয় কূটনীতির সঙ্গে। নেহরুর আমল থেকে আজ পর্যন্ত— বিদেশ থেকে কূটনীতিকরা এলে তাঁদের খাবারের আয়োজন করতে গিয়ে সব সময়েই প্লেটে সে দেশের জনপ্রিয় কোনও পদ তুলে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। একই ভাবে ভারতীয় রাষ্ট্রনেতারা বিদেশে গেলেও, সেখানকার আপ্যায়নের তালিকায় সাধারণ ভাবে রাখা থাকে পনির বা নবরত্ন পোলাওয়ের মতো এ দেশের কোনও জনপ্রিয় খাবার। মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর যখন যে দেশেই গিয়েছেন, সে মরিশাসই হোক বা বাংলাদেশ—হাজির থেকেছে তাঁর পছন্দসই গুজরাতি নিরামিষ পদ।
এটা ঘটনা যে কূটনৈতিক আপ্যায়নের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের নৈশাহারের তালিকায় আগেও গোমাংস বাদই থেকেছে। তবে সাউথ ব্লকের সূত্র জানাচ্ছে, এ বারের সঙ্গে অন্য বারের তফাত রয়েছে। সেটি হল, সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভোজসভাগুলি ছাড়া সফররত আমলা, সাংবাদিক অথবা অন্য প্রতিনিধিদের খাওয়াদাওয়ার যে সরকারি ব্যবস্থা করা হতো, সেখানে তাঁদের দেশের পছন্দসই খাবারের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকত না। কিন্তু এ বার খাদ্য তালিকা থেকেই সরকারি ভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে গোমাংস।
ভারত-আফ্রিকা মহাসম্মেলনটি শুরুর ঠিক আগেই আফ্রিকার বাণিজ্য মন্ত্রীদের সম্মানে একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আসা নির্মলা আফ্রিকার মন্ত্রীদের জন্য যে দু’টি আমিষ পদ রেখেছিলেন, তা হল নারকোল বাটা দিয়ে ভেটকি পাতুরি এবং চিকেন চেট্টিনাট! সেই সঙ্গে ছিল গুজরাতি কারি ও অন্তত দশ রকম নিরামিষ পদ! সৌজন্যবশত মুখে কিছু বলতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু সূত্র জানাচ্ছে, সে দিন থেকে খিদে নিয়ে রাতে শুতে যেতে হচ্ছে আফ্রিকার কর্তাব্যক্তিদের!-আনন্দবাজার।


