গত ছয় মাসে সারা দেশে জাতীয় পার্টির যে কয়টি জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে সেসবের বেশিরভাগই পকেট কমিটি। টাকার বিনিময়ে গঠন করা হয়েছে এসব কমিটি। এক্ষেত্রে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মতামতের কোন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। জেলা পর্যায়ের নেতারা পার্টি চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইলেও ২-৩জন কেন্দ্রীয় নেতার কারণে তারা তা পারছেন না। সারা দেশের যেখানেই সম্মেলন হচ্ছে সেখানে অংশ নিচ্ছেন ওই ২-৩জন কেন্দ্রীয় নেতা। অন্য নেতাদের বিষয়টি জানানো হচ্ছে না।
জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এসব অভিযোগ তুলেছেন। তাদেরই একজন পার্টির যুগ্মমহাসচিব ইকবাল হোসেন রাজু। এরই মধ্যে তিনি দলের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁডিয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি পার্টির মহা-সচিবকে জানিয়ে দিয়েছেন, যতদিন এইচ এম এরশাদ বেঁচে আছেন তিনি ততদিন তিনি জাতীয় পার্টিতে থাকবেন। কিন্তু আজ থেকে আমি আর জাতীয় পার্টির যুগ্মমহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করবো না। আশা কবি বিষয়টি আপনি দলীয় চেয়ারম্যানকে জানিয়ে দেবেন। এতে অন্তত: নিজের কাছে অপমাণিত হবো না।
এ বিষয়ে জানতে চাইল ইকবাল হোসেন রাজু জানান, টাকার বিনিময়ে পকেট কমিটি গঠন, তৃণমূল নেতাদের গুরুত্ব না দেয়া, সিনিয়রদের বাদ দিয়ে জুনিয়রদের পদোন্নতি দেয়া এবং বেশিরভাগ কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব পালন করতে না দেয়াসহ নানা অভিযোগে ২-৩দিন আগে দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর সঙ্গে আমার বাকবিতণ্ডা ঘটে। এরই জের ধরে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছি। তিনি বলেন, দলে পদ আছে। দায়িত্ব পালন করতে পারছি না। এর চেয়ে দু:খজনক আর কী হতে পারে। তিনি বলেন, কেবল আমি একা নই। আরও অনেকের এই অবস্থা। ২-৩জন ব্যক্তি দলীয় চেয়ারম্যানকেও জিম্মি করে রেখেছে।
পার্টি সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগর জাপার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য সোলায়মান আলম শেঠ। কিন্তু জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু জাপার মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর ওই কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর মেহজাবিন মোর্শেদকে সভাপতি করে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়।
এ বিষয়ে সোলায়মান আলম শেঠ বলেন, আস্তে আস্তে পার্টিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। এরশাদ সাহেব পার্টির পিতা। পিতার সামনে কেউ যদি সন্তানকে হত্যা করে, আর পিতা যদি কিছু না করেন, তাহলে আমাদের কী করার আছে? তার অভিযোগ কেবল টাকার বিনিময়ে মেহজাবিনকে সভাপতি বানানো হয়েছে। গত ৮ জুন বরিশাল মহানগর জাপার সম্মেলনেও দলের একটি বড় অংশকে বাদ দিয়ে সম্মেলন করে জাপার শীর্ষ নেতৃত্ব। নতুন কমিটির ঘোষিত সভাপতি মুরতজা আবেদিন। তবে এখন পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য নেতাদের নাম ঘোষণা হয়নি। জাতীয় পার্টির ওই নতুন সভাপতিকে মেনে নেয়নি মহানগর জাপার আগের কমিটির নেতারা।
বরিশাল মহানগর জাপার সদ্য সাবেক সভাপতি মহসীনুল আলম হাবুল বলেন, আমিই বরিশাল মহানগর জাপার সভাপতি। আর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোরশেদ চুন্নু। আমাদের না জানিয়ে একটি ক্ষুদ্র অংশকে নিয়ে সম্মেলন করা হয়েছে। কিন্তু তারা কমিটি গঠন করতে পারেনি। শুনেছি টাকার বিনিময়ে কেবল একজনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
গত বছর ১ সেপ্টেম্বর রাজশাহী মহানগর জাপার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে এরশাদ সম্মেলনস্থল ত্যাগ করেন। পরে ঢাকা থেকে কমিটি ঘোষণা করা হয়। রাজশাহী জেলা জাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দীন বাচ্চু বলেন, রাজশাহী জাপার দুরবস্থা দেখে আমাদের কষ্ট হয়। এখন রাজশাহীতে জাপা বলতে কিছু নেই। দুই-একজন কেন্দ্রীয় নেতা তাদের হাতকে শক্তিশালী করতেই পকেট কমিটি গঠন করছেন।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের বলেন, আমার কাছেও টাকার বিনিময়ে পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ এসেছে। কোনো কোনো অভিযোগ সত্য বলেও মনে হচ্ছে। যেভাবে কাউন্সিল করা হচ্ছে এমন করে কাউন্সিলর হয় না। অতীতে কখনই এমন প্রশ্ন আসত না। সাবেক মন্ত্রী জিএম কাদের বলেন, আগে কাউন্সিলে ইলেকশনের মাধ্যমে কমিটি করা হতো। এখন তো সিলেকশন হচ্ছে। পার্টির বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে এখন জনমনে প্রশ্ন উঠছে। জনগণ জাপাকে স্বাভাবিক পার্টি মনে করছে না।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, কমিটি নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা ভিত্তিহীন। সবার মতামতের ভিত্তিতে কাউন্সিলরদের ভোটে সম্মেলনের মাধ্যমে নেতা নির্বাচন করা হচ্ছে। সূত্র মতে, গত ছয় মাসে সারা দেশে জাতীয় পার্টির ২০-২৫টি জেলায় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম
–


