হলমার্ক কেলেংকারিতে অভিযুক্ত সোনালী ব্যাংকের ৪১ কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই কাণ্ডে অভিযুক্ত থাকা ১৫ জনকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে অবসরে যাওয়া ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চার্জশিট থেকে বাদ পড়েন আরও ৭ জন। বিভাগীয় ব্যবস্থায় অভিযুক্ত না হওয়া ১০ কর্মকর্তাকে ছাড় দেয়া হয়। তবে এই দুর্নীতির ঘটনায় দুদকের চার্জশিটে ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সম্প্রতি হলমার্ক কেলেংকারির ঘটনায় পাঁচটি বিষয়ে জানতে চেয়ে সোনালী ব্যাংককে চিঠি দেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদন অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেয় সোনালী ব্যাংক। পাঁচটি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- এ পর্যন্ত কতজন ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে দুদক অব্যাহতি দিয়েছে। চার্জশিট দেয়া হয় কতজনের বিরুদ্ধে। বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কাদের বিরুদ্ধে। অভিযুক্তের পরও কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়নি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে নামসহ তালিকা। প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পাঠানো সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও প্রদীপ কুমার দত্ত স্বাক্ষরিত ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সোনালী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার আনম মাসরুরুল হুদা, প্রধান কার্যালয়ের ম্যানেজার সাবিতা সিরাজ (অবসরপ্রাপ্ত), কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের ডিজিএম ভগবতী মজুমদার, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, এজিএম খুরশীদ আলম, কেন্দ্রীয় হিসাব বিভাগের এজিএম আবুল হাসান ও এজিএম আশরাফ আলী পাটোয়ারীকে দুদকের চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়, অবসরে চলে যাওয়া ৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। তারা হলেন- জিএম মাহবুবুল হক, আলী হোসেন খান, নওশের আলী খোন্দকার, সাবিতা সিরাজ, ডিজিএম আবু মুছা, ডিজিএম বেগম শামীম আক্তার ও সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার কে ডব্লিউ শাহিদা খানম।
জানা গেছে, হলমার্ক ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণসাপেক্ষে ১০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা ছাড়াই ওই ১০ কর্মকর্তাকে কঠোর সর্তক করা হয়। এসব কর্মকর্তা হচ্ছেন- ডিএমডি আতিকুর রহমান, জিএম আনম মাসরুরুল হুদা, ডিজিএম কানিজ ফাতেমা চৌধুরী, ডিজিএম শওকত আলী, এসএইচএস আবু জাফর, এজিএম খুরশীদ আলম, এজিএম আশরাফ আলী পাটোয়ারী, এক্সিকিউটিভ অফিসার শরিফুল ইসলাম, একরামুল হক মণ্ডল ও উকিল উদ্দীন আহমেদ।
সোনালী ব্যাংক থেকে এ ব্যাপারে বলা হয়, চার্জশিটভুক্তদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তমূলে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাদের কোনো শাস্তি দেয়া হয়নি। তবে ভবিষতে আরও সতর্কতার সঙ্গে কাজ করার জন্য সতর্ক করে চার্জশিট মীমাংসা করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়, তালিকার ৬ জনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে কারণে তাদের শাস্তি দেয়া হয়নি। ভবিষতে অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে অভিযোগ থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়।
জানা গেছে, হলমার্ক ঘটনায় ফাংশনাল অডিটে ৩২ জন কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে- এ প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংক বলেছে, দায়ীদের মধ্যে ৭ জন অবসরে চলে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। সাবেক ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও হুমায়ূন কবীর চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ বিধায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া ব্যাংকের এখতিয়ারবহির্ভূত। এছাড়া সাবেক ডিএমডি আতিকুর রহমান ও মাইনুল হকের বিরুদ্ধে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ব্যবস্থা নিয়েছে।
অবশিষ্ট ২২ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়। এরমধ্যে ১৫ জনকে তিরস্কার ও আর্থিক জরিমানা করে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। এরা হচ্ছেন- এজিএম এজাজ আহমেদ, কামরুল হোসেন খান, ডিজিএম নেছার আহমেদ চৌধুরী, এজিএম আশরাফ আলী পাটোয়ারী, সিনিয়র অফিসার উজ্জল কিশোর ধর, তুষার কান্তি দাস, বেগম জেসমিন নাহার, মিহির চন্দ্র মজুমদার, অফিসার উকিল উদ্দিন আহমেদ, জুনিয়র অফিসার সাইদুর রহমান মিয়া, এজিএম গোলাম নবী মল্লিক, মোখলেছুর রহমান, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার সোহরাব হোসেন ও একরামুল হক মণ্ডল।
হলমার্ক কেলেংকারিতে যে ১৪ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এসব কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন- সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সিইও মো. হুমায়ূন কবীর, ডিএমডি আতিকুর রহমান, মাইনুল হক, জিএম ননী গোপাল নাথ, মীর মহিদুর রহমান, ডিজিএম একেএম আজিজুর রহমান, শেখ আলতাফ হোসেন, সফীজ উদ্দিন আহমেদ, এজিএম এজাজ আহমেদ, সাইফুল হাসান, কামরুল হোসেন খান, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার মেহেরুন্নেছা মেরী, এক্সিকিউটিভ অফিসার মোহাম্মদ আবদুল মতিন ও সিনিয়র অফিসার ওয়াহিদুজ্জামান।
সোনালী ব্যাংকের হোটেল শেরাটন শাখা থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় হলমার্ক গ্রুপ। এরমধ্যে ১ হাজার ৭০৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা ফান্ডেড দায় এবং ৮৪৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা নন-ফান্ডেড দায়। এদিকে হলমার্কের মোট সম্পত্তির মূল্য হচ্ছে ১ হাজার ১৭০ কোটি টাকা- যা সোনালী ব্যাংক নিরূপণ করেছে। কিন্তু হলমার্কের পক্ষ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সম্পত্তির মূল্য দেখানো হয়- যা দেখিয়ে ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয়া হয় বিপুল অংকের টাকা।


