গায়ে অচেনা হাত পড়লেই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতে ডাকতে উদ্যত হয় পোষা জীব। কিন্তু ‘হাম্বা’ বা ‘ম্যা’ করে ওঠার আগেই তাদের মুখ খুলিয়ে জিভ টেনে লাগিয়ে দেওয়া হয় সর্ষের তেল আর নুনের মিশেল। বন্ধ হয়ে যায় ডাকাডাকি। এই মিশেলের দৌলতেই দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় এখন রমরমা গরু-ছাগল চোরেদের। গত এক বছরে জেলার ৪৫টি থানায় অন্তত দেড় হাজার গরু চুরির অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগ না হলেও পুলিশ সূত্রের দাবি, চুরি যাওয়া ছাগলের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। বাধ্য হয়েই আগে ধরা পড়া গরু-চোরদের নতুন করে জেরা করতে শুরু করেছে জেলা পুলিশ।
বছর তিনেক আগে মগরাহাট থানা এলাকায় গরু পাচার করার সময়ে দলবল-সহ পুরনো দুষ্কৃতী শেখ আসগর বমাল ধরা পড়েছিল। জেলা পুলিশের এক কর্তার দাবি, সম্প্রতি জেলায় গরু-ছাগল চুরির অভিযোগ বাড়তে শুরু করায় সূত্রের সন্ধান পেতে আসগরের সঙ্গীদের ফের জেরা করা হয়। জানা যায়, সপ্তাহে পাঁচ থেকে সাতটি ছাগল ও পাঁচটি গরু চুরি করতে পারলেই দুষ্কৃতীদের কেল্লাফতে। বাজারে একটি ছাগল তিন-পাঁচ হাজার টাকা, আর গরু ১৫-২০ হাজার টাকায় বিকোয়। চোরাই গরু ১০-১২ হাজার, ছাগল দেড়-দুহাজার টাকায় বেচে দিতে পারলে মাসে প্রায় লাখ তিনেক টাকা রোজগার করতে পারে জনা পাঁচেকের দল। বড় কোনও ঝুঁকি ছাড়া মাসে গড়ে ৬০,০০০ টাকা রোজগারের আশাতেই এ ধরনের চুরি বাড়ছে।
চুরির সংখ্যা বাড়ার কারণ জানার পাশাপাশি চুরির পদ্ধতিও বিশদে জেনেছে পুলিশ। জানা গিয়েছে, ছাগল চুরি হয় দিনের বেলায়। মাঠঘাট থেকে। এসইউভি গোত্রের বড় গাড়ি ভাড়া নিয়ে মওকা বুঝে দাঁড় করিয়ে গোটা তিনেক ছাগলকে টপাটপ তুলে নেওয়া হয়। আর রাতে গৃহস্থের গোয়াল থেকে গরু সরানোর পরে তোলা হয় ছোট ট্রাকে।
এই সূত্রেই সামনে এসেছে গৃহপালিত গরু-ছাগলকে চুপ করানোর জন্য চোরেদের নেওয়া কৌশলও। চলতি বছরেই বেশ কিছু চুরি যাওয়া গরু উদ্ধার করার পরে তাদের রকমসকম দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন জেলার অনেক পুলিশকর্মী। তাঁদের অভিজ্ঞতা, চোরেদের খপ্পর থেকে থানায় নিয়ে আসার পরে অনেকক্ষণ টুঁ শব্দ করেনি গরুরা। সাত কেন, সত্তর চড়েও রা কাড়েনি। হাবভাব স্বাভাবিক না ঠেকায় পুলিশ যায় পশু চিকিৎসকদের কাছে। চেপে ধরা হয় আজগরের দলকে।
পুলিশের দাবি, দুষ্কৃতীরা জানিয়েছে, নির্বিঘ্নে কাজ হাসিল করতে দাওয়াই হল— সর্ষের তেল এবং নুন। অন্ধকারে গোয়ালে ঢুকে প্রথমেই ‘শিকার’-এর মুখ খুলিয়ে জিভ টেনে ধরে এক জন। অন্য জন জিভের উপরে বুলিয়ে দেয় ‘চাটনি’ (নুন-তেলের মিশেল)।
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা প্রাণী-সম্পদ দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর তপন রায় বলেন, ‘‘সর্ষের তেল ও নুনের মিশ্রণ ঘষে দিলে সাময়িক ভাবে জিভ ভারী এবং অসাড় হয়ে যায়। ডাকাডাকি করার ক্ষমতা চলে যায়। বিষক্রিয়া হবে না। অথচ, গরু বা ছাগল চুপ করে থাকবে অনেকটা সময়।’’ পুলিশ সূত্রের দাবি, জেরায় এক প্রাক্তন চোর মেনেছে, ‘‘পোষা জীবেও নেমকহারামি করে না। আমরা অনেকে মানি, নতুন করে নুন খাওয়ালে গরু আমাদের কথা মেনে চলবে। আগের মালিকের খাওয়ানো নুনের গুণ ঢাকার কাজটা করবে সর্ষের তেল।’’
চুরির পদ্ধতি জানাতেই জেলা পুলিশ শুরু করেছে দুষ্কৃতীদের চিহ্নিত করার কাজ। এক পুলিশ-কর্তার দাবি, ‘‘জেলায় গরু ও ছাগল চুরির কাজে পাঁচটি দল রয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফাঁদ পাতা হয়েছে। যে কোনও দিন ওরা ধরা পড়বে।’’ তবে জেলা পুলিশের আর একটা অংশ ততটা আশাবাদী নয়। তাদের বক্তব্য, ‘‘গরু-ছাগল চুরির মামলায় যারা ধরা পড়ে, তারা বড়জোর ছ’সপ্তাহ জেল হেফাজতে থাকে। জেল থেকে ছাড়া পেলেই ফের চুরি করতে শুরু করে। এত বড় জেলায় এদের চোখেচোখে রাখাটাই চাপের।’’
চুপিসাড়ে গরু চুরির এই রহস্য এখন জানা হয়ে গিয়েছে অনেক গরুর মালিকেরও। চোরেদের উৎপাতে পরপর গোটা তিনেক গরু খোয়ানো কুলতলির এক চাষির আক্ষেপ, ‘‘আপদগুলো যা শুরু করেছে, এখন থেকে গো-হাটে নেমকহারাম গরু খুঁজতে হবে মনে হচ্ছে!’’-আনন্দবাজার।


