৭ নভেম্বর ছিল একটি সিপাহী বিদ্রোহ, বিএনপির কোনো দিবস নয়
মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত ও চাকুরীরত কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল সেনা কর্মকর্তা। কেউ কেউ একে সামরিক অভ্যুত্থান বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। আসলে ১৫ আগস্ট দেশে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হয়নি, হয়েছে উচ্সৃঙ্খলতা, অরাজকতা ও দুস্কৃতিকারী দ্বারা অতর্কিত হামলা। যারা সেদিন এই কাজটি করেছিলেন তাদের প্রায় সকলই সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে আগে থেকেই বহিষ্কৃত ছিলেন। তাদের এই বেক্তিগত আক্রোশকেই কাজে লাগিয়েছিল দেশের প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্টি, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি ও সি আই এ। কারণ এইসময় বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক পথে পা রেখেছিল যা সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা কখনো মেনে নিতে পারেনি, ভালো চোখে দেখেনি।
১৯৭৫ জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ(বাকশাল)প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যখন সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ হিসেবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাকশালে যোগদান করেছিলেন। তবে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর চেয়ে সিনিয়ার হওয়া সত্তেও তাকে সেনা প্রধান না করাতে তিনি প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর উপর মনক্ষুন্ন ছিলেন। অনেকে মনে করেন জিয়াকে সেনা প্রধান করলে হয়তো তিনি অনেক আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করতেন। কারণ জিয়া ছিলেন একজন ক্ষমতালোভী, উচ্চুবিলাসী বেক্তি। অতীতে তার বিভিন্ন কার্যকলাপে তা প্রমানিত করেছে। এবেপারে জেনারেল শফিউল্লাহ সুইডেনে রাষ্ট্রদূত থাকাকালীন আমার সাথে এক সাক্ষাতকারে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই জিয়া ছিলেন অত্যন্ত উচ্চভিলাষী। তিনি একসময় জেনারেল ওসমানীকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই মুক্তিযুদ্ধের সেনা প্রধান হতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়ার বিভিন্ন ভূমিকা উচ্চভিলাষী ও ক্ষমতালোভী হিসেবে প্রকাশ পায়। জিয়া জেনারেল ওসমানীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে সফিউল্ল্হার সাথে আলাপও করেন বলে তিনি জানান। শফিউল্লাহ সরাসরি জিয়ার এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেছিলেন। শফিউল্লাহ বলেন, জিয়া আমার কাছে এধরনের একটা প্রস্তাব দিলে আমি রেগে গিয়ে এবিষয়ে আমার সাথে আর কথা না বলার জন্য বলি। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের সময় নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল জিয়া। এইসময় মুক্তিযুদ্ধের সরকারের প্রতি জিয়ার আনুগত্যতা নিয়ে সরকারের মধ্যেও ছিল নানা প্রশ্ন বলে জেনারেল শফিউল্লাহ মন্তব্য করেন।
১৯৭১ সালে ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকালে জিয়া নাকি নিজেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেক্তি হিসেবে একবার ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন। পরবর্তিতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপের মুখে তিনি তা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জিয়ার এসকল ভূমিকার কারণে মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা জিয়াকে খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও একজন ক্ষমতালোভী অফিসার হিসেবে দেখেছেন। শুরু থেকেই জিয়ার প্রতি এধরনের সন্দেহ থাকার কারণে বঙ্গবন্ধু সরকার জিয়াকে সেনা প্রধানের দায়িত্ব না দিয়ে শফিউল্লাহকে দিয়েছিল। আর এটাই জিয়া কখনই সহ্য করতে পারেননি। তিনি শুধু সময় ও সুযোগের সন্ধানে ছিলেন। চতুর জিয়া কখনই তার এই মনক্ষুন্নতা প্রকাশ করেননি। তবে ভেতরে ভেতরে গোপনে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে সেনা বাহিনীর অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন। আর এজন্য কৌশলে সেনাবাহিনী ও রক্ষী বাহিনীকে জড়িয়ে নানা অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এসকল অপপ্রচার কারা করছে সে বেপারে জিয়া ভালো ভাবেই অবগত ছিলেন বলে অনেকে বলে থাকেন।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালীন সামরিক বাহিনীতে তার বিরুদ্ধে কয়েকবার বের্থ অভ্যুত্থান হয়েছে। এই কারণে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ঐসময় একে অপরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে। পরবর্তিতে অভ্যুথানকারী এসকল মুক্তিযুদ্ধা অফিসারদের জিয়া ফাসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। জিয়ার হুকুমে নিহত অনেক অফিসারের পরিবার এখনো বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাদের এখন এবেপারে এগিয়ে এসে সবকিছু তুলে ধরে জিয়ার আসল চরিত্রের মুখোস উন্মোচন করা উচিত বলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি মনে করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কৌশলে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল না করলে দেশে এত সামরিক অফিসার হত্যা হতো না বলেই পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। শুধুমাত্র ক্ষমতাকে আক্রে রাখার লক্ষে তিনি যাকেই সন্দেহ করেছেন তাকেই ঠান্ডা মাথায় হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই হত্যা শুরু হয় কর্নেল (অব:)তাহেরকে ফাসি দেওয়ার মধ্য দিয়ে। অথচ এই তাহেরই তাকে একসময় জেল থেকে মুক্ত করেছিলেন। পরবর্তিতে জিয়া কর্নেল(অব:)তাহেরকে ফাসিতে ঝুলিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বাংলাদেশ দুতাবাসে চাকুরী দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। এখানেই পরিষ্কার হয়ে আসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জেনারেল জিয়ার সম্পর্কতা।
তবে তাহেরের ৭ নভেম্বরের সিপাহী বিদ্রোহের বেপারে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিজেই নিজের ফাদে পড়েছেন বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। সেদিন সাধারণ সিপাইদের উচকিয়ে দেওয়ার কারণে কেন্টনমেন্টের ভেতরে তারা অনেক অফিসারকে হত্যা করে। এতগুলো নিরীহ অফিসার হত্যার জন্য অনেকে সরাসরি কর্নেল(অব:)তাহেরকে দায়ী করে থাকেন। এইসময় অনেক অফিসার কেন্টনমেন্ট থেকে প্রানের ভয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। কর্নেল(অব:)তাহের ৭ নভেম্বর সিপাইদের নিয়ে বিদ্রোহ না করলে কারাগারে বন্দী জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার দোষে বিচারের সন্মুক্ষীন হতে হতো। খালেদ মোশাররফ তাকে সরাসরি হত্যা না করে গ্রেফতার করার কারণই ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার সকল রহস্য জিয়ার মুখ থেকে বের করে আনা। কিন্তু সেই সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। কর্নেল তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহ সব কিছু উলট পালট করে দেয়। পরবর্তিতে জিয়ার বিচার হওয়াতো দুরের কথা উল্টো তাকে বীরের মত মুক্ত করে এনেছিলেন কর্নেল(অব:)তাহের। চতুর জিয়া মুক্তির পর আর অপেক্ষা না করে সুযোগ বুঝে তার জীবন রক্ষাকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাসিতে ঝুলিয়ে দেন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টি কোন দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে ৭ নভেম্বর আসলে ছিল জাসদ সমর্থিত কর্নেল(অব:)তাহেরের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া একটি সিপাহী বিদ্রোহ। যার নাম দেওয়া হয়েছিল সিপাহী জনতা বিপ্লব। এই তথাকথিত বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি শুধু বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে সেনা প্রধান পদে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। সেনা প্রধান হওয়ার পর জিয়া কৌশলে কর্নেল(অব:)তাহেরের সিপাহী জনতা বিপ্লবের অন্যান্য পরিকল্পনাগুলো আর সফল হতে দেননি। সুতরাং কর্নেল(অব:)তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহের কারণে ৭ নভেম্বরকে জাসদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন বলা যেতে পারে, কিন্তু বিএনপির জন্য কোনো কিছুই ছিল না। অথচ মিথ্যা ইতিহাসের বদৌলতে দিনটিকে এখন পালন করছে বিএনপি। তারা বলছে এই দিন তাদের নেতা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনা হয়েছিল। একেবারে সত্য কথা। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কে করেছিল এই মুক্তি? এইদিন বিএনপি কেন ভুলেও কথাও তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মুক্তিদাতা কর্নেল(অব:)তাহেরের নাম উচ্চারণ করে না। বিএনপিকে যদি ৭ নভেম্বর পালন করতে হয় তাহলে সবার আগে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে কর্নেল(অব:)তাহেরকে। যিনি তাদের নেতাকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি কি তা করছে? করছে না। কারণ সত্য সামনে আসলে তাদের নেতা জিয়াকে মরণোত্তর বিচারের কাঠ গড়ায় দাড়াতে হবে। যে দাবি আজ হাসানুল হক ইনু সহ জাসদের নেতারা করছেন। পচাত্তরের পরবর্তিতে এভাবেই দেশের জনগনকে এক বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের ও বিস্বস্থ লোক ছিলেন বীর মুক্তিযুদ্ধা ও স্বাধীনতা যুদ্ধে কে ফোর্সের সেক্টর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। তিনি মাঝে মধ্যে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে গণভবনে আসতেন। অনেকের ধারণা ছিল জেনারেল শফিউল্লাহর পরবর্তিতে সেনাবাহিনী প্রধান হবেন খালেদ মোশাররফ। এই কারণে জিয়া যাতে অসন্তষ্ট হয়ে সামরিক বাহিনীর ভেতরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য আগে থেকেই তাকে বিদেশে পাঠানোর চিন্তা ভাবনা করে সরকার। সরকারের ভেতরে এমন সিদ্ধান্ত জিয়াকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। একবার বিদেশে গেলে তার ভবিষ্যতের সকল স্বপ্ন চুরমার হয়ে যাবে বলে তিনি গভীর চিন্তায় পরেন। তাই সিদ্ধান্ত কার্যকরের আগেই জিয়া নানা স্থানে লবিং করা শুরু করে দেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিদেশে গেলে তার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার স্বপ্ন আর কোনদিন সফল হবে না। এবেপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদের কাছে বার বার আবদার করেন জিয়া। পরবর্তিতে তিনি একসময় বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করার সুযোগও পেয়ে যান। এই সাক্ষাতে জিয়া নানা কৌশলে সরকারের প্রতি তার আনুগত্যতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে সামর্থ হয়েছিলেন। পরে একসময় সরকার তাকে বিদেশে পাঠানোর চিন্তাভাবনা প্রত্যাহার করে নেয়। সরকারের এই পরিবর্তনই অবশেষে জিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার স্বপ্নের সফলতা আনার সুযোগ করে দেয়।
১৯৭৫ সালের পনরই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর পর জিয়াউর রহমানের আসল চরিত্র প্রকাশ পায়। বিভিন্ন কৌশলে ধীরে ধীরে তিনি দেশের সবচেয়ে শক্তিধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। এবেপারে বঙ্গবন্ধুর খুনি লে: কর্নেল রশিদ মিডিয়ায় এক সাক্ষাতকারে বলেন, জিয়া যে কোনো মূল্যেই বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তার বয়স তখন খুব কম ছিল। এটা আমি তাকে অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তাকে একটু ধৈর্য্য ধরতে বলেছিলাম। লে: কর্নেল রশিদ বলেন, জিয়া নাছোড়বান্দা ছিল। এই সময় দেশে সামরিক আইন জারি করে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনা বাহিনীর প্রধান জিয়াউর রহমান, বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এম জি তওয়াব ও নৌ বাহিনীর প্রধান রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খানকে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে ক্যান্টনমেন্টের সমর্থনে এইসময় মূলত আসল ক্ষমতা ছিল জিয়ার হাতেই। সায়েম অনেকটা পুতুলের মতো ক্ষমতায় ছিলেন। তাই জিয়া পরবর্তিতে সায়েম ঘোষিত নির্বাচন বাতিল করে দিয়েছিলেন। অবেশেষ আর অপেক্ষা না করে ১৯৭৭ সালের ২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সায়েমকে পদত্যাগে বাধ্য করে জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হন। ঐসময় জিয়ার বয়স ছিল মাত্র ৪১ বছর। শেষ পর্যন্ত জেনারেল জিয়াউর রহমান তার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করলেন তো ছাড়লেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে জিয়াউর রহমানের প্রকাশ্যে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের তিন মাস পূর্বে অর্থাত ৭৭ জানুয়ারিতে আমি দেশ ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। কারণ জিয়ার সামরিক বাহিনী এর অনেক আগে থেকেই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সহ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী নেতা কর্মীদের উপর গ্রেফতার, নির্যাতন, এমনকি গোপনীয় হত্যা পর্যন্ত শুরু করে।
পরবর্তিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার লক্ষে জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এজন্য তিনি একটি রাজনৈতিক দল গঠনের লক্ষে ঢাকা কেন্টনমেন্টের অভ্যন্তরে সর্বপ্রথম আলোচনায় বসেছিলেন। এই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন উচ্চপদস্থ পাকিস্থান ফেরত কয়েকজন বাঙালি সামরিক অফিসার ও দক্ষিনপন্থী কয়েকজন রাজনীতিবিদ। এখান থেকেই জাগদল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে। কারণ আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর মতো কোনো রাজনৈতিক শক্তি ঐ মুহুর্তে বাংলাদেশে ছিল না। এই দল গঠনে তত্কালীন সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ বিশেষ ভূমিকা রাখে বলেও বলা হয়ে থাকে। পরবর্তিতে জাগদল থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠনের সময়েও ঢাকা কেন্টনমেন্টে প্রথম গোপনীয় বৈঠক হয়েছিল। সব কিছু ঠিক হলে ঢাকার রমনায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হয়। এই কারণেই দলটির প্রতিষ্ঠা কেন্টনমেন্টে হয়েছে বলে বলা হয়ে থাকে। একটি দলের প্রতিষ্ঠা সরাসরি ঘোষণা দেওয়ার পূর্বে আলাপ আলোচনা প্রয়োজন রয়েছে। আর সেই আলাপ আলোচনাগুলো বিএনপির ক্ষেত্রে হয়েছে ঢাকা কেন্টনমেন্টের ভেতর। অন্যদিকে জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই ছিলেন প্রচন্ড আওয়ামী লীগ বিরোধী লোক। এই কারণেই দল গঠনে তিনি বেছে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে। অর্থাত ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য জিয়া মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেন। জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি এখন তার বাংলা নাম ততটা বেবহার করে না করে ইংরেজি নাম বিএনপি। একইভাবে দলের নেত্রীকেও সন্মোধন করা হয় মেডাম অন্য কোনো বাংলা নামে নয়।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে জিয়াকে যদি সেদিন বিদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হতো তাহলে পরবর্তিতে বাংলাদেশে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হতো না, সামরিক অফিসার হত্যা হতো না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত হতো না। কারণ প্রমান হয়েছে বাংলাদেশে ১৫ আগস্ট, ৩ ও ৭ নভেম্বর সহ সেনাবাহিনীতে যতগুলো অভ্যুথান হয়েছে সবগুলো জিয়ার কারণেই হয়েছে। যদি জিয়া বিদেশে থাকতো তাহলে একটিও অভ্যুত্থান হতো না বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। জিয়ার পরে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর আর কোনো অভ্যুত্থান হয়নি। এরশাদ এইসময় সামরিক বাহিনীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন বললে হয়তো ভুল করা হবে না। তবে তিনিও ক্ষমতায় থাকার জন্য গঠন করেছিলেন রাজনৈতিক দল এবং এজন্য সাথে নিয়েছিলেন মৌলানা মান্নান সহ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তিকে। শুধু তাই নয় জিয়া কর্তৃক বিকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে এরশাদ গ্রহণ করেছিলেন।
দীর্ঘ ২১ বত্সর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের জনগনের কাছে হারিয়ে যাওয়া মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে ২০০১ সালের নির্বাচনে চক্রান্তের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে পুনরায় বিএনপিকে ক্ষমতায় আনা হয়। ফলে বিএনপি জামায়াত জোট সরকার পুনরায় শুরু করে তাদের সেই মিথ্যা ইতিহাসের প্রচারণা। ২০০৬ সামরিক বাহিনী সমর্থিত ডক্টর ফখরুদ্দিন সরকার ক্ষমতায় এসে তাদের এই যাত্রাকে থামিয়ে দেয় এবং ২০০৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সংখাগরিষ্ঠতা পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসার সুযোগ লাভ করে। পরবর্তিতে ২০১৪ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট জয়ী হয়ে ক্ষমতায় থেকে যায়। যদিও ২০১৪ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন। নির্বাচন সঠিক হয়নি বলে দাবিও করা হয়। কথাটা মিথ্যা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এর জন্য দায়ী কে? ঐসময়ের সরকার না বিএনপি জামায়াত জোট? পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন জামায়াত বিহীন নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে না বলেই তারা নির্বাচন বয়কট করে দেশ ধ্বংসের রাজনীতিতে নেমে পরেছিল। যার পরিনতি এখন বিএনপিকে হারে হারে শোধ দিতে হচ্ছে। অথচ ২০১৪ নির্বাচনে বিএনপি যদি যোগদান করতো তাহলে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে সংসদে অবদান রাখার সুযোগ ছিল বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন।
সব কথার শেষ কথা হলো ৭ নভেম্বর ছিল কর্নেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে একটি সিপাহী বিদ্রোহ, বিএনপির কোনো দিবস নয়। দিনটি জাসদ নেতা কর্নেল (অব:) তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহের দিন। এজন্য একমাত্র জাসদই পালন করতে পারে ৭ নভেম্বর, বিএনপি নয়। বিএনপি যদি জিয়ার মুক্তি দিবস উপলক্ষে ৭ নভেম্বর পালন করে তাহলে জিয়ার মুক্তিদাতা কর্নেল (অব:) তাহেরকে তাদের শ্রদ্ধা ও সন্মানের সাথে স্মরণ করতে হবে। এখন আর মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে জনগনকে ধোকা দেওয়া যাবে না। সুতরাং বিএনপির ৭ নভেম্বর পালন থেকে দুরে সরে আসাই হবে সবচেয়ে বড় উত্তম কাজ। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে বিএনপি আর
কতদিন রাজনীতি করবে?
সুইডেন প্রবাসী কলাম লেখক


