বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

দুই অক্ষর জ্ঞানের সাংবাদিকতা এবং দায়িত্ববোধ

Sabbir_Khanসাব্বির খান।

মাদ্রাসার একজন ছাত্র, যাকে আমাদের চোখে খুবই সাধারন মানুষ হিসেবেই মনে হয় এবং তা-ই সত্যি। জামায়াত, শিবির বা হেফাজতের একজন কর্মী ‘ইজম’ ভিন্ন হলেও আমাদের সবার মতই সাধারন মানুষ। কিন্তু এদের মাঝ থেকেই যখন কেউ জঙ্গী সন্ত্রাসের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং দেশের অভ্যন্তরে যখন খুন-হত্যা, বোমাবাজির মত বিভিন্ন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটায়, আমাদের সবার দৃষ্টিতে তখনও আমরা তাদের আমাদের মতই আমজনতা ভেবে বসে থাকি। আর ভুলটা এখানেই হয়। তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কারনে বিভিন্ন অঘটন ঘটার পরে এর সম্পূর্ন দায়ভার সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনের উপর চাপিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলি। এটা শুধু হঠকারীতাই নয়, একই সাথে দেশের প্রতি ভয়ংকর অমানবিকতাও।

একাজে সর্বাগ্রে এগিয়ে আছে কিছু পেশাজীবী কলম-কর্মী, যারা কোন না কোন ভাবে সংবাদ মাধ্যমের সাথে জড়িত। তাঁদের কর্মক্ষেত্রের পেশাগত আক্রশের সব ব্যাপারেই সরকারের উপরে দায় চাপিয়ে দেয়। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

বিভিন্ন পদবীর সংবাদ মাধ্যমের কর্মী পরিচয়ে সমাজের উপর তাঁরা এক ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়। ব্যক্তিগত বিভিন্ন ‘ইজম’-এর আড়ালে তাঁদের পাবলিক পরিচয়কে ব্যবহার করে খুব ঠান্ডা মাথায় ফেসবুক/টুইটারের মত অনলাইন সামাজিক মাধ্যমের দ্বারা তাঁরা মানুষকে প্রভাবিত করার প্রয়াস পায়। খুরধার লেখনির মাধ্যমে ইনিয়ে-বিনিয়ে “কেস্ট বেটাই চোর” আদলে জঙ্গীদের প্রতিহত বা ধরতে না পারার সবটুকু দায় সরকারের উপর চাপিয়ে দেয়। এতে পুরো একটা জাতি অতি সহজেই তাঁদের এই “দুই অক্ষর”-এর জ্ঞানগরিমার কাছে ধরাশায়ী হয়ে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, সরকার ইচ্ছে করেই জঙ্গীদের ধরছে না এবং সেই সাথে “নিপাত যাক” জাতিয় মনোভাব পোষন করে সরকারের প্রতি। পর্দার আড়ালের “কলম-কর্মী”-রা তখন আশার আলোয় আরো বেশি উদ্দিপ্ত হয়। অন্তত ফেইসবুকের বিভিন্ন আলামতে সেটাই প্রকাশ পায়।

আমরা জানি, জামায়াত-শিবিরের অনলাইন বেশির ভাগ কর্মীরাই পেইড ওয়ার্কার। তারা বেশ পরিচিত এবং সোজাসাপ্টা। কিন্তু সুশীলের তকমায় আটা এইসব কলমকর্মীরা যে জঙ্গীদের এজেন্ডাই পূরন করছে, তা খালি চোখে দেখাও যায় না, বিশ্বাস করাতো দুরের কথা। পদপদবীধারী কলম-কর্মীদের ‘দুই-অক্ষর’ জ্ঞানের সীমাহীনতা যখন সমাজে পাঠশালার মত প্রতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তখন সরকার এবং প্রশাসন খুবই অসহায় বোধ করে, যা বাংলাদেশে এখন প্রবাহমান।

মাদ্রাসার ছাত্র বা ধর্মীয় রাজনীতির সাথে জড়িত কোন মানুষ কি কখনো খুনী বা বোমারু হয়? অথচ তাঁরা দিব্যি সেই কাজগুলোই করে যাচ্ছে। আর যখনই তাঁরা এই কাজে লিপ্ত হয়ে হাত পাকায়, তখন তাঁদের আমরা ‘জঙ্গী’ বলি। মৌলবাদের সাথে সম্পৃক্ততার কারনে পরিচয়ের ব্যপ্তিতা বেড়ে হয় ‘জঙ্গী-মৌলবাদ’। কিন্তু জঙ্গী হওয়ার জন্য যে প্রশিক্ষন এবং চর্চার দরকার তা কোথা থেকে এবং কিভাবে আসে তা কি আমাদের কলম-কর্মীরা জানেন বা জানার চেষ্টা করেছেন? নিশ্চয়ই জানেন। কিন্তু কলম পেশা এবং ইজমের সুবিধার্থে সে বিষয়টি এড়িয়ে যান শুধুই সরকারকে ঘায়েল করার জন্য।

পাকিস্তানের আইএসআই কট্টর মৌলবাদীদের সম্পূর্ন সামরিক কায়দায় এবং শৃংখলায় বিভিন্ন রণকৌশল সহ বিভিন্ন ভারি অস্ত্রচালনায় প্রশিক্ষন দেয় এবং সাদা পাঞ্জাবীর আড়ালে এক একজন দুর্ধর্ষ জঙ্গী তৈরি করে, এটা পৃথিবীতে গোপন কিছু নয়। একইভাবে সিআইএ আল-কায়েদাকে সামরিক প্রশিক্ষন দিয়েছিল এবং সাম্প্রতিক সময়ে সিরিয়ায়ার আইএসআইকে দিয়েছে। তাহলে বিষয়টি দাড়ালো এমন যে, সাদা পাঞ্জাবী-পায়জামার ভিতরে যে দুর্ধর্ষ মৌলবাদী জঙ্গী তৈরি করছে, তারা অবলীলায় হতে পারতেন এক একজন কর্নেল, মেজর, লেফটেনেন্ট অথবা জেনারেল। উর্দী পোষাকে থাকলে তাঁদের বুকেও ঝুলতে পারতো বিভিন্ন র‍্যাঙ্কের স্টার আর মেডেল। কিন্তু জঙ্গীদের সে সৌভাগ্য হয় না। তাঁদের মেডেল আর স্টারগুলো গচ্ছিত থাকে জীবনের ওপারে, যেখানে হুরপরীরা শরাব সাগরে জলকেলী করে।

এবার প্রসঙ্গে আসা যাক। এইসব সর্বোচ্চ সামরিক প্রশিক্ষনে শিক্ষিত জঙ্গীরা যখন অপারেশন চালায়, কাউকে হত্যা করে বা বোমাবাজী করে, তা কি মহল্লার মাস্তানদের আদলে হয়? নিশ্চইয়ই না! আর এরা যখন একটা কমান্ডো অভিযান (সামরিক ভাষায়) চালায়, তা কি ইজরায়েলের মোসাদ, আমেরিকার সিআইএ, রাশিয়ার সাবেক কেজিবি, ভারতের ‘র অথবা যুক্তরাজ্যের এমআই৫ এর চেয়ে কোন অংশে কম পারদর্শী হয়? তাদের কি প্রশিক্ষনে শেখানো হয় না যে, কিভাবে ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করতে হয়, পালানের পথ আগেই কিভাবে ঠিক করতে হয় এবং পেছনে কোন ধরনের মোটিভ না রেখে এসে অপারেশেন সাকসেসফুল করতে? এই চৌকষ কায়দাগুলো কোন মার্গীয় হয়, এটা বোঝার জন্য কি পিএইচডি ধারী হতে হয়?

এবার আসি সার কথায়। এসব জঙ্গীদের মোকাবেলা করা বা খুজে বের করা কি সাধারন পুলিশ, ডিবি বা সিএইডির পক্ষে সম্ভব? হয়ত সম্ভব। কিন্তু তাঁদের কি যথেষ্ট লজিস্টিক বা প্রশিক্ষন আছে? নাকি এদের প্রতিহত, মোকাবেলা এবং ধরার কাজের জন্য ওদের সমকক্ষ সামরিক বাহিনীর দরকার?

অথচ এই ভুলটাই আমরা সব সময় করছি। ছাগল দিয়ে হাল চাষের মত উচ্চ পর্যায়ের সামরিক শিক্ষায় প্রশিক্ষিত জঙ্গীদের মোকাবেলা করতে আমরা সাধারন পুলিশবাহিনীর উপর নির্ভর করছি। আর চিন্তার এই সাধারন ভুলের কারনেই একের পর এক ব্লগার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, প্রকাশক, লেখক ছাড়াও এমনকি পুলিশও মরছে জঙ্গীদের হাতে এবং তাঁদের কাউকেই বাঁধা দেয়া তো দুরের কথা, খুজেও পাওয়া যাচ্ছে না। মনে মনে ভাবুন যে, আমাদের দেশের পুলিশবাহিনী অন্যান্য হাজার কাজের ফাকে একটা সামরিক কমান্ডো গেরিলা বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে এবং এর ফলাফল আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা কি খুব অস্বাভাবিক?

এক্ষেত্রে সরকারের যে ভুল হচ্ছে, তা হলো জঙ্গীদের আন্ডার-এস্টিমেট করা এবং আমাদের ‘কলম-কর্মী’-দের যে ভুল হচ্ছে, তাহলো জঙ্গীদের বিরুদ্ধে পুলিশবাহিনীর শক্তিকে ওভার-এস্টিমেট করা।

দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে এটাই বোঝা যায় যে, যারা জেনে বা না জেনে, জ্ঞানে বা অজ্ঞনতায় অহেতুক পাবলিক সেন্টিমেন্টকে সিম্পলী কলমের জোরে দিকভ্রষ্ট করছেন, তাঁদের উচিত অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে সরকারের পাশে দাঁড়িয়ে আরো বেশি নৈতিক দায়িত্ব পালন করা। এতে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধ জয় কিছুটা সহজ হবে এবং বাংলাদেশ আরো একটা পাকিস্তান বা আফগানিস্তান হওয়া থেকে রেহাই পাবে।

ভুলে গেলে চলবে না, সচেতনতার বিকল্প নেই। এ দায় আমাদের সবার।

সাব্বির খান: সুইডেন প্রবাসী লেখক, কলামিস্ট।

আরও পড়ুন