বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাবা হত্যার বিচার পেলাম না

মেহজাবিন-খালেদমেহজাবিন খালেদ।

(মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও ‘কে-ফোর্স’-এর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। বীরত্বের জন্য বীর উত্তম উপাধি পান। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন তিনি। ক্ষমতা দখলের মাত্র ৩ দিন পরে ৭ নভেম্বর এক পাল্টা অভ্যুত্থানে নিহত হন।)

 

আমি মনে করি বর্তমান সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। জাতীয় ৪ নেতা হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ৭ নভেম্বর হত্যার বিচার হবে না কেন? আমি তো মনে করি, জিয়াউর রহমানের আমলে যে ২০-২২টি অভ্যুত্থান হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধা সেনা সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির লোকজনকে একে একে হত্যা করা হয়েছে, তাদের সবারই বিচার হওয়া উচিত। বিচার হবে। এই বিচার না হলে আমাদের প্রজন্ম কী শিখবে? কী জানবে? মিথ্যার উপর চললে কোনদিন উন্নয়ন হবে না। সত্য কথা জেনে সামনে চলতে হবে।

৭ তারিখে কী হয়েছে আমরা কিছুই জানতে পারিনি। তখন গুলশানে আমার নানীর বাসায় ছিলাম। ৮ তারিখে অনেকেই বলাবলি করছিলো বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তা-ও আমরা বিশ্বাস করিনি। ৯ তারিখে জানতে পারলাম সিএমএইচ-এ বাবার মৃতদেহ রাখা আছে। তখন কেউ বাবার মৃতদেহ আনতে যাবে না। কারণ তখন সবাই ক্যাণ্টনমেন্টে যেতেই ভয় পাচ্ছিলো। অনেক কষ্টে আমার আম্মার এক চাচা, নামটা এখন মনে পড়ছে না। উনি সিএমএইচ-এ গিয়ে মৃতদেহ নিয়ে আসলেন। গোসল করানো হলো। তারপর ক্যাণ্টনমেন্টের পাশের নেভি হেডকোয়ার্টার গোরস্তানে দাফন করা হলো।

তখন আমার বয়স মাত্র ৮ বছর। আমি ক্যান্টনমেন্টের শহীদ আনোয়ার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম। আমার ছোট বোনটি তখনও স্কুলে ভর্তি হয়নি। একেবারে ছোট বোনটির বয়স ছিল ১ বছর। আমার বাবা ছাড়া আমাদের পরিবারে আর কোন উপার্জনক্ষম মানুষ ছিলো না। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তখন। ঢাকায় আমাদের কোন বাড়ি-ঘর ছিল না। আমরা তিন বোন আর আম্মা মামার বাসায় থাকতাম। মামার বাসায় থেকেই পড়াশুনা করতে হয়েছে।

১৯৭১ সালে বাবা যখন যুদ্ধে গেলেন তখন আমাদের ক্যান্টনমেন্টের বাসায় একবার লুট হলো। ’৭৫-এর ঐ ঘটনার পর আমার এক নানী আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন। উনি পরে আম্মাকে জানালেন, আমাদের বাসায় কোন কিছু নেই। সব কিছু লুট হয়ে গেছে। আম্মা বললো, আমরা আর কোন দিন ক্যাণ্টনমেন্টে যাব না। নভেম্বর মাসে সেই যে স্কুল ছেড়ে আসলাম আর স্কুলে যেতে পারিনি। শহীদ আনোয়ার বালিকা বিদ্যালয়ে আর যাওয়া হলো না। আমরা তখন হলিক্রস স্কুলে ভর্তি হয়ে গেলাম। হলিক্রসে এসে চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হলাম।
আমার মা রাগ-অভিমান থেকে সবার সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। উনি সবকিছু থেকে দূরে সরে ছিলেন। আম্মা সেনাবাহিনী কিংবা আওয়ামী লীগের কারো সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে চাননি। আমাদের পড়াশুনা করানো থেকে শুরু করে আজকের এই জায়গা পর্যন্ত অনেক কষ্টেই নিয়ে এসেছেন। আম্মা সেলাইয়ের কাজ জানতেন। সেলাই করে তখন কাপড়ও বিক্রি করেছেন। সেই টাকায় আমাদের স্কুলের বেতনের টাকা পরিশোধ করতেন।

ঈদের আগে সবার মধ্যে একটা আনন্দ দেখতে পেতাম। সবাই নতুন জামা পরবে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ঘুরতে যাবে। কিন্তু আমাদের কোন ঈদে এটা হতো না। ঈদের আগের দিনও চিন্তা করতাম আম্মা জামাটার সেলাই শেষ করতে পারবেন কী না? ঈদের দিন নতুন জামাটা পরতে পারবো কি না? ঈদের দিন মনে হতো কোথায় যাব? বাবা তো নেই। বাবা থাকলে বাবার সঙ্গে বাইরে যেতে পারতাম। কোথায় যাব? কার সঙ্গে যাব? ১৬ ডিসেম্বর বাবার জন্য দুইটা আনন্দ ছিল। একটা হচ্ছে বিজয় দিবস। অন্যটা হচ্ছে আমার জন্ম দিন। কিন্তু ৭৫-এর পর আর কোন দিন এ রকম আনন্দ আসেনি।

আমার বাবা সারা দিন শুধু মানুষের কথাই ভাবতেন। এত দেশপ্রেম ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতার পর মুক্তিযোদ্ধারাই দেশপ্রেমিক ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসলেই খালেদ মোশাররফের নাম আসে।

বাবার মতো দেশপ্রেম, মানুষকে ভালবাসার গুণ আমি হয়তো জীবনেও অর্জন করতে পারবো না। কিন্তু আমি দেশের জন্য, জনগণের জন্য কাজ করতে চাই। আমি হয়তো পুরো বাংলাদেশের জন্য পারবো না। কিন্তু আমার এলাকা জামালপুর-ইসলামপুরের জন্যই করি। যদি আগামীতে সুযোগ পাই আরও করার চেষ্টা করবো।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময় বাবাকে তো কাছেই পেতাম না। সেনাবাহিনীর কাজ নিয়ে উনি ব্যস্ত থাকতেন। সপ্তাহের শনিবার বা রবিবারে নানীর বাসায় ঘুরতে আসতাম। আমার বাবা খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। উনি নতুন গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করতেন। বাবার সঙ্গে গাড়িতে করে সাভারের দিকে ঘুরতে যেতাম।

অনেক কথাই ছিলো যা বাবাকে বলতে পারিনি। বলার সময় হওয়ার আগেই বাবাকে হত্যা করা হলো। আমি যখন কারো কাছে শুনি বাবার সঙ্গে মেয়ের খুব ক্লোজ সম্পর্ক থাকে, বাবার সঙ্গে সব কিছু শেয়ার করে। তখন আমার খুব খারাপ লাগে। এখন মাঝে মাঝে যখন রাজনৈতিক ঝামেলায় পড়ি তখন মনে হয়, যদি বাবা থাকতেন। তাহলে বাবার সঙ্গে বিষয়গুলো বলা যেত। আলোচনা করে পরামর্শ নেওয়া যেত। একটা ভালো কাজের কথা যদি বলতে পারতাম বাবা অনেক খুশি হতো। আমি সংসদ সদস্য হয়েছি, এটা জানলে আমার বাবার চেয়ে কেউ বেশি খুশি হতেন না। দেশের জন্য, দেশের জনগণের জন্য কাজ করছি-এই কথাগুলোই বাবাকে বলা হলো না।
এতগুলো বছর চলে গেলো, কিন্তু এখনও বাবার হত্যার বিচার হলো না। এই কাজটাই হয়তো আমার বাকি রয়ে গেল। সব কাজই হচ্ছে। কিন্তু এই কাজটাই আমি এখনও করতে পারলাম না। কিন্তু আমি আশা করি হবে।

 

মাহজাবিন খালেদ: খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম-এর বড় মেয়ে।

আরও পড়ুন