বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বখাটে মেয়ে হাসনা’র জঙ্গি হয়ে ওঠা

গত শুক্রবারের প্যারিস হামলার পরে যখন ফরাসি নিরাপত্তাবাহিনী হন্যে হয়ে মূল হোতা আইএস জঙ্গি আব্দেল হামিদ আবাউদকে খুঁজতে অভিযান চালাচ্ছিল সেইন্ট ডেনিস শহরতলীর একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে, তখন অভিযান শেষে তারা বিস্মিত হয়ে আবিষ্কার করলেন একজন আত্মঘাতী নারী বোমারুকে। অভিযানের সাড়া পেয়ে এই তরুণী পুলিশের হাতে ধরা দিতে অস্বীকার করলেন এবং বোমা ফাটিয়ে নিজেকে নিঃশেষ করলেন। এই দুর্ধর্ষ ফরাসি মুসলিম নারীর নাম হাসনা আইত বোলাসেন।

হাসনা আইতের বয়স ২৬ বছর। প্যারিসের উত্তরপূর্ব শহরতলীতে বড় হয়েছেন। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হিসেবে বেড়ে উঠলেও ছিলেন খুবই আমুদে স্বভাবের। সবসময় আনন্দ ফূর্তি করতে ভালোবাসতেন, ঘুরে বেড়াতেন শহরের বিভিন্ন পার্টিতে। কিন্তু ফূর্তি করা যে মেয়ের স্বভাব তিনি কীভাবে যুক্ত হলেন আইএস জঙ্গিদের সাথে আর কেনইবা হলেন পশ্চিম ইউরোপের প্রথম আত্মঘাতী নারী বোমারু?

যোগাযোগটা শুরু হয়েছে আসলে আব্দেল হামিদ আবাউদের থেকে। আব্দেল হামিদ আবাউদ সব কিছুরই মূল হোতা। প্যারিস পুলিশের ধারণা, হাসনা আইত আবাউদের দূর সম্পর্কের বোন।

হাসনা আইত প্যারিসের যে এলাকায় বেড়ে উঠেছেন সেখানকার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, তার বাবা খুব ছোটবেলায় তার মা এবং ভাইকে ফেলে চলে যান। তারপর থেকে তাদের জীবন কেটেছে নানাবিধ আর্থিক কষ্টে। বর্তমানে হাসনার মা এবং ভাই পুলিশের হেফাজতে আছেন।

হাসনার বন্ধুদের সাথে কথা বলেও জানা যায় যে, তিনি আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকতে ভালোবাসতেন। নাচ গান তার খুব ভালো লাগত, বিশেষ করে নাচ। হাসনা খুব ভালো নাচতে পারতেন। এরকম একটা মেয়ের তো কোনভাবেই আত্মঘাতী বোমারু হওয়ার কথা না। তবে তিনি কি কোন কিছুর দ্বারা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন? তার বন্ধুদের মতে, হাসনাকে মাদক সেবন করানো হয়ে থাকতে পারে। কারণ সুস্থ অবস্থায় তার এটা করার কথা নয়।

আইএস জঙ্গিরা সাধারণত ধর্মান্ধ হয়। তবে কি হাসনা ধর্মান্ধ ছিলেন? তার সম্বন্ধে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে উল্টো চিত্রটাই ফুটে ওঠে বেশি করে। হাসনা প্রচুর মদ্যপান করতেন এবং মাথায় টেক্সাসের কাউবয়দের মতো বিশাল হ্যাট পরে ঘুরে বেড়াতেন। তার আচরণের এই বাহ্যিকতার কারণে এলাকার মানুষ তাকে রসিকতা করে ডাকত ‘কাউগার্ল’। তাকে এমনকি কখনোই নামাজ পড়তে কিংবা কোরআন পড়তে দেখা যেত না। সে আধুনিক মেয়েদের মতন সারাক্ষণ ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক কিংবা মেসেঞ্জারে তার বেশিরভাগ সময় কাটতো।

কিন্তু অতি সম্প্রতি তার মধ্যে আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটে। মাত্র আট নয় মাস আগে থেকে তার জীবনযাত্রা বদলে যায়। সে ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ে, হিজাব পরতে শুরু করে। এমনকি সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ইসলামিক স্টেটকে সমর্থন করে বিভিন্ন উক্তি করতে শুরু করে।

কেন হাসনা এমন করে হঠাৎ বদলে যান সেটা স্পষ্ট নয়। প্যারিস হামলার মূল হোতা আব্দেল হামিদ আবাউদের সংস্পর্শে এই কাজটি হয়েছে সেটা অনুমান করা যেতে পারে। আবাউদ যেহেতু ছিলেন একজন ধর্মান্ধ চরমপন্থি, কাজেই তার সাথে থেকে হাসনাও হয়তো প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং আস্তে আস্তে বেছে নিয়েছিলেন আত্মঘাতী জীবন। ধর্মের নাম নিয়ে যে সব মানুষ পৃথিবীব্যাপী হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছেন তাদের মতো হাসনাও হয়তো মনে করতে শুরু করেছিলেন ধর্মের নামে বোমা ফাটিয়ে নিজেকে নিঃশেষ করলে সরাসরি স্বর্গবাস হবে।

আরও পড়ুন