উচ্চবিত্ত পরিবারের দুই সন্তান। রচনা থাকে উত্তরার চার নম্বর সেক্টরে আর অধরা থাকে বনানীতে। সম্পর্কে দু’জন দু’জনের ‘বান্ধবী’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের একটি বিশেষ গ্রুপ ও পেজের এ্যাডমিন এই দু’জন। ফেসবুকে আপলোড করা তাদের ছবি দেখলে মনে হবে অপরূপা দুই সুন্দরী। এই গ্রুপে তাদের মতো রয়েছে প্রায় এক হাজার সদস্য।
তাদের প্রত্যেকের দেওয়া ছবি দেখলেই একই রকম মনে হবে। অধিকাংশ ছবিই তোলা হয়েছে অভিজাত এলাকার নাইট ক্লাবে বা ডিজে পার্টিতে। তাদের সঙ্গ দিচ্ছে অনেক পুরুষ। তবে, রচনা ও অধরার মতো এই ফেসবুক গ্রুপের প্রত্যেকেই জন্ম নিয়েছে পুরুষ হিসেবে। রচনা বা অধরা কোনোটায় তাদের প্রকৃত নাম নয়। দিনের বেলা সাধারণ পুরুষের মতো মনে হলেও তাদের চলা-ফেরা বিশেষ গণ্ডির মধ্যে। সবার সঙ্গে মেশে না এরা।
এই প্রতিবেদক দীর্ঘদিন ফেসবুকের এই গ্রুপ ও পেজের ওপর নজরদারী করে। দীর্ঘ চেষ্টার পর রচনা রোজারিওকে বন্ধু তালিকায় যুক্ত করা সম্ভব হয়। প্রথম প্রথম নিজেকে নারী হিসেবেই দাবি করে এসেছে রচনা। ফেসবুক চ্যাটিংয়ের দীর্ঘদিনের কথোপকথনের পর রচনা স্বীকার করে সে প্রকৃতপক্ষে একজন পুরুষ। রচনার বয়স এখন ২২ বছর। রাজধানীর উত্তরায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ তৃতীয় বর্ষের ছাত্র রচনা। রচনার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে প্রথমে অস্বীকৃতি জানায় সে। সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হতে চায় না রচনা।
অনেকবার অনুরোধের পর তার নাম, পরিচয় ও ছবি (প্রকৃত, পুরুষ বেশের) প্রকাশ না করা শর্তে সাক্ষাৎ করার জন্য রাজী হয় রচনা।
গত ২০ নভেম্বর শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে ২টার মধ্যে রাজধানীর খিলক্ষেত বাসস্ট্যান্ডে দেখা করার জন্য রাজী হয় রচনা। সঙ্গে থাকবে তার ‘বান্ধবী’ অধরা আফরোজ। অবশ্য রচনা তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটিও দিতে রাজী হয়নি। খিলক্ষেত ওভার-ব্রীজের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে বলা হয় এই প্রতিবেদককে।
কথা অনুযায়ী অনেকটা অনিশ্চিতভাবেই এই প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১২টায় অবস্থান নেয় সেখানে। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর ১টা বেজে ১৮ মিনিটে একজন মধ্যবয়সী পুরুষ এই প্রতিবেদকের সামনে এসে তার নাম জানতে চান। নাম বলার পর ওই ব্যক্তি এই প্রতিবেদককে পূর্বপাশে একটি চায়ের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে বসতে দিয়ে লোকটি বলেন, ‘আপনি যাদের কাছে এসেছেন তারা আসছেন, একটু বসেন।’
লোকটির নাম জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, ‘ধরে নিন আমার নাম আব্দুর রহিম-আব্দুল করিম কিছু একটা হবে। আমার নাম দিয়ে তো আপনার দরকার নাই।’
চায়ের দোকানের ভেতরে ও বাইরে অনেকেই রয়েছেন। প্রায় আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ওই চায়ের দোকানের ভেতরেই বসে থাকা দুই যুবক পরিচিত হন প্রতিবেদকের সঙ্গে। একজনের পরনে পোলো টি-শার্ট আর জিন্স, পায়ে কেডস, চুলগুলো স্পাইক করা। চোখে রোদ-চশমা, হাতে বেসলেট। আরেকজনের পরনে গোল গলার গেঞ্জি ও জিন্স। মাথায় লাল রঙের একটা ক্যাপ।
পরিচয়পর্বে তাদের নাম জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, ‘শুনলেন না কিছু একটা হবে আমাদের নাম।’ তবে আপনি যে নামে আমাদের চেনেন তাদের মধ্যে আমি রচনা রোজারিও উত্তর দেন পোলো টি-শার্ট পরা যুবক। তার মুখে দাড়ি ও গোফের রেশ রয়েছে মনে হচ্ছে, হয়ত একদিন আগেই সে শেভ করেছে।
রচনা শুরুতে বলে বসলেন, ‘আমাদের কথার মাঝে আপনি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করবেন না। আমরা অনেক আগে থেকেই আপনাকে ফলো করেছি। আপনি সাড়ে ১২টার দিকে এখানে এসেছেন। আমরা দেখছিলাম আপনার সঙ্গে অন্য কেউ আছে কিনা। আবার আপনার কাছে অন্যকোনো ডিভাইস বা আছে কিনা। এবার বলেন কী জানতে চান আপনি?’
ছবির রচনা ও অধরার সঙ্গে কোনোভাবেই মিল নেই এই দুই যুবকের। এরপর চা খেতে খেতে কথা শুরু হয় তাদের সঙ্গে। দেখতে তো আপনারা দু’জনেই খুবই স্মার্ট ও সুঠাম দেহের যুবক। তবে কেন রাতে আপনাদের নারী বেশ? এমন প্রশ্নে হাসতে হাসতে উল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় অধরা, ‘আমরাই যে তারা এটা আপনি কীভাবে শিওর হলেন?’ উত্তরে এই প্রতিবেদক বলেন, ‘আপনারাই দাবী করছেন তাই।’
এ সময় রচনা রোজারিও বলে বসেন, ‘আপনার সঙ্গে যতটা না ফান করছি তার চাইতেও ফানি আমাদের জীবন। এক অভিশপ্ত জীবন আমাদের। পুরুষের মতোই গঠন আমাদের। কিন্তু মানসিকভাবে আমরা ভাবতে পারি না আমরা পুরুষ।’
বিষয়টা স্পষ্ট না এমন কথার পরিপ্রেক্ষিতে রচনা বলেন, ‘এখন আপনি আমাদের পুরুষের পোশাকে দেখছেন। কিন্তু আসলে এখানেও কিছুটা তফাৎ আছে আপনার সঙ্গে। তা হচ্ছে, আমি এখানে বসে আছি কিন্তু আমি যদি এখন হাঁটা-চলা করি, তবে আপনি কিছুটা ব্যতিক্রম পাবেন। কেবল হাঁটা-চলার বিষয় নয়— মূলত আমরা পুরুষ তবে পৌরুষ্যত্বহীন।’
তবে রচনা বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে আমরা চলতে গেলে নারীদের মতো মনে হয়— যাদের আপনারা বলেন হিজড়া। কিন্তু আমরা হিজড়া নয়।’
কবে থেকে আপনাদের মধ্যে এমন অস্বাভাবিকতা? প্রশ্নের উত্তরে রচনা বলেন, ‘আমার বাবা ব্যবসায়ী, ধর্মে আমরা খ্রীষ্টান। ছেলেবেলায় পড়ালেখা করেছি সেন্ট পলস স্কুলে। ছেলেবেলা থেকেই আমার মধ্যে মেয়েলী ভাবটা আসতে থাকে। বাবা ধনী তাই টাকার অভাব নেই আমার। বাবা হাত খরচের যে টাকা দিত তা দিয়ে আমি মেয়েদের পোশাক কিনতাম। নিজের রুমে পরতাম। মুখে আমার দাড়ি-গোঁফ ভাল লাগতে না। তাই সব সময় শেভ করতাম। এরপর বিষয়গুলো পরিবারের কাছে ধরা পড়ে গেল। তারা আমাকে প্রথমে বুঝানোর চেষ্টা করলেন। পরে তাদের মনে হল এটা আমার রোগ। প্রথমে আমাকে নেওয়া হল একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। তিনি আমার সঙ্গে কথা বলেন এবং আমাকে দেখে পরামর্শ দিলেন হরমোন বিশেষজ্ঞ দেখাতে।’
রচনা বলে চলেছে তার জীবনের নারী-পুরুষ দ্বৈত গল্পের কথা। আর বিরতি দিয়ে দিয়ে করছেন ধূমপান ও চা পান। রচনা বললেন, ‘এরপর বাবা আমাকে নিয়ে গেল একজন হরমোন বিশেষজ্ঞের কাছে। তিনি আমার বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। পরে বাবাকে বললেন, আমি আসলে পৌরুষ্যত্বহীন একজন পুরুষ। বিষয়টা আমার পরিবারের কাছে একটা ট্র্যাজেডির মতো ছিল। বাবা-মা আমাকে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে তেমনটা মিশতে দেননি সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে। বলতে পারেন নিজস্ব একটা পরিমণ্ডলের মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা, পড়ালেখা। এইচএসসি পাসের পর বাবা আমাকে পাবলিক ভার্সিটিতে পড়াতে রাজী ছিলেন না। প্রথমে চেয়েছিলেন দেশের বাইরে পাঠাতে, পরে অবশ্য প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি করান। আমি ক্লাসে তেমনটা যাই না। পরীক্ষার সময় যাই।
তিনি বলেন, ২০১২ সালে ফেসবুকের মাধ্যমে আমার পরিচয় অধরার সঙ্গে। এরপর এভাবে আমরা ফেসবুকে আমাদের মতো আরও অনেককেই পেয়ে যায়। বলতে পারেন ধনী পরিবারে জন্ম নিয়েছি, তাই আমাদের অবস্থান হিজড়া সমাজে হয়নি।’
কথাগুলো বলতে বলতে রচনার আবেগতাড়িত হয়ে বললেন, ‘ভাই আমাদের এ কেমন দুঃসহ জীবন! নারী হয়ে জন্ম নিলে কি আমাদের কোনো অভিযোগ থাকত! আমি তো কখনই ভাবি না আমি পুরুষ।’
একই রকম গল্প শোনালেন অধরা আফরোজও। অধরা বললেন, ‘সমাজে আমরা খুব সাবধানে চলাফেরা করি। গরীব ঘরে জন্ম নিলে হয়ত আজ হিজড়া সমাজেই থাকতাম। আমরা আমাদের একটা গ্রুপ তৈরী করেছি। আমাদের ফেসবুক গ্রুপে এক হাজার সদস্য রয়েছে, যারা আমাদের মতো। এই গ্রুপের সদস্য দেশের ও দেশের বাইরের অনেকেও আছে। প্রত্যেককে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে ঢাকাতেই আমাদের প্রায় ২০ জনের একটা গ্রুপ আছে। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে চিনি। আমাদের প্রত্যেকের একজন করে বয়ফ্রেন্ড (প্রেমিক) আছে। শুধু তারাই জানেন আমরা কী।’
তাদের যৌন-জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে অধরা তাদের অস্বাভাবিক ওই যৌন-জীবনের পক্ষে সাফাই গেয়ে বললেন, ‘আপনি একজন পুরুষ। আপনার আকর্ষণ সব-সময় একজন নারীর প্রতি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা পুরুষ হিসেবে জন্ম নিয়েছি সত্য, কিন্তু আমি একটা ছেলের প্রতি আকর্ষণ পাই। জানি সেটা সম্ভব না। আর আমাদের সেক্সুয়াল লাইফটা সমাজ, ধর্ম, পরিবার ও রাষ্ট্রের কাছে নিষিদ্ধ।’
আপনাদের যৌন-জীবনটা তো এক কথায় বিকৃত যৌনাচার, এটা একদিকে যেমন ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে পাপ অন্যদিকে এটা আপনাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এমন জীবন থেকে আপনারা বের হওয়ার চেষ্টা করেন না? স্বাভাবিক পুরুষের মতো থাকার ইচ্ছা হয় না? — এমন প্রশ্নে অধরা নিজপক্ষ সমর্থন করে বলল, ‘হ্যাঁ, সহজ ভাষায় আমাদের সবাই গে বা সমকামী বলবে। এটা ধর্মে নিষিদ্ধ, পাপ। পরিবারেরও কেউ জানে না আমাদের এমন অন্ধকার জীবনের কথা।’
তবে শেষে অধরা এ-ও স্বীকার করলেন, ‘প্রচণ্ড দুর্বিষহ আমাদের জীবন। অভিশপ্ত আমাদের জীবন।’
অধরার কথার মধ্যেই আবারও যুক্ত হন রচনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রুপটা আসলে আমাদের মতো যারা আছে তাদের ওপর কাজ করছি। আমরা একটা নিজস্ব পরিমণ্ডল গড়ে তুলেছি। যেখানে আমাদের বয়ফ্রেন্ড ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারে না। আমরা বিভিন্ন পার্টিতে যাই মেয়ে সেজে। বিশেষ করে ডিজে পার্টিতে। সেখানে অনেক বাইরের মানুষও থাকে, তারা আমাদের চিনতে পারে না। আর আমরা আমাদের সেফটির বিষয়গুলো মাথায় রাখি। আমরা জানি, আমরা সবচেয়ে বেশী এইডসের ঝুঁকিতে। ফলে চেষ্টা করি যাতে— আমাদের মতো অন্যরা এই জীবনে না আসে। তাদের বোঝাতে চেষ্টা করি, এই জীবনের কষ্টগুলোর কথা। কখনো সফল হই, কখনো ব্যর্থ হই।’
রচনা একটু থেমে বললেন, ‘সমাজে আমাদের মতো অনেকেই আছেন, যারা এই জীবনের মধ্যে রয়েছেন, হয়ত কেউ জানে না। এমনকি তাদের পরিবারও। তারা বেশী ঝুঁকিতে আছেন। কিন্তু তারা সচেতন নয়। আমাদের উচিত হবে তাদের সচেতন করা।’
তবে ট্রান্সজেন্ডার নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এখনো পরিপূর্ণ কোনো গবেষণা হয়নি। হরমোন জটিলতা ট্রান্সজেন্ডারের একটা অন্যতম কারণ হলেও আরও বেশকিছু সমস্যার কারণে এগুলো হতে পারে।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোকাইনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাহাজাদা সেলিম বলেন, ‘ট্রান্সজেন্ডার বলতে আমরা মূলত পুরুষের মধ্যে মেয়েলী আচরণকে বুঝি। কিন্তু কিছু মেয়ের মধ্যেও পুরুষের মতো আচরণ দেখা যায়। তবে সেগুলো খুবই কম। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞানে ট্রান্সজেন্ডারের হওয়ার কারণগুলো স্পষ্ট নয়। বেশ কয়েকটি কারণের মধ্যে হরমোনাল সমস্যা একটা।’
এ-সব বিষয়ে কথা হয় বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটির জনসংযোগ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ জাহিদ আল-আমিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়া সমাজের যৌন-জীবন ও এইডসের ওপর বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন কাজ করছে। তার মধ্যে বন্ধু ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও রয়েছে। আমরা সমকামিতা নিরুৎসাহিত করছি। আমাদের প্রচেষ্টা ট্রান্সজেন্ডার বা হিজড়াদের একটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। এবং তাদের এইচআইভি, এইডসের সম্পর্কে সচেতন করা।’


