পাবনার বৃহত্তর চলনবিল এলাকার অনেক মানুষের ভাগ্য বদলেছে শুঁটকি মাছের ব্যবসায়। এসব এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে ইতোমধ্যে। এ বিলের শুঁটকি মাছ সুস্বাদু হওয়ায় দেশে-বিদেশে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে এই শুঁটকি মাছ। এই মওসুমে মাছ শুকানোর জন্য প্রায় তিন শ’ অস্থায়ী চাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। শুকানো শেষ হলেই ব্যবসায়ীরা চাতাল থেকেই এসব শুঁটকি ক্রয় করে রফতানি করছেন বিভিন্ন দেশে। অর্জিত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যের তাপকে কাজে লাগাতে ব্যস্ত শত শত নারী-পুরুষ। তাদের দম ফেলারও যেন সময় নেই। পাবনা-সিরাজগঞ্জ-নাটোর জেলার অংশ নিয়ে গঠিত দেশের সবচেয়ে বড় জলাভূমি চলনবিল মিঠেপানির মৎস্যভাণ্ডার নামে পরিচিত। বিলে মাছ ধরার পাশাপাশি চাতালে মাছ শুকানোর মওসুম শুরু হয়েছে। মাছ বিক্রি করে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনতে বিল অঞ্চলের ব্যবসায়ী, জেলে ও নারী-পুরুষ এখন মাছ ধরা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পাবনা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, তিনটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া চলনবিলে রয়েছে প্রায় ১৭৫৭ হেক্টর আয়তনের ৩৯টি বিল, ৪২৮৬ হেক্টর আয়তনবিশিষ্ট ১৬টি নদী ও ১২০ বর্গকিলোমিটার আয়তনবিশিষ্ট ২২টি খাল এবং অসংখ্য বড় বড় পুকুর ও জলাশয়। চলতি মওসুমে প্রায় ৯০ কোটি টাকা মূল্যের ২৫০ থেকে ৩০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এবার বিলে মাছের পরিমাণ বেশি থাকায় শুঁটকির উৎপাদনও বেশি হবে।
মাছ শুঁটকি করার পর এ, বি ও সি গ্রেডে বাছাই করা হয়। ‘এ’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, আমেরিকা, মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান, বাহরাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের ২৫টি দেশে রফতানি করা হয়। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে চলনবিলের সুস্বাদু শুঁটকির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া ‘সি’ ও ‘বি’ গ্রেডের শুঁটকি মাছ দেশের বিভিন্ন জেলায় উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়। চলনবিল অঞ্চলের তিন হাজার পরিবার শুঁটকি মাছ তৈরির কাজে জড়িত। এসব পরিবারের নারী-পুরুষ শুঁটকির চাতালে কাজ করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হচ্ছেন।
চাটমোহরের শুঁটকি ব্যবসায়ী এখলাছ উদ্দিন জানান, চলনবিলের শুঁটকি মাছের স্বাদ ও মান ভালো হওয়ায় দেশ-বিদেশে এর চাহিদা বেশি। আশ্বিন মাস থেকে শুঁটকির চাতালে মাছ শুকানো শুরু হয়েছে। অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত চলে শুকানোর কাজ। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শুঁটকি ব্যবসায়ীরা মাছ শুকানোর চাতাল তৈরি করেছেন। দুই থেকে তিন লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে এ ব্যবসায় শুরু করা যায়।
গুরুদাসপুর শুঁটকি ব্যবসায়ী মাহমুদ শুকুর জানান, পানি কমতে থাকলে বিলের বিভিন্ন স্থানে সোঁতিজাল পাতা হয়। জালে ধরা পড়ে পুঁটি, খলসে, চেলা, টেংরা, বাতাসি, চিংড়ি, নলা, টাকি, গুচি, বাইম, বোয়ালসহ নানা জাতের মাছ। এসব মাছ চাতালে শুকিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। ১৭০ থেকে এক হাজার টাকা দরে প্রতি কেজি শুঁটকি মাছ বিক্রি করা হয়।
শুঁটকি তৈরির কাজে নিয়োজিত শ্রমিক রমজান আলী, রহমান সেখ, আব্দুল কাদের, সবিতা রানী, তাহমিনা বেগম, তছলিমা খাতুন জানান, ৩ কেজি তাজা মাছ শুকিয়ে এক কেজি শুঁটকি মাছ তৈরি হয়। তবে এই ব্যবসা করে সচ্ছলতা যেমন অর্জন করা যায় তেমনি এ ব্যবসায় ঝুঁকিও অনেক বেশি। ঠিকমতো পরিচর্চা করতে না পারলে শুঁটকি মাছে পোকা লেগে নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া আবহাওয়া খারাপ হলে, রোদ না থাকলে বিপদে পড়তে হয়।


