বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

প্রসঙ্গ: গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা

সামিয়া_রহমানসামিয়া রহমান।

গুটি কয়েক প্রশ্ন করি আপনাদের। বাংলাদেশের জনগণ কি আমাদের গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করে? চোখ বন্ধ করে আস্থার সাথে গণমাধ্যমের হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে চলে? আমাদের সরকার রাজনৈতিক দলগুলো গণমাধ্যমকে কি পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়? অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কি গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে না? গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কি আছে?

বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যাপারটি আমার কাছে আপেক্ষিক। বিশ্বাসযোগ্যতা শব্দের বিশ্বাসহীনতা থেকে আরো নানা শব্দের উৎপত্তি। অবিশ্বাস, পক্ষপাতদুষ্টতা, অন্যায্য, ভারসাম্যহীনতা, বিভ্রান্তিকর ইত্যাদি বহুমূখী বিশেষণ। সাধারণত মানুষের অনুধাবন, চিন্তা বা চাহিদাই যদি বলি- নিজের মতের সাথে মিলে গেলে সেটি বিশ্বাসযোগ্য হয়। মত বিরুদ্ধ হলেই পক্ষপাতদুষ্টতা, বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে আরো অনেক শব্দ জড়িত। সঠিকতা, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা ইত্যাদি ইত্যাদি।আমাদের গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে এই প্রত্যয়গুলোর সাথে।

গণমাধ্যমের আগ্রাসী আচরণ নিয়ে আমরা প্রতি মুহূর্তে আলোচনা সমালোচনায় মেতে উঠি। গণমাধ্যমের হাজারো দোষ ত্রুটি খুঁজে বেড়াই। স্বতন্ত্র সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবার সাথে সাথে গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যেমন বেড়েছে তেমনি সমাজের বিভিন্ন অংশে এর প্রভাব প্রতিপত্তিও বেড়েছে।যতোই প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তৃত হোক অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে গণমাধ্যম সব সময়ই সমাজের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং সমাজই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে গণমাধ্যমের চর্চার পরিধি ও বিস্তৃতি।কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামো নিজেই যেখানে অর্থনৈতিক গতি প্রকৃতি দ্বারা চালিত হয় এবং সমাজের প্রভাবশালী ক্ষমতাবানরাই গণমাধ্যমের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে সেই সমাজে গণমাধ্যমের কার্যকলাপ পরিচালনায় কতটুকু স্বাধীনতা গণমাধ্যম ভোগ করতে পারে সেটিই বিচার্য বিষয়।

গণমাধ্যম আমাদের বিশ্ব সংস্কৃতিকে জানার চেনার সুযোগ করে দিয়েছে। প্রযুক্তি ও যোগাযোগের সুযোগ নিয়ে গণমাধ্যম ‍বিশ্বকে আলিঙ্গনের মধ্যে দিয়ে এক করে তুলেছে ।এতে করে বিশ্ব সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতিকে জানার চেনার সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু তথ্য প্রচার ও প্রসারের সুযোগে গণমাধ্যম কখনো কখনো জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনা, মূল্যবোধ, ধ্যান ধারনাকে বদলে দিচ্ছে বলে বারবার অভিযোগ উঠছে।

গণমাধ্যম তথ্য দেয়। মানুষকে জানাতে সাহায্য করে – সমাজ সম্পর্কে, পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কে, পরিবেশ, পরিস্থিতি এমনকী তার নিজের সম্পর্কেও। তথ্য মানুষকে শিক্ষিত করে, বিনোদিত করে এবং এর দ্বারা সে প্রভাবিতও হয়। কিন্তু গণমাধ্যমের তথ্য যদি বিকৃত হয় অথবা এমন সংস্কৃতি বা পরিবেশের ধারক বা বাহক হয় যা আমাদের পারিপার্শ্বিকতা থেকে ভিন্ন, তবে সেই পরিবেশ পরিস্থিতি বা পারিপার্শ্বিকতার প্রভাবে নিজ সমাজ, মূল্যবোধ সম্পর্কে জনগণের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা গড়ে উঠে।তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস গণমাধ্যমের অবস্থান বাংলাদেশের জনসমাজে এখন অনেক বেশি প্রকট ও স্থায়ী।দিনে দিনে বাড়ছে গণমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যাও।অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিতে পারেনি, যদিও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পৌছে গেছি আমরা। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে ইতিবাচক শক্তি হচ্ছে এর সচেতন জনগোষ্ঠী এবং স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যম।বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার পথে এখনও টিকে থাকার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় চলক। যদিও এই নিয়ে বিতর্ক চলমান যে বাংলাদেশের গণমাধ্যম আসলেই স্বাধীন নাকি নিজে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে গণমাধ্যমই তথ্য প্রসারের নামে জনগণের বাক স্বাধীনতা খর্ব করছে বা ইতিহাস বিকৃত করছে বা উস্কে দিচ্ছে জনগণকে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অর্থ শুধু রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে সংবাদ প্রচার নয়, বরং স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার বিষয়টিও যুক্ত। একটি গণমাধ্যম তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে যখন সেই গণমাধ্যম সামাজিক ইস্যুগুলো যথাযথ ব্যাখ্যা প্রদানের মাধ্যমে এই ব্যাপারে ইতিবাচক ও প্রগতিশীল জনমত গঠনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।জনগণকে সঠিক তথ্য অবহিত করে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারে।একটি গণমাধ্যম তখনই স্বাধীন গণমাধ্যম হতে পারে যখন সেটি নিরপেক্ষভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি মাত্রায় তুলে ধরতে পারে।অবশ্যই নিরপেক্ষতার অর্থ শুধু বাক্য বিলাসের ভারসাম্য রক্ষা নয়, নিরপেক্ষতার অর্থ সত্যের প্রতি আনুগত্য। এই সত্য মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে কোনো নিরপেক্ষতার ভানও অসম্ভব। যদিও বিরুদ্ধবাদীদের মতে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা কাম্য।কিন্তু সেটি শুধু তাদের বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়োজনে। গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে এখন খুব প্রচলিত অভিযোগ, গণমাধ্যম বাক স্বাধীনতার সুযোগে অযৌক্তিক বিতর্ক ও কুতর্ক তৈরি করছে।বাক স্বাধীনতার অর্থ স্বেচ্ছাচারিতা নয়।গণমাধ্যমের বাকস্বাধীনতা জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করুক সেটি বোধকরি আমরা গণমাধ্যম কর্মীরাও চাই না। সমাজে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে গণমাধ্যম সমাজের পরীক্ষিত মিত্র হিসাবেই থাকতে চায়।

উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো বলে গিয়েছিলেন সমাজে নতুন ধরণের রাজনৈতিক ক্ষমতার কথা। পাশ্চাত্যের সমাজে বিভিন্ন ধরণের কর্তা ও ক্ষমতার প্রসঙ্গটিও নতুনভাবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। এই নতুন রাজনৈতিক কাঠামো হল রাষ্ট্র ব্যবস্থা।তবে অধিকাংশ সময়েই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এমন এক ক্ষমতাতন্ত্র ভাবা হয়েছে যা কিনা ব্যক্তিক বিষয়াদি উপেক্ষা করে এবং মূলত সামগ্রিক স্বার্থের দিকে নজর দেয়।কিংবা বলা চলে বিশেষ কোনো শ্রেণি বা নাগরিকদের ভিতর থেকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখে।ফুকোর মতে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আসলে একই সাথে ব্যক্তিকীকরণবাদী ও সমগ্রতাকরণবাদী ধরণের। গণমাধ্যম সম্পর্কেও অনেকটা একই অভিযোগ সমালোচকদের। অভিযোগ, গণমাধ্যম সামগ্রিক স্বার্থের কথা বলে বিশেষ গোষ্ঠী স্বার্থকেই প্রাধাণ্য দেয়।

এখানেই আলোচনার শুরু। আধিপত্য ও বানিজ্য বিস্তারের প্রয়োজনে বিশ্বায়নের এই যুগে যেখানে সমগ্র পৃথিবীর খবরাখবর একে অপরের কাছে পৌছানো মুহূর্তের সময় মাত্র, দেশীয় গণমাধ্যম সেখানে কীভাবে জনগণকে এককভাবে প্রভাবিত বা প্রতারিত করবে বা বিতর্কের নামে বিশেষ এজেন্ডা তৈরি করে জনগণকে আত্মপরিচয়হীনতার সংকটে ফেলে দেবে? ফুকো একেই বলেছেন চিন্তা পদ্ধতির নিয়ন্ত্রণ।একটি দেশের জনগণের উপর আধিপত্য বিস্তারের সহজ উপায় সে দেশের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনেই ওই জনগোষ্ঠীর চিন্তার জগতকে শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়।এইভাবে জনগণের মনোজগতে ঢুকিয়ে দেয়া হয় নতুন চিন্তা।এই চিন্তা যখন তার বিশ্বাসে পরিণত হয়, চিন্তার আগ্রাসন তার জ্ঞানে পরিণত হয়, যে জ্ঞানকে সে সত্য বলে মনে করে, তখন সে নিজের অজান্তেই এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে যায়।এই ভাবে জ্ঞান বা চিন্তা এবং অর্থনীতি, রাজনীতি একসাথে কাজ করে।জনপ্রিয় জ্ঞান আসলে সর্বজন-গ্রাহ্য জ্ঞান। এটাকে তত্ত্বীয় পরিমণ্ডলে বলা হয় হেজেমনি। গ্রামসি মার্ক্সের শ্রেণি-সংঘাতের তত্ত্ব থেকে এই কনসেপ্ট নির্মাণ করেছেন। এর দ্বারা গ্রামসি এমন জ্ঞানকে বুঝিয়েছেন, যা মানুষ বিনা-প্রশ্নে কোনো বিষয়কে সত্য, সঠিক ও স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয় এবং এর পক্ষে যুক্তি দিতে থাকে। যা মানুষের কাছে সত্য, সঠিক ও স্বাভাবিক সেটি তার জন্য তার স্বার্থ হয়ে ওঠে এবং এই স্বার্থ দিয়ে যদি তাকে পরিচালিত করা যায় তবে তাকে যে কোনো ভাবেই পরিচালিত করা যায়। মূল বিষয়টি অনেকটা আদিমতা। রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা বা সহজভাবে বলা যায় ফায়দা হাসিল। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রযুক্তি দাক্ষিণ্যে আমরা যতই আরো বেশি করে এবং ভালো করে জানার সুযোগ পাচ্ছি, ততই বাড়ছে আমাদের আরো কম মানুষের কাছ থেকে আরো অল্প জানার বিপজ্জনক সম্ভাবনা। প্রযুক্তির কল্যাণে গণমাধ্যম এখন হাতের মুঠোয় সহজলভ্য। হাতের কাছে পত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, ইন্টারনেট তথ্য ও বিনোদন পাবার নানা আয়োজন। এসব মাধ্যম ক্রমাগতভাবে যা প্রচার করতে থাকে তাকেই অধিকাংশ মানুষ নিজের জন্য এবং চারপাশের জন্য সত্য বলে ধরে নেয়।

আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজে গণমাধ্যম কতটা প্রভাব ফেলছে বা কিভাবে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়িত করছে এবং গণমাধ্যমকে কিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বা গণমাধ্যম নিজেরা কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে এ বিষয়ে কেউ সচেতন নয়। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ, শিক্ষা, সংস্কৃতির উন্নয়নসহ নানাবিধ উন্নয়নের মাধ্যমে নির্মল আনন্দ প্রদান গণমাধ্যমের কাগুজে নীতিতে থাকলেও সেই নীতি বাস্তবায়নে গোষ্ঠী বা ব্যক্তি মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলো খুব একটা আগ্রহী মনে হয় না। মূল লক্ষ্য গণমাধ্যমের প্রভাব বিস্তার, সেটি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে হোক বা আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে হোক। আর সেই আয় বৃদ্ধি বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন করতে যেয়ে গণমাধ্যমে আমরা নিজেদের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে কখনো কখনো এমন সব বিতর্ক তৈরি করি, প্রচার করি এবং আর এরই সুযোগ নিয়ে সমাজে সুবিধাবাদীরা গণমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে থাকে।

অবশ্যই প্রত্যেকটি গণমাধ্যমের নিজস্ব উদ্দেশ্য আছে, নীতিমালা আছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে গণমাধ্যম নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে (সেটি সৎ হোক আর অসৎ হোক) জনমনোজগতে মতাদর্শ বিস্তারের প্রচেষ্টা চালায়। চমস্কি সমালোচনায় বলেছিলেন কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে পুঁজিবাদী সমাজের প্রতিনিধি গণমাধ্যমের আনন্দ বিনোদন মুনাফায় রূপান্তরিত হয়েছে। তেমনি গণমাধ্যমের বিষয়ব্স্তু পরিচালিত হয় পুঁজিবাদী সমাজের চাহিদার অনুকরণে। পুঁজিবাদী সমাজ সে গণমাধ্যম হোক, আর জনগণ হোক, আর রাজনৈতিক সংগঠন হোক প্রত্যেকে তাদের নিজেদের স্বার্থেই এক এক সময় এক একটি মাধ্যমকে ব্যবহার করছে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য। নিত্য নতুন প্রযুক্তির আবিস্কার হচ্ছে, গণমাধ্যমের সংখ্যাও বেড়েছে, অডিয়েন্সের কাছে এখন বিনোদনের হরেক রকম উপায়। কিন্তু অডিয়েন্স যতই নিজেদের চাহিদা মাফিক নির্বাচন করে গণমাধ্যম ব্যবহার করুক না কেন সব চরিত্র যখন এক রকম হয় তখন নির্বাচন কোনো কাজে আসে না।

তবে আশার কথা এই যে আমাদের জনগণ সচেতন। কোনো গণমাধ্যমের পক্ষে যথেচ্ছাচার করে, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে এখন আর এই সমাজে টিকে থাকা সম্ভব নয়। যে সত্য সে টিকে থাকবে, পক্ষপাতদুষ্টতা সময়ের চাবুকে নিজেই লুটিয়ে পড়বে। আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি তাদের একটি সাধারণ ধারণা জনগণ জটিল রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো বোঝে না এবং তারা চায় কেউ এই জটিল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করুক। মার্কিন দার্শনিক জন ডিইউয়ের মতে, জনগণ শুধু এই বিষয়গুলো বোঝেই না বরং জনগণ চায় পাবলিক ফোরামেই এই বিষয়গুলো আলোচিত হোক এবং তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকুক।

জনগণের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েই গণমাধ্যমেরও বিষয়বস্তু এখন দ্বিমূখী হচ্ছে।গণমাধ্যমের জনসংযোগ বাড়ছে। গণমাধ্যমে জনগনের অংশগ্রহণ যত বেশি হবে, যত বেশি আলোচনা হবে, যত বেশি বিতর্ক হবে ( কুতর্ক নয়) তত বেশি তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। দুয়ার আমাদের উন্মুক্ত। গণমাধ্যমের প্রকৃত উদ্দেশ্য তখনই সফল হবে যখন প্রকৃত অর্থে গণমাধ্যমকে জনগণের জন্য পরিচালনা করা হবে। গণমাধ্যম তখনই কার্যকর হবে যখন জনগণের সাথে বিনিময় হবে পারষ্পরিক।একতরফা প্রচার আগ্রাসনেরই নামান্তর। আবার একথাও সত্যি যে গণমাধ্যম পরিচালনায়, পরিবেশনায় ‍সুদক্ষ কর্মীর প্রয়োজন। বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা, সঠিক রাজনৈতিক চিন্তা, দেশপ্রেম এবং আধুনিক প্রযুক্তি এই সকলের সম্মিলনই পারে গণমাধ্যমকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবন আচার, মাতৃভাষা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব আমরা কেউ অগ্রাহ্য করতে পারব না। নিজ সংস্কৃতির বৈচিত্র ও স্বাতন্ত্রবোধ নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই টিকিয়ে রাখতে হবে। আমরা গণমাধ্যকর্মীরা আমাদের দেশের আত্মপরিচয়ের উৎস হিসাবে কাজ করতে চাই এবং আত্মপরিচয়ের দাবি নিছক আচার অনুষ্ঠানের বিষয় নয়, বরং অনেক বেশি যুক্তিশীল।অন্য প্রতিধ্বনি কোনো কূপমণ্ডকতা, সংকীর্ণতা যেন আমাদের বাস্তবতাকে বিলুপ্ত না করে সেজন্যই প্রয়োজন সৃজনশীলতা, অর্থ বিনিয়োগ, শাসক গোষ্ঠীর স্বাজাত্য প্রেম ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের উপলব্ধিবোধ, জনগণের দেশ ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা। আর তখনই সম্ভব হবে আমাদের গণমাধ্যমকে বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে জোরালো করে বিস্তৃত ভুবণে ছড়িয়ে দেয়া।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন