বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির

Liberation-warবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের যারা যুদ্ধাপরাধসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত পাকিস্তানি নাগরিকদেরও বিচারের আওতায় আনার উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুলের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

নির্মূল কমিটি বলেছে, গত ৩০ নবেম্বর ইসলামাবাদে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর যে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করেছে তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ।

সংগঠনের সভাপতি বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লেখক সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির, সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, চলচ্চিত্রনির্মাতা শামীম আখতার ও সাধারণ সম্পাদক কাজী মুকুল কর্তৃক স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়ঃ

‘বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে পাকিস্তান ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে বাঙালি নিধন, গণহত্যার দায় অস্বীকার করেছে। আমরা স্পষ্ট ভাষায় দৃঢ়ভাবে বলতে চাই— পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ নির্লজ্জ মিথ্যাচার ও সত্যকে মেনে না নেয়ার অপচেষ্টা মাত্র। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী জামায়াত-শিবির চক্র ইতিহাসের যে জঘন্যতম গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তা দিবালোকের মত সত্য। তারা ৩০ লক্ষ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছে, ৬ লাখের বেশি বাঙালি নারীর সম্ভ্রম হরণ করেছে, লুটপাট করে পাকিস্তানে নিয়ে গেছে বাংলাদেশের সম্পদ। বাংলাদেশের স্বাধীন বাঙালি জাতি যেন বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে সে জন্য পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের সেরা বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীদের হত্যা করে গেছে। শুধু তাই নয়— ’৭১-এর পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার জন্য আজও পাকিস্তান সরকার, গোয়েন্দা সংস্থা ‘আইএসআই’ ও তাদের এদেশীয় দোসররা বাংলাদেশের মুক্তমনা প্রগতিশীল মানুষদের একের পর এক হত্যা করে যাচ্ছে— বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য চক্রান্ত অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।

‘পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের এইসব জঘন্য অপরাধের ইতিহাস শুধু যে বাংলাদেশের ঘরে, পরিবারে বা ঐতিহাসিক দলিল বা গ্রন্থে আছে তাই নয়— এই বিষয়ে পাকিস্তানের যে সকল মানুষ সেই সময়ের ঘটনাবলীর সাক্ষী, সেই সব ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেছেন তাদের দলিল, গ্রন্থ বা অনুসন্ধানে প্রমাণিত। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণের পর পর পাকিস্তান তাদের প্রধান বিচারপতি হামিদুর রহমানকে প্রধান করে যে কমিশন গঠন করেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাদের পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে, সেই হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট সেই সব পাকিস্তানী দলিলের অন্যতম। এছাড়াও গোটা বিশ্ব সেই সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতা, স্বাধীনতাকামী বাঙালি নিধন করতে গণহত্যা পরিচালনার সাক্ষী। এ বিষয়ে অনেক আন্তর্জাতিক গবেষণা, দলিল, সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন আজও সহজলভ্য। তারপরও পাকিস্তানের এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার আমাদের ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করেছে।

‘আমরা পাকিস্তানের এমন মিথ্যাচারের শুধু নিন্দা ও প্রতিবাদই করছি না, আমরা পাকিস্তানকে এই মিথ্যাচার করে বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত দেবার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশের এই বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে পাকিস্তানকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই— সত্যকে অস্বীকার করে, মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে এবং অন্যায় ও অপরাধকে প্রশ্রয় দিলে তা যে নিজেরই ধ্বংস ডেকে নিয়ে আসে— তা তারা নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন।

‘আমরা দৃঢ়ভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট একাত্তরে বাঙালি নিধন ও বাংলাদেশে গণহত্যা পরিচালনার জন্য পাকিস্তানের যারা দায়ী তাদের “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)”-এ বিচার, সাজা, ক্ষতিপূরণ ও পাওনা আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে আরও দাবি জানাচ্ছি পাকিস্তানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, ক্ষতিপূরণ আদায় ও নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার জন্য পাকিস্তানের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা যেন পাওয়া যায় তার জন্য উদ্যোগ নিতে। আমরা বিজয়ের মাসে পাকিস্তানকে পরামর্শ দেব বিচারপতি হামিদুর রহমান তাঁর রিপোর্টে যে সব পাকিস্তানীদের বিচার করার কথা বলেছিলেন অবিলম্বে তাদের বিচার শুরু করে— না হলে তারা সারা বিশ্বে একটি যুদ্ধাপরাধী দেশ ও জাতি হিসেবে বিবেচিত হবে।’

আরও পড়ুন