সরকার তাড়াহুড়ো করে কেন অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের উদ্যোগ নিয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সম্পাদকরা। অনলাইনের জন্য প্রণীত খসড়া নীতিমালায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা হয়নি। উল্টো নিয়ন্ত্রণ আরোপের সকল চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
সম্প্রচার কমিশন গঠন করার পর এই গণমাধ্যমটির নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন সম্পাদকরা। একই সঙ্গে ছাপা পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের নিবন্ধনের কোনো দরকার নেই বলেও মত দেন তারা।
মঙ্গলবার তথ্য মন্ত্রণালয়ে ‘জাতীয় অনলাইন নীতিমালা-২০১৫’ এর খসড়ার ওপর অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য তথ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এক বৈঠকে সম্পাদক পরিষদ এবং নোয়াব নেতারা অনলাইন নীতিমালা নিয়ে তাদের বক্তব্য দেন।
‘অনলাইন নীতিমালার যে খসড়াটি দেখেছি তার পুরোটাই নিয়ন্ত্রণমূলক। এর মধ্যে (অনলাইন গণমাধ্যমের) স্বাধীনতার একটি হরফও নেই। আপনারা বলেছেন, এর মাধ্যমে অনলাইন গণমাধ্যমগুলো সরকারের সহযোগিতা পাবে। কিন্তু নীতিমালায় সাহয্যের একটি অক্ষরও দেখা যায় না’— এ মন্তব্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের।
নোয়াব সভাপতি ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে আপনাদের (সরকারের) কী ক্ষতি হয়েছে। আপনারা (নিবন্ধন) নিয়ে কেন তাড়াহুড়ো করছেন তা আমরা বুঝতে পারছি না।’
সম্পাদকদের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এটি একটি প্রাথমিক প্রক্রিয়া। অংশীজনদের মূল্যবান মতামত নেয়া হয়েছে। এ সব পরামর্শের আলোকেই জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। প্রয়োজনে আবারও আপনাদের সঙ্গে বৈঠকে বসা হবে।’
‘বিশ্বব্যাপী সাইবার ক্রাইমের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমরাও এর বাইরে নই। অনলাইন গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের জন্যই এটা দরকার। আজকে শেখ হাসিনার সরকার আছে, তাই কিছু হচ্ছে না। এর পর অন্য সরকার এলে তো অত্যাচার হতে পারে’— যোগ করেন মন্ত্রী।
মতিউর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, ‘আগে থেকেই আমরা শুনে এসেছি সম্প্রচার কমিশন এবং সম্প্রচার আইন হওয়ার পর অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধন হবে। এ সব হওয়ার আগে অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের উদ্যোগ দরকার ছিল না। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যে অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের আহ্বান জানানো হয়েছে এটা ঠিক হয়নি বলে মনে করি।’ ‘নীতিমালা-আইন করে সরকার ভাল করে, আবার অনেক সময় খারাপও হয়। তাই তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। আগে নীতিমালা ও আইন করেন, এর পর অনলাইন নিবন্ধনের উদ্যোগ নিন। আইন না করে নিবন্ধন প্রক্রিয়াটাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছে’— যোগ করেন মতিউর রহমান।
প্রথম আলো সম্পাদক আরও বলেন, ‘আপনারা আইন প্রণয়ন করবেন বলে উপকার করার কথা বলছেন। কিন্তু আমরা যারা আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছি তাদের কেন নতুন করে নিবন্ধন নিতে হবে তা বোধগম্য নয়।’ আপনারা বলছেন বিশ্বের কোথাও অনলাইন নীতিমালা নেই। আমরা এটা করে বিশ্বকে কী দেখাতে চাই? বিশ্বকে দেখানোর মতো আরও অনেক কিছু আছে উল্লেখ করে নোয়াব সভাপতি বলেন, ‘তাই আমি মনে করি নীতিমালা করার আগে দেয়া নিবন্ধনের আদেশ বাতিল করা উচিত। আর অনলাইন গণমাধ্যম যদি ক্ষতিকর কিছু করে তা ধরার জন্য যথেষ্ট আইন রাষ্ট্রের আছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তা প্রয়োগও করা হচ্ছে। তাই অনলাইন নিয়ে এত তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই।’
অনলাইন গণমাধ্যমকে আইনের আওতায় আনার বিষয়ে সরকারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম তার মত দিয়ে বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে নিবন্ধিত পত্রিকা এবং টেলিভিশনের অনলাইন ভার্সনের জন্য আলাদা করে নিবন্ধন রাখার প্রয়োজন নেই।’
এর কারণ ব্যাখ্যা করে ডেইলি স্টার সম্পাদক বলেন, ‘আমরা সরকারের আইন মেনেই আমাদের প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছি। অনলাইন ভার্সনেও আমাদের দায়িত্ব স্বীকার করছি। তাই এই ক্ষেত্রে নতুন করে নিবন্ধন দরকার নেই। এই বিষয়ে আরও কয়েকটি বৈঠক হওয়া দরকার। নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা থাকলে প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের গলা টিপে ধরা হবে।’
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার তার বক্তৃতায় বলেন, ‘শৃঙ্খলার দরকার আছে কিন্তু শৃঙ্খলিত করা যাবে না। ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কী লাভ হল? এই বিষয়গুলো আমলে নিয়ে অনলাইন সংক্রান্ত আইন-নীতি প্রণয়ন করতে হবে।’
তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ সম্পাদকদের বক্তব্যের পরিপ্র্রেক্ষিতে বলেন, অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধনের জন্য যে তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে তা আরও বাড়ানো যাবে। এখন অনলাইন গণমাধ্যমে টেলিভিশনও চালু হয়েছে। তাই এই বিষয়গুলোতে আলাদা নীতিমালা ও আইন প্রয়োজনের কথা অনেকেই বলছেন।
তবে আইন বা নীতিমালার মাধ্যমে গণমাধ্যম শৃঙ্খলিত হয়ে যাবে— সে ধরনের কিছু মাথায় রাখার দরকার নেই। অনলাইন বিষয়ে আইন, নীতিমালা যাই হোক না কেন তার সবকিছু আপনাদের (অংশীজনদের) মতামত নিয়েই করা হবে।
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক শাহ আলমগীর প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং সমকাল সম্পাদকের প্রস্তাব করা পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের প্রয়োজনহীনতার বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।
শাহ আলমগীর তার বক্তব্যে বলেন, ছাপা পত্রিকা এবং টেলিভিশনের জন্য প্রণীত আইন কোনোভাবেই অনলাইন ভার্সনের জন্য প্রযোজ্য নয়। এর জন্য হয় ছাপাখানা আইন সংশোধন করতে হবে, না হয় নতুন আইন কাঠামোর মধ্যে সকল অনলাইন গণমাধ্যমকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন— আইন সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, আইটি বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা খসড়া প্রণয়ন কমিটির প্রধান মোস্তাফা জব্বার ও পিআইবির মহাপরিচালক শাহ আলমগীরসহ বিভিন্ন অনলাইন এজেন্সির নেতৃবৃন্দ।
তবে বাংলাদেশের মূলধারার অনলাইন হিসেবে পরিচিত কোনো অনলাইন গণমাধ্যমের সম্পাদকদের বৈঠকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি।
প্রসঙ্গত, ‘জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা-২০১৫’ এর খসড়ার ওপর সর্বসাধারণের মতামত আহ্বান করে চলতি বছরের ২১ জুলাই খসড়াটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। ১২ আগস্টের মধ্যে মতামত পাঠানোর সময়সীমা বিভিন্ন সংস্থা ও সাধারণের অনুরোধে পরবর্তীতে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃদ্ধি করে মন্ত্রণালয়। প্রাপ্ত মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে মতামতদানকারী সংস্থা ও ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সভাটি আহ্বান করে তথ্য মন্ত্রণালয়।


