বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

ফেসবুক খুলে দেয়ার দাবিতে শাহবাগে অবস্থান ধর্মঘট

Facebook-Shahbagসামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক খুলে দেওয়ার দাবিতে এবার রাস্তায় নামলেন লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট ও অনলাইন ব্যবসায়ীরা। আজ শুক্রবার বিকেলে তাঁরা রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন। এতে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।

‘ফ্রি ফেসবুক ইন বাংলাদেশ’ দাবি নিয়ে শাহবাগের জড়ো হন এই ব্যবসায়ীরা। তাঁদের ব্যানারে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশ সরকার আমাদের সবার প্রিয় মাধ্যম ফেইসবুক খুলে দাও’। নিচে লেখা ছিল ‘লেখক-শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মী-অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট-অনলাইন ব্যবসায়ীদের অবস্থান ধর্মঘট’।

এ নিয়ে বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকার দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ফেসবুকসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বন্ধ করে রেখেছে। ফেসবুকের মাধ্যমে যাঁরা ব্যবসায়িক লেনদেন করেন তাঁরা বলছেন, এরই মধ্যে তাঁদের কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

তাঁদের মধ্যে অনেকেই বই বিক্রেতা, অনেকেই আবার পোশাক বিক্রি করেন এই ফেসবুকে।

ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফেসবুক বেশ জনপ্রিয় হওয়ায় এটাকে অনেকেই ব্যবহার করছেন অনলাইন ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে।

ইফতেখার আহমেদ- বইনিউজ ডট কম নামে একটি পেজ তৈরি করে ফেসবুকের মাধ্যমে বই বিক্রি করেন। ইফতেখার আহমেদ বলেছেন, ‘ আমরা প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকার বই শুধু ফেসবুকের মাধ্যমে বিক্রি করি, এভাবে আর কয়েকদিন বন্ধ থাকলে আমাদের প্রচুর ক্ষতি হবে।’

কেউ কেউ ব্যবসার একটি নাম দিয়ে ফেসবুক পেজ তৈরি করেন, সেই পেজে নির্দিষ্ট পণ্যের ছবি, দাম লিখে দেন।

আগ্রহী ক্রেতারা সেই পেজে লিখে দেন পণ্যটি তিনি কিনতে চান। পরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ক্রেতার ঠিকানায় পৌঁছে যায় পণ্যটি।

ঢাকার মিরপুরের ব্যবসায়ী সাঈদ উজ্জ্বল ফেসবুকে ‘সাদাসিধা’ নামে একটি পেজে বছরখানেক ধরে পোশাক বিক্রি করেন। প্রতি মাসে পোশাক বিক্রি করে তাঁর আয় হয় প্রায় দুই লাখ টাকা।

সাঈদ উজ্জ্বল বলেন, ‘আমার দুজন কর্মচারী আছেন যাঁরা ডেলিভারির কাজ করেন। বিক্রি একদম বন্ধ। এখন কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কষ্ট হচ্ছে। দুই সপ্তাহে ক্ষতি হয়েছে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা।’

ফেসবুকে শুধু যে বই, পোশাক কেনাবেচা হচ্ছে তাই না, প্রতিদিনকার কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে নানা প্রসাধনী, ও ইলেকট্রনিকস পণ্য কেনারও সুযোগ তৈরি করেছেন অনেকে। ফেসবুক খোলা থাকার সময় অনেক ক্রেতা আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন কিন্তু হঠাৎ করেই ফেসবুক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের পণ্যগুলো এখনো পড়ে রয়েছে।

বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি ৭০ লাখের মতো।

আর এই ফেসবুকে নানা পণ্যের বিক্রির এমন পেজের সংখ্যা কয়েক হাজার।

জাহিদ হাসান নামে একজন ফেসবুক ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘সরকার ফেসবুক খোলা রেখেও নিরাপত্তা দিতে পারত, তাঁরা যে যুক্তিটি দিচ্ছেন সেটা একেবারেই খোঁড়া যুক্তি।’

ফেসবুকের মাধ্যমে কেনাবেচা শুধু যে রাজধানীভিত্তিক তাই নয়, ঢাকার বাইরে অনেকে এর মাধ্যমে ব্যবসা করেন, আবার দেশের বাইরে থেকে অর্ডার এলে সেগুলো তাঁরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাঠিয়ে দেন।

এই বেচাকেনার প্রক্রিয়াগুলো হয় যে ফেসবুকে, সেই ফেসবুক দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় বন্ধ থাকায় তাঁদের ব্যবসায় যে ধস নেমেছে সেটা বেশ পরিষ্কার বলে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে।

গত ১৮ নভেম্বর দুপুরে বাংলাদেশে বন্ধ করে দেওয়া হয় ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অ্যাপ্লিকেশনগুলো (অ্যাপস)। সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় এসব সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে।

ওই দিন সকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখে রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায় ঘোষণার পরপরই দেশে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রায় সোয়া ঘণ্টা বন্ধ থাকে সারা দেশের ইন্টারনেট সংযোগও।

কবে নাগাদ ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেওয়া হবে—জানতে চাইলে গত ২১ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, ‘সাময়িক নিরাপত্তার জন্য, জনস্বার্থ, জননিরাপত্তার স্বার্থে যতদিন বন্ধ রাখা প্রয়োজন, ঠিক ততদিনই বন্ধ থাকবে। যখন জননিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেটি নিশ্চিত করবে, তখনই আমরা এটা খুলে দেব।’

ফেসবুকসহ অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে গত ২৩ নভেম্বর ঝিনাইদহ-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী জাতীয় সংসদ ভবনে দশম জাতীয় সংসদের অষ্টম অধিবেশনে বক্তব্য দেন। অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি সংসদে বলেছিলেন, ‘সব প্রযুক্তির ভালো-মন্দ দুটি দিকই আছে। প্রযুক্তির কুফল চিন্তা করে যদি আমরা প্রযুক্তির ব্যবহারই বন্ধ করে দিতাম, তাহলে হয়তো মানবসভ্যতার এই অকল্পনীয় উৎকর্ষতা লাভ হতো না। প্রযুক্তির অপব্যবহারে আরো উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং ব্যবহার ঘটেছে। কিন্তু সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে যদি ভেবে নেয়, ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ একদম বন্ধ হয়ে গেছে, তা মোটেই সঠিক নয়। অনেকেই নতুন নতুন অ্যাপস ব্যবহার করে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন এবং নাশকতাকারীরাও চাইলে সেটি করতে পারবেন না-তা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।’

একই দাবিতে গত ২৭ নভেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্যের সামনে ব্যানার হাতে নিয়ে প্রতিবাদ জানান রাজধানীর তেজগাঁও কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মো. মোখলেছুর রহমান।

এরপর গত ২ ডিসেম্বর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (এআইইউবি) ম্যাস কমিউনিকেশন এবং মিডিয়া আর্টস বিভাগ আয়োজিত মিডিয়া বিতর্ক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ফেসবুক সাময়িক বন্ধ, অচিরেই তা খুলে দেওয়া হবে।’

পরদিন ৩ ডিসেম্বর ফেসবুকসহ বন্ধ থাকা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দেওয়ার দাবিতে রাস্তায় নামেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁরা জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী সব আইন বাতিল করার দাবি জানান। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীবৃন্দ’র ব্যানারে মানববন্ধন করে এই দাবি জানান।

আরও পড়ুন