আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্বে অবহেলা এবং আচরণবিধি সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে খোদ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিরুদ্ধে। নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে স্পষ্ট করে বলা আছে, কোনো দল থেকে একজনের বেশি প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া যাবে না। কোনো পৌরসভায় এক দলের একাধিক মনোনয়নপত্র জমা পড়লে সব ক’টি বাতিল হয়ে যাবে।
বিষয়টি গত ২৪ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদও জানিয়েছিলেন। ইসি সচিব ও একাধিক কমিশনারও মিডিয়ায় বিষয়টি উত্থাপন করলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে এমন অনিয়ম পাওয়া গেলেও ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো একজনের প্রার্থিতা বাতিল করে চরমভাবে বিধি ভঙ্গ করেছে বলে ইসির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। কোনো দল যদি একাধিক প্রার্থী দেয় অবশ্যই তাদের প্রার্থিতা বাতিল হবে।
জানা যায়, বরগুনার বেতাগীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে বর্তমান মেয়র আলতাফ হোসেন ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম কবির মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের দলভিত্তিক মেয়র প্রার্থীদের তালিকায় দেখা গেছে, খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের তিনজন ও মাগুরা সদর পৌরসভায় দুইজন করে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে একজনের প্রার্থিতা রেখে বাকিদের বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী সবার প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথা।
এ ছাড়াও খোঁড়া অজুহাত দেখিয়ে বিএনপি সমর্থিত ১২ জনের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের বাতিল হয়েছে তিনজন প্রার্থীর। তারা সবাই নির্বাচন কমিশনে আপিলের আবেদন করেছেন।
বিএনপির সহদফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু জানান, সরকার দলের চাপে নির্বাচন কমিশন আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে। মনোনয়নপত্র জমা দিতে আমাদের পুলিশ প্রটেকশন নিতে হয়েছে। বিভিন্ন পৌরসভার প্রার্থীদের হুমকি অব্যাহত রয়েছে। এসব বিষয়ে কথা বলতে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল আজ মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাথে সাক্ষাৎ করবে বলেও তিনি জানান।
নির্বাচনী কর্মকর্তাদের এহেন কর্মকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্টরা। গতকাল সোমবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেন, পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, সে বিষয়ে আমারও সন্দেহ আছে। সব মানুষের মনেও সন্দেহ আছে। আমার অনেক প্রার্থীকে নমিনেশন সাবমিট করতে দেয়া হয়নি। এখনো অনেক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র তুলে নেয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়। নির্বাচন কমিশন দলীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে না। এ কমিশনের প্রতি জনগণ আস্থা রাখতে পারছে না। নির্বাচন কমিশন এভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালালে পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া একেবারেই অসম্ভব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফেনী জেলার তিনটি পৌরসভার ৪৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৩৩টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে একজন করে প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। স্থানীয় বিএনপি অভিযোগ করেছে, ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কারণে সাতটি পৌরসভায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেয়র নির্বাচিত হচ্ছে। বাতিলের পরে কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়ার সংখ্যাও অর্ধশত।
এ দিকে ফেনী সদর ও পরশুরাম, চাঁদপুরের ছেংগারচর এবং কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামসহ ১০ পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
আইন অনুযায়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০০ ভোটারের সমর্থনসূচক সই নিয়ে তা মনোনয়নপত্রের সাথে জমা দিয়েছেন। পরে এসব সমর্থনকারীই লিখিতভাবে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন, তারা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পে সই করেননি। যে কারণে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষরকারীর পরবর্তী লিখিত আবেদনে নতুন করে বিতর্কিত হচ্ছে ইসি। দলীয় প্রার্থীরা ভোটার-সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এটা করিয়েছেন।
নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে বলা আছে, কমিশনের কাছে সন্তোষজনক মনে না হলে কমিশন ভোট গ্রহণসহ নির্বাচনের যেকোনো পর্যায়ে সামগ্রিক নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে কমিশন প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করতে পারে। ফেনীর এ ঘটনা নিয়ে রোববার কমিশন বৈঠকে আলোচনা হলেও প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে ইসির একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। দায় এড়াতে ইসির বক্তব্য হচ্ছে ফেনী থেকে একটি অভিযোগও আসেনি। যে কারণে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে কেউ সংুব্ধ হলে তিনি আপিল কর্তৃপ অথবা আদালতে যেতে পারবেন। প্রশ্ন উঠেছে প্রশাসনের একই স্তরের দ্বারা বাতিল হওয়া মনোনয়ন নিয়ে একই ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল কতটুকু গ্রহণযোগ্য হবে।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে সব নির্বাচনেই ইসির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আর তাই এবার আসন্ন ২৩৫ পৌরসভা নির্বাচনে দায় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছে ইসি। সংশোধিত আইন অনুযায়ী বিধি তৈরি, তফসিল ঘোষণার অপেক্ষা, রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ, ছুটির দিনে সচিবালয়ের কাজ নির্ধারণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইসির কৌশলী ভূমিকা লক্ষ্য করা গেছে। তবে এসব কিছুকে সংশ্লিষ্টরা ইসির সমন্বয়হীনতা এবং দাফতরিক অযোগ্যতা হিসেবে দেখেছেন। অবশ্য ইসি কর্মকর্তারা নিজেদের কোনো অযোগ্যতা, সমন্বয়হীণতা এবং গাফিলতি খুঁজে পাননি।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, নির্বাচন পরিচালনার মুখ্য ভূমিকায় থাকেন রিটার্নিং এবং সহকারী অফিসার। আর এবারে পৌরসভা নির্বাচনে ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৬টিতে ইউএনও এবং এডিসিকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। বাকি ৫৮টিতে ইসির কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা করা হয়েছে। আগে এসব পদে প্রশাসন থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হলেও ড. এটিএম শামসুল হুদার কমিশন এ বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া এবং লোকবল নিয়োগ দিয়ে তাদের প্রশিণের ব্যবস্থা করে। এরপরে যথাযথ কর্মকর্তা থাকার পরেও এবারই প্রথম প্রশাসন থেকে এত বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হলো।
এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের পাঁচ-সাত বছর ধরে প্রশিণ দেয়া হয়েছে। তারা ছোট-বড় অনেক নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেছেন। কিন্তু নির্বাচনে ইসির লোকবল কম নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ পৌরসভায় রিটার্নিং কর্মকর্তা করায় নির্বাচনে ইসির নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সারা দেশের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে শোরগোল পড়ে গেলেও নির্বাচন কমিশনে কোনো অভিযোগ পড়েনি। রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে পড়া কোনো অভিযোগও আসেনি সচিবালয়ে। দুইটি অভিযোগ সচিবালয়ে জমা হলেও এ ব্যাপারে কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে আদালতের মাধ্যমে তারা মনোনয়নপত্র জমার সুযোগ পেয়েছে। ওই দুইটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইসি কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় কোনো বিষয়ে ইসিতে অভিযোগ দিতে আস্থা পাচ্ছে না প্রার্থীরা এমনটি মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
১৫৪ মেয়র প্রার্থীসহ ৮৮২ মনোনয়নপত্র বাতিল : পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র, সংরতি কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলর পদে মোট ৮৮২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে মেয়র পদে ১৫৪, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৫৭২ এবং সংরতি কাউন্সিলর পদে ১৫৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের তিনজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও বিএনপির হয়েছে ১২ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র। এ বিষয়ে ইসির উপসচিব সামসুল আলম জানান, সব প্রার্থীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে বা অবৈধ হয়েছে তারা তিন দিনের মধ্যে আপিল কর্তৃপরে কাছে আপিল করার সুযোগ পাবেন।
ইসির সমন্বয় শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১৩ হাজার ৫০৫ প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বাছাইয়ে তিন পদে ৮৮২ জনের প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর বৈধ প্রার্থী রয়েছেন ১২ হাজার ৬৬১ জন। আপিল নিষ্পত্তির পর বৈধ প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৩ ডিসেম্বর। এর পর চূড়ান্ত প্রার্থীরা নিজস্ব প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নামবেন। এবার পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে ২০টি দলীয় এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলে ১০৯৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। সংরতি পদে দুই হাজার ৬৬৮ এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন জমা দেন ৯ হাজার ৭৪১ জন প্রার্থী।
প্রসঙ্গত, আগামী ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৫ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এবারই প্রথম মেয়র পদে দলীয়ভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভাবে প্রশাসননির্ভর ইসি : অভিজ্ঞ কর্মকর্তার অভাবে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে নিজ কে গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তার সংখ্যা কম। আবার মোট অফিসারেরও স্বল্পতা রয়েছে। এ ছাড়া ৮৫ জন কর্মকর্তার নামে মামলা চলছে। কাজেই আমরা প্রশাসন কর্মকর্তাদের দিয়ে নির্বাচন করছি এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয়। পৌরসভা নির্বাচন এবার প্রথম হচ্ছে না। এবারই প্রথম নির্বাচনে ইসির ৬১ জন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে ইসির কর্মকর্তাকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়নি। তা ছাড়া প্রত্যেকটি পৌরসভায় ইসির কর্মকর্তাদের সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
৯ ডিসেম্বর থেকে প্রচারণায় বাধা নেই : নির্বাচনের ২১ দিন আগ থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নামতে পারবেন প্রার্থীরা। সে হিসেবে ৯ ডিসেম্বর থেকে প্রার্থীরা প্রচারণা শুরু করতে পারবেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ১৪ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীক বরাদ্দ দেবে। যেসব মেয়রপ্রার্থী দলীয় ব্যানারে নির্বাচন করছেন তারা বিধি অনুসারে ৯ ডিসেম্বর থেকে প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে পারবেন। কিন্তু স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীকের জন্য আরো পাঁচ দিন অপো করতে হবে বলে জানিয়েছেন শাহনেওয়াজ।
সংরতি নারী প্রতীকের বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতীক দেয়া হয় কাউকে চিহ্নিত করার জন্য। কাউকে আঘাত করা বা অসম্মান করার জন্য নয়। তবে এতে যদি নারী প্রার্থীরা ুব্ধ হন, এগুলো পরে দেখব। সময় স্বল্পতা ও ব্যস্ততার কারণে প্রতীকগুলো নিয়ে আমরা বসতে পারিনি।


