বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

শহীদ জিয়ার হত্যাকারীর সহযোগী পেয়েছে বিএনপির মনোনয়ন!

Touhidul-Panchagar-2খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকারী একজনকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার পর এবার দলের প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যায় অভিযুক্ত একজনের সহযোগীকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। পঞ্চগড় সদর পৌরসভায় বিএনপি’র এই প্রার্থী হলেন তৌহিদুল ইসলাম। জিয়াউর রহমানকে হত্যায় জড়িত বলে সন্দেহভাজন একজনের সেনাবাহিনীর গাড়ি চালক ছিলেন এই তৌহিদুল ইসলাম। বিভিন্ন সময়ে তাকে নিয়ে এই তথ্য আড়ালে-আবডালে বলা হলেও এবার পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পঞ্চগড়ের বিএনপি সমর্থকদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এসব তথ্য জানায়।

প্রাথমিক পর্যায়ের পড়ালেখা শেষ করে তৌহিদুল ইসলাম যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে। সেখানে তিনি গাড়ি চালকের দায়িত্ব পান। জিয়াউর রহমান হত্যার সঙ্গে জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুবের সেনাবাহিনী থেকে পাওয়া গাড়ি চালাতেন তৌহিদুল ইসলাম। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর লে. কর্নেল মাহবুবকে সামরিক আদালতের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সঙ্গী হিসেবে ‘ষড়যন্ত্রে থাকায়’ তৌহিদুলকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর চাকরিচ্যুত হয়ে পঞ্চগড়ে আসেন তিনি।

ঢাকায় সেই সময়কার ‘জাতীয় ‌ষড়যন্ত্র’কে কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতায় তৌহিদুল রাজনীতিতে নেমে পড়েন। স্বৈরাচার এরশাদের জাতীয় পার্টি গঠনের পর তিনি পঞ্চগড়ে জাতীয় পার্টির কর্মী হিসেবে নাম লেখান। তবে কিছুদিন পরই যোগদান করেন শফিউল আলম প্রধানের জাগপা’তে।

শফিউল আলম প্রধান যেদিন বেগম খালেদা জিয়াকে ‘ঘষেটি বেগম’ বলে উল্লেখ করে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেদিন সজোরে করতালিদাতাদের মধ্যে তৌহিদুল ইসলামও ছিলেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন। জাগপায় কিছুদিন থেকে তিনি ফের যোগদেন জাতীয় পার্টিতে। জাতীয় পার্টির আনুকূল্যে তিনি স্থানীয় একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন। তবে এরপর এরশাদ সরকারের পতন হওয়ায় রাজনীতিতে তেমন সুবিধা করতে পারেননি।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিতে তিনি আওয়ামী লীগে ভেড়ার চেষ্টা চালান। তবে আওয়ামী রাজনীতিতেও সুবিধা না হওয়ায় ফিরে আসেন জাগপা’তে। জাগপাতেও সুবিধা করতে না পেরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে চলাফেরা করতে থাকেন। একই সময়ে তিনি বিএনপি’র সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করতে থাকেন। স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতাও গড়ে তোলেন তিনি। তবে তখনও বিএনপিতে পাকাপাকিভাবে অবস্থান গড়তে পারেননি।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পর এক পর্যায়ে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে পঞ্চগড়ের সাংসদ ও পরবর্তীতে স্পীকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকারকে ভুল বুঝিয়ে সহানুভূতি আদায় করে শুরু করেন বিএনপি রাজনীতি। নির্বাচিত হন পৌরসভার মেয়র। যদিও এর আগে পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে সুবিধা পাননি।

পঞ্চগড়ের স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, চেয়ারম্যান হওয়ার পর তৌহিদুল হয়ে ওঠেন দুর্নীতিবাজ একজন ব্যক্তিতে। পৌরসভা কেন্ত্রীক দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী বিএনপি নেতা, যারা আবার ব্যারিস্টার জমির উদ্দীন সরকারের ঘনিষ্ঠজন বলেও চিহ্নিত। তৌহিদুলের এই দুর্নীতিতে কোনও রাখ-ঢাক ছিল না। বিষয়গুলো নিয়ে তৃণমূল ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা অনেকবার সাবেক স্পীকারের কাছে অভিযোগ করেও কোনও ফল পায়নি।

জানা যায়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে পঞ্চগড়ে সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র ভরাডুবির পেছনে  তৌহিদুলের দুর্নীতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। এর পরবর্তীতেও তৌহিদুলের দুর্নীতি চলমান থাকে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি বিএনপি’র সময়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগ কমিটির সদস্য হয়ে, দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগেও ব্যাপক দুর্নীতির আশ্রয় নেন। এছাড়া পৌরসভার টেন্ডারবাজি ও দোকান বরাদ্দেও অনিয়মের কথা সর্বজনবিদিত।

স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, তৌহিদুলের ‘ক্ষমতার প্রাথমিক উৎস’ পঞ্চগড়-২ থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য মোজাহারুল ইসলাম। ওয়ান ইলেভেনের সময়কালে বিএনপির ‘সংস্কারবাদী’ হয়ে ওঠা সাবেক এই সাংসদ মোজাহারুলের মাধ্যমে তৌহিদুল অবশ্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আশীর্বাদ পেতে সক্ষম হন। এছাড়াও তৌহিদুলের জামাতা ডা. ফিরোজ ড্যাব-এর একজন নেতা হিসেবেও পরিচিত।

সর্বোপরি স্থানীয় বিএনপির সূত্রগুলো জানায়, বিএনপির সমর্থনে পৌর মেয়র নির্বাচিত হলেও বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো বরাবরই এড়িয়ে চলতেন তৌহিদুল। ২০০৬ সালের ২৮  অক্টোবরের আগে-পরে সহ পরবর্তীতে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোতে নানাছুতায় পঞ্চগড়ে অনুপস্থিত থাকতেন তৌহিদুল। এছাড়াও তাঁর সঙ্গে নিয়মিত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সময়ে আর্থিক লেনদেনের কথাও জানা যায় এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসে তিনি নিয়মিত যাতায়াত করেন।

এসব ব্যাপারে জানতে যোগাযোগ করা হলে পঞ্চগড় পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী তৌহিদুল ইসলাম নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমকে বলেন, ‘আমি সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলাম। জিয়ার সৈনিক ছিলাম। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’

তৌহিদুল অভিযোগকে মিথ্যা বলে দাবি করলেও স্থানীয় বিএনপির সূত্রগুলো দলীয় রোষানলের ভয়ে নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি নন। তারা বলছেন, আগে তৌহিদুল চেয়ারম্যান হলেও এবার দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পঞ্চগড় শহর বিএনপির অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাই তৌহিদের পক্ষে কাজ করবেন না। কারণ, জিয়াউর রহমানের হত্যাকারীর সঙ্গে থাকা কোনো ব্যক্তিকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তারা মেনে নিতে পারছেন না।

প্রসঙ্গত, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা সংক্রান্ত মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি জাহাঙ্গীর কামালের হাতে মাদারীপুরের শিবচর পৌরসভায় বিএনপি ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়েছে। সেখানে চেয়ারপারসনকে না জানিয়ে বিশাল আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে আসামিকে মনোনয়ন দেয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠেছে। ২০০১ সালে খুলনা সফরের সময় কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটে খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলায় দায়েরকৃত মামলার আসামি ছিলেন জাহাঙ্গীর কামাল। পরে যদিও মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নিতে সক্ষম হন জাহাঙ্গীর কামাল।

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।

 

 

আরও পড়ুন