গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা অষ্টম বেতন স্কেলের ব্যাপারে ‘প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি’ শনিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, জাতীয় বেতনস্কেলে আগের তুলনায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মর্যাদাগত ও আর্থিক সুবিধা কমানো যাবে না। সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেলকে যে নামই দেয়া হোক না কেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মর্যাদাগত ও আর্থিক সুবিধা অক্ষুন্ন রাখতে হবে। বিদ্যমান সুবিধা বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর বেতনস্কেল দেওয়া হয়, কমানোর জন্য নয়। যদি জাতীয় বেতনস্কেলের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের মর্যাদা হানি ঘটে বা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় তবে তা কোনভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটিরনেতৃবৃন্দ যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলেন।
প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির যৌক্তিক দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫, শনিবার, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এসময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ নেয়া না হলে আন্দোলনের বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি জানতে পেরেছে যে, জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ তে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল রাখা হচ্ছে না। একইসাথে চাকুরিজীবীদের জন্য আইনগত অধিকার হওয়া সত্ত্বেও বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি একবছরের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে। এছাড়াও ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য চাকুরিতে যোগদান স্কেল হিসেবে অষ্টম গ্রেড এবং ননক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য নবম গ্রেড করার মাধ্যমে নতুন করে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি এসব বিধান কেনাভাইে মেনে নেবে না। এসব অনিয়ম দূর করে মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা বহাল রেখে অতিদ্রুত জাতীয় বেতনস্কেলের প্রজ্ঞাপন জারির জোর দাবি জানাচ্ছে।
প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি বার বার জানিয়েছে যে, সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল বন্ধ করা হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে এমনকি একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম মর্যাদাগত ও আর্থিক বৈষম্য সৃষ্টি হবে। সকল ক্যাডার ও সার্ভিসে পদোন্নতির সুষম ব্যবস্থা না থাকায় সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল চালু করা হয়। অনেক বছর যাবত এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ বিষয়ে কোন মহল থেকে কখনোই আপত্তি জানানো হয় নি। অপরদিকে সরকারের বিশেষ পদ হিসেবে চিহ্নিত উপসচিব থেকে সিনিয়র সচিব পর্যন্ত পদগুলোতে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন করে অনুমোদিত পদের চেয়ে অধিক সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি প্রদান করা হচ্ছে। এতে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা লাভবান হলেও অন্যান্য ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন না করায় কর্মকর্তারা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে বছরের পর বছর একই পদে কাজ করছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে দাবি জানানো সত্ত্বেও কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। অথচ সুপারনিউমারারি পদ সৃজনের মাধ্যমেও পদোন্নতির সুষম অবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব। সুপারনিউমারারি পদ সৃজন বা পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি না করে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল বন্ধ করে দেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল সুবিধা বহাল রাখা ও সকল ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদ সৃজনের জন্য আবারো জোর দাবি জানাচ্ছে।
বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি একজন কর্মকর্তার চাকরিগত আইনানুগ অধিকার। এ অধিকার বন্ধ করা হবে আইন পরপিন্থী কাজ। সরকারি কর্মচারি শৃঙ্খলা ও আপিল বিধিমালা ১৯৮৫ অনুযায়ী কোন কর্মকর্তা-কর্মচারির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের শাস্তি হিসেবে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখা হয়। বলা হচ্ছে পয়লা জুলাই তারিখে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারির বেতন বৃদ্ধি হিসেব গণনার জন্য বার্ষিক বেতনবৃদ্ধি এক বছরের জন্য স্থগিত রাখা হচ্ছে। অথচ বেতন নির্ধারণকালে একটি ইনক্রিমেন্ট যোগ করে এর সহজ সমাধান করা যায়। এতে সরকারের আর্থিক সংশ্লেষও নগন্য।
আমরা আরো বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করছি যে, জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ তে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য অষ্টম গ্রেড ও ননক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য নবম গ্রেড নির্ধারণ করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থা চালু করা হলে গোটা জাতির জন্য এক ভয়ানক বিপর্যায় ডেকে আনবে। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে অধিকাংশই ননক্যাডার কর্মকর্তা। মেধা ও যোগ্যতার মাপকাঠিতে কোনভাইে ননক্যাডার কর্মকর্তাগণ ক্যাডার কর্মকর্তাদের তুলনায় নি¤œমানের নয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সাধারণত মেধাবীরাই যোগদান করে থাকে। দেশের খাদ্য ও আমিষের উৎপাদন বৃদ্ধি, বিদ্যুৎখাতের অগ্রগতি, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মেধাবীরা নিয়োজিত থেকে দেশের উন্নয়নে অনন্য অবদান রেখে যাচ্ছে। তারা সবাই ননক্যাডার কর্মকর্তা। চাকুরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে এমন মর্যাদাহানি করা হলে মেধাবীরা বৈজ্ঞানিক বা গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানে যোগদানে নিরুৎসাহীত হবে। এ ছাড়া সরকারি প্রকৌশলীদের মধ্যে ৮০ ভাগই ননক্যাডার কর্মকর্তা। তাই প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে যোগদানের ক্ষেত্রে এমন বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চালু করা হলে এক ভয়াবহ বিপর্যায় দেখা দেবে। প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে যোদানের এমন বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা চালুর তীব্র প্রতিবাদ এবং এ উদ্যোগ বন্ধ করার জোর দাবি জানাচ্ছে।
আমরা উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ১৪ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে জারিকৃত উপজেলা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অফিস স্মারক এখন পর্যন্ত বাতিলের কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নি। এ অফিস স্মারকটি বাতিলের জন্য প্রকৃচি-বিসিএস সমন্ববয় কমিটি বার বার দাবি জানিয়ে আসছে। সংবিধান মোতাবেক সরকারি কর্মকর্তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে জবাবদিহি করবে। এক বিভাগের কর্মকর্তা অন্যবিভাগের কর্মকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে পারে না। ইউএনও নিজেও উপজেলা পরিষদে ন্যস্ত কর্মকর্তা। তাই তার কাজের বিষয়েও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে জবাবদিহি করতে হবে। উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা অফিস স্মারক সংবিধান সম্মত নয়। অবিলম্বে এ অফিস স্মারক বাতিল করতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ১৯৮৫ সালের এরশাদ সরকারের বিতর্কিত অফিস স্মারক বঙ্গানুবাদ করে নতুনভাবে জারি করে ইউএনওকে জবাবদিহির ঊর্ধে রেখেছে এবং অন্যান্য বিভাগের কার্যক্রমের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করেছে। সামরিক সরকার এরশাদের আমলে প্রণীত উপজেলা আইন পরবর্তীতে বাতিল করা হয়। কিন্তু সে আইনের আওতায় প্রণীত অফিস স্মারক নতুনভাবে জারি করে উপজেলা পরিষদের কোন ক্ষমতায়ন করা হয় নি। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়নের আগেই সুকৌশলে ২০১১ সালে আইনের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হয়। প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি ২০১১ সালে সংশোধিত ৩৩ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে ১৯৯৮ সালের আইন বহাল রাখার জোর দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের চলমান উন্নয়ন কর্মসূচি বাঁধাগ্রস্ত হবে এবং তৃণমূল পর্যায়েও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সৃষ্টি করা হবে।
প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি মনে করে, একজন অপশোদার ব্যক্তি সকল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে পারে না, যা আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রে বিদ্যমান। বিশে^র কোথাও এমন আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই। ঔপনিবেশিক ধাঁচের আমলাতন্ত্রের কারণে বাংলাদেশের অগ্রগতি কম হয়েছে। স্বাধীন দেশের উপযোগী গণমুখী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে দেশের উন্নয়ন আরো গতিশীল হবে। তাই বিদ্যমান আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে স্বাধীন দেশের উপযোগী গণমুখী, কল্যাণ ও সেবাধর্মী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য কৃত্য পেশাভিত্তিক প্রশাসনের বিকল্প নেই।
প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি এসব দাবি-দাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত সরকারের নীতিনির্ধারকগণের সাথে আলোচনা করে আসছে। অর্থসচিব, অর্থমন্ত্রীসহ বেতন বৈষম্য দূরীকরণ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্যগণের সাথে বৈঠক করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রিসহ কমিটির সদস্যগণ দাবিগুলোর যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে সমাধানের আশ^াস দিয়েছেন। কিন্তু বিশ^স্ত সূত্রে জানা যাচ্ছে যে, প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটির যৌক্তিক দাবিগুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে জাতীয় বেতনস্কেল ২০১৫ এর প্রজ্ঞাপন জারি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় বেতনস্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল পুনর্বহাল, উপজেলা পরিষদের ক্ষমতায়নের নামে ইউএনও’র কর্তৃত্ব প্রদান সংক্রান্ত অফিস স্মারক বাতিল, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন, নিজস্ব ক্যাডার ও ফাংশনাল সার্ভিস বহির্ভূত সকল ধরনের প্রেষণ বাতিল, সকল ক্যাডার ও ফাংশনাল সার্ভিসে পদোন্নতির সমান সুযোগ প্রদান, সকল ক্যাডার ও সার্ভিসে সুপারনিউমারারি পদ সৃজন, এবং কৃত্য পেশাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে তোলার জন্য আবারো জোর দাবি জানাচ্ছে। অন্যথায় যেকোন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের বহন করতে হবে।
বিবৃতিতে সই করেছেন: প্রকৌশলী মো: আব্দুস সবুর, সচিব, প্রকৃচি কেন্দ্রীয় স্টিয়ারিং কমিটি ও সম্মানী সাধারণ সম্পাদক, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, কৃষিবিদ মো: মোবারক আলী, সচিব, প্রকৃচি কেন্দ্রীয় স্টিয়ারিং কমিটি ও মহাসচিব, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, প্রফেসর ডা: এম, ইকবাল আর্সলান, সচিব, প্রকৃচি কেন্দ্রীয় স্টিয়ারিং কমিটি ও মহাসচিব, বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন এবং মো: ফিরোজ খান, সদস্য-সচিব, প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় কমিটি ও মহাসচিব, বিসিএস সমন্বয় কমিটি।


