বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

একজন বীরাঙ্গনার নীরবতা ভাঙার গাঁথা. . .

দীর্ঘ ৪৪ বছর। দুঃসহ এক কষ্ট চেপে রেখেছিলেন রত্না চক্রবর্তী। আর পারলেন না। নীরবতা ভেঙে জানালেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা কীভাবে লাঞ্ছিত-নির্যাতিত হয়েছিলেন তিনি। এখন চান, বীরাঙ্গনার স্বীকৃতি।

সেই সময়ের কথা জানতে চাইলে রত্না প্রথমে বলেন, ‘কী হবে এগুলো লিখে? শেষে হয়তো আমার ঝাড়ুদারের চাকরিটাও চলে যাবে। কেউ কি শুনবে আমাদের পুরোনো কষ্টের কথা?’ পরে অবশ্য অভিমান আর এত দিনের চাপা কষ্ট সরিয়ে রেখে বলতে থাকলেন সেই সময়কার কথা। বললেন, লোহাগাড়ার সুখছড়ির ব্রাহ্মণপাড়ার এক পরিবারে তাঁর জন্ম। ১৯৭১ সালের ৩০ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা ব্রাহ্মণপাড়া, রাজবাড়ী, কলাউজানে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। যাওয়ার সময় তাঁকে তুলে নিয়ে যায় হানাদার বাহিনী।

ওই দিনের ঘটনা সম্পর্কে সুখছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা আবদুস সোবাহান বলেন, ওই দিন হঠাৎ করে পাকিস্তানি সেনারা ব্রাহ্মণপাড়ায় হামলা চালায়। গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ গাছে, কেউবা ঝোপ-ঝাড়ে লুকিয়ে আশ্রয় নেন। গাছে লুকিয়ে থাকা সাতজনকে পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়। শহীদ হন পুলিন বিহারী দাশ, হিমাংশু বিমল দাশ, রণজিত দত্ত, দুলাল দাশ, উপেন্দ্র লাল দাশ, নলিনী রঞ্জন দাশ ও তেজেন্দ্র লাল দাশ। সৈন্যরা চলে যাওয়ার সময় ঝোপের ভেতর লুকিয়ে থাকা ১৫ বছর বয়সী কিশোরী রত্নাকে টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। প্রায় এক মাস দোহাজারীতে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চলে রত্নার ওপর। একপর্যায়ে মৃত ভেবে তাঁকে ক্যাম্পের বাইরে ফেলে দেয়। অজ্ঞান অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করেন জনৈক বাদল চক্রবর্তী। চিকিৎসা শেষে ধীরে ধীরে সুস্থ হন তিনি। পরে বাদল তাঁকে বিয়ে করেন।

রত্না জানালেন, লজ্জায় ছেলে-মেয়েদের তিনি এ কথা কখনো বলেননি। ছেলে-মেয়েরা যার যার মতো সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই সংসার চালাতে আর স্বামীর চিকিৎসা খরচ জোগাতে তিনি চট্টগ্রাম শহরের একটি বিপণিবিতান কেন্দ্রে ঝাড়ুদারের কাজ নেন। তাঁর স্বামী বাদল চক্রবর্তী এক প্রকার বিনা চিকিৎসায় এ বছরের জুলাই মাসে মারা গেছেন। স্বামী চেয়েছিলেন, বীরাঙ্গনা হিসেবে রত্না যেন স্বীকৃতি পান। এ কারণেই তিনি গত ২২ এপ্রিল লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে বীরাঙ্গনা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আবেদন করেন।

লোহাগাড়ার ইউএনও মো. ফিজনূর রহমান  বলেন, ‘রত্না চক্রবর্তীর আবেদন পাওয়ার পর সরেজমিনে সুখছড়ি গ্রামে তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন