উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হওয়া দুই লাখ কর্মচারীর জ্যেষ্ঠতা ও বকেয়া সুযোগ-সুবিধা নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে সরকার। সর্বোচ্চ আদালত এসব কর্মচারীর প্রকল্পে যোগদানের দিন থেকে চাকরির কাল গণনার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার বলছে, আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে গেলে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার দরকার হবে। সরকারের জন্য এটা খুবই কঠিন ব্যাপার।
১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে দুই লাখ কর্মচারী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়ে এসেছেন। তাঁদের সবার বেলায় আদালতের রায়টি প্রযোজ্য।
কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় এ বিষয়টি সমাধানের সুযোগও আর সরকারের হাতে নেই। কারণ, উচ্চ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে দুই দফায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা হলে তা খারিজ হয়ে যায়। সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর বিশেষ পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করেছেন আদালত। ফলে এখন রায় বাস্তবায়ন করা ছাড়া সরকারের সামনে আর কোনো পথ নেই। চাকরির গণনাকাল নিয়ে দেড় বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, তাতে বলা হয়, প্রকল্পে যোগ দেওয়ার দিন থেকেই চাকরিকাল গণনা করতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রে বলা হয়েছে, আদালতের রায় বাস্তবায়ন করতে গেলে আনুমানিক ছয় হাজার কোটি টাকা লাগবে। এ ছাড়া তাতে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে, রাজস্ব খাতের কর্মকর্তারা জ্যেষ্ঠতা হারাবেন এবং বেতনের ভারসাম্য নষ্ট হবে। সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বাড়বে বলে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে যাবে।
আদালতের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘এটির বাস্তবায়ন অবাস্তব ও অসম্ভব।’
এ বিষয়ে অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘আদালতের রায়ের বিষয়ে কিছু বলা কঠিন। তার চেয়ে কঠিন রায় বাস্তবায়ন করা।’ গত ২৩ নভেম্বর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে লেখা এক চিঠিতেও অর্থসচিব বলেন, ‘আর্থিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ রায় বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুরূহ।’
তবে অর্থমন্ত্রী ও অর্থসচিবের বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে চাকরিতে আসা কর্মচারীদের।
গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রায় বাস্তবায়নে ৫০০ কোটি টাকার বেশি লাগবে না। কারণ, এই দুই লাখের বড়জোর ২৫ শতাংশ এখন চাকরিতে আছেন। বাকিরা অবসরে চলে গেছেন। আর প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, সবাই তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।’
এদিকে আদালতের রায়ের পরও দেড় বছর তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় ইতিমধ্যে অর্থসচিবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর এ বিষয়ে শুনানি হয়েছে। পরবর্তী শুনানি ১২ জানুয়ারি। এমন পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে জানতে চাইলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘পূর্ণাঙ্গ রায় না দেখা পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব নয়।’
তবে রিটকারীদের আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালতের রায় পরিপালন করা সরকারের জন্য বাধ্যতামূলক।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ-সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি এখনো বের হয়নি।
জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, আদালতের রায় সরকারের না মানার সুযোগ নেই। না মানলে আদালতের হাতে মানতে বাধ্য করার হাতিয়ারও রয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলে তা আদালতকে বোঝানোর দরকার ছিল সরকারের। আদালত তো আর দেশের বাইরের কিছু নন। এখন বললে লাভ হবে কী?’
‘উন্নয়ন প্রকল্প থেকে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত পদের পদধারীদের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালা, ২০০৫’ জারি হয়। ২০০৮ সালে অর্থ বিভাগ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে এক চিঠিতে জানায়, রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত পদের পদধারীদের প্রকল্পের চাকরিকাল গণনা করে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল দেওয়ার অবকাশ নেই। আড়াই বছর পর ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে অর্থ বিভাগ মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসনসচিবকে একই বিষয়ে আরেকটি চিঠি দেয়। এ দুই চিঠিকে চ্যালেঞ্জ করে কর্মচারীরা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ২০১১ সালের অক্টোবরে। হাইকোর্ট বিভাগ ২০১২ সালের মে মাসে অর্থ বিভাগের দুই চিঠিকে বেআইনি ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন। এর বিরুদ্ধে সব কটি আপিলেই হেরে যায় সরকার।


