বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

দুই মন্ত্রীর পর তিন এমপিকেও দায়মুক্তি

030807Pic-03পৌরসভা নির্বাচনের আচরণবিধি ভাঙার পর দুঃখ প্রকাশ করায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তিন সংসদ সদস্যের (এমপি) অপরাধ ক্ষমা করে দায়মুক্তি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তাঁরা হলেন ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য এম এ মালেক, নাটোর-২ আসনের মো. শফিকুল ইসলাম শিমুল ও বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিমন। গতকাল সোমবার ইসি এ-সংক্রান্ত চিঠি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠিয়েছে। এর আগে ইসি তথ্য ও ধর্মমন্ত্রীকে একই অপরাধের দায় থেকে অব্যাহতি দেয়।

আবার তিন এমপিকে দায়মুক্তি দেওয়ার দিন গতকাল নতুন করে মন্ত্রী-হুইপসহ পাঁচ এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ইসি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছে। এ ছাড়া বরগুনার জেলা প্রশাসক (ডিসি) এসপি, ওসি ও রিটার্নিং অফিসারকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কারণ দর্শাও নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়েছে।

দায়মুক্তিসংক্রান্ত চিঠির সত্যতা স্বীকার করে ইসির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, তিনজন এমপি পৌর নির্বাচনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছিলেন। এ অপরাধে কমিশন তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠায়। ইসির চিঠির জবাবে তাঁরা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অপরাধ স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেন। সে জন্য ইসি মানবিক কারণে ওই অপরাধ থেকে তাঁদের দায়মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসি সচিবালয়কে চিঠি পাঠানোর নির্দেশ দেয়। ওই নির্দেশের আলোকে সোমবার (গতকাল) তাঁদের ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, গত ৩ ডিসেম্বর বরগুনা-২ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় এমপি শওকত হাচানুর রহমান রিমন বেতাগী পৌরসভায় আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থীর মনোনয়ন নিয়ে হেলিকপ্টারে বেতাগী যান। ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার নিয়ে দুপুরে এমপি বেতাগী হাই স্কুল মাঠে অবতরণ করেন। সেখান থেকে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে শোডাউনসহ উপজেলা চত্বরে এমপির অফিসে এসে মেয়র পদপ্রার্থী এ বি এম গোলাম কবিরের হাতে মনোনয়নপত্র তুলে দেন। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদ্যের এ ধরনের দৃশ্যমান আচরণবিধি লঙ্ঘনে নির্বাচন কমিশন অসন্তোষ প্রকাশ করলেও আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। সংসদ সদস্য এম এ মালেক (ঢাকা-২০) ও শফিকুল ইসলামকেও (নাটোর-২) নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য শোকজ নোটিশ দেয় কমিশন।

এরপর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পেয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের নির্দেশ দেয় কমিশন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসাররা ইসিকে লিখিতভাবে জানান, মন্ত্রীরা আচরণবিধি ভেঙেছেন—তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রিটার্নিং অফিসারদের এই বক্তব্য পাওয়ার পর ইসি দুই মন্ত্রীকে দায়মুক্তি দেয়।

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনে আচরণবিধি ভঙ্গ করায় যশোরের সংসদ সদস্য আফিল উদ্দিন ও মনিরুল ইসলামের নির্বাচনী ফলাফলের গেজেট প্রকাশ কিছুদিনের জন্য স্থগিত রাখে ইসি। পরে ওই গেজেট প্রকাশ করে তাঁদের সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়।

এর আগে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন নবম সংসদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অপরাধে মামলা করেছিল। তবে সে মামলায় সাক্ষী দিতে কেউ রাজি হয়নি।

মন্ত্রী-হুইপসহ পাঁচ এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নির্দেশ : পৌর নির্বাচনের আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রী-হুইপসহ পাঁচ এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রিটার্নিং অফিসারদের চিঠি দিয়েছে ইসি। গতকাল নির্বাচন কমিশনের উপসচিব রকিবউদ্দীন মণ্ডলের সই করা এসব চিঠি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারদের কাছে পাঠানো হয়।

ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, যেসব সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ এসেছে তাঁরা হলেন—সিরাজগঞ্জ সদর আসনের এমপি মোহাম্মদ নাসিম (স্বাস্থ্যমন্ত্রী), শেরপুর সদরের আতিউর রহমান আতিক (জাতীয় সংসদের হুইপ), রাজশাহীর তাহেরপুরের এমপি এনামুল হক, ময়মনসিংহের নান্দাইলের এমপি আনোয়ারুল আবেদীন খান ও ফেনীর এমপি নিজাম হাজারী।

জানা যায়, গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে দল মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি দেওয়ায় ওই মন্ত্রী, হুইপ ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী বলেন, “বর্তমানে যে আইন রয়েছে তাতে এসব অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রিটার্নিং অফিসারদের দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধির লঙ্ঘন হলে রিটার্নিং অফিসার বা নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা ‘অন দ্য স্পট’ ব্যবস্থা নেবেন। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে আমরা সব রিটার্নিং অফিসারকে নির্দেশ দিয়েছি। আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”

এ ছাড়া বরগুনা পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বি?দ্রোহী প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনায় গতকাল জেলা প্রশাসক মীর জহুরুল ইসলাম, জেলা পুলিশ সুপার বিজয় বসাক, রিটার্নিং অফিসার (অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও থানার ওসি রিয়াজ হোসেনকে তিন দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে ইসি।

ইসি সচিবালয়ের উপসচিব মো. সামসুল আলমের সই করা শোকজ নোটিশ গতকাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইসিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গত ১৪ ডিসেম্বর বরগুনা সদর পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র শাহাদত হোসেনের পথসভায় হামলা চালায় যুবলীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু নির্বাচন ও জেলার আইনশৃঙ্খলার দা?য়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা এ বিষয়ে প্রতিকারমূলক কোনো ব্যবস্থা নেননি।

এর আগে ১২ এমপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রিটার্নিং অফিসারদের চিঠি দেয় ইসি। তাঁরা হলেন—হবিগঞ্জের অ্যাডভোকেট আবু জাহির, শরীয়তপুরের নাহিম রাজ্জাক, নাটোরের অধ্যাপক আবদুল কুদ্দুস, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, জয়পুরহাটের আল মাহমুদ স্বপন, কিশোরগঞ্জের অ্যাডভোকেট সোহরাবউদ্দিন আহমেদ ও আফজাল হোসেন, ফরিদপুরের মো. আবদুর রহমান, রাজশাহীর আব্বাস আলী এবং সিরাজগঞ্জের হাসিবুর রহমান স্বপন।

পৌর নির্বাচনের আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমমর্যাদার কোনো সরকারি সুবিধাভোগী ব্যক্তি, সংসদ সদস্য ও সিটি করপোরেশনের মেয়ররা নির্বাচনী প্রচার বা নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। এ আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও আছে ইসির।

আরও পড়ুন