বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

সুইডেনে ছয় ঘন্টা কর্মসময় আসলে সত্য নয়

dablu_মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে।

সুইডেনে দৈনন্দিন কাজের সময় আট ঘন্টা থেকে কমিয়ে ছয় ঘন্টা করার বেপারে চলতি বছরের অক্টোবরে মিডিয়ায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর দেশ ও বিদেশে অনেকেই আমাকে টেলিফোন করে বলেছেন আপনারা তো ভাই অনেক আরামেই আছেন, মাত্র ছয় ঘন্টা কাজ? আপনাদের জীবন সার্থক। কেউ কেউ আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করেছেন এ কি করে সম্ভব? দিনে ছয় ঘন্টা কাজ করলেতো কোম্পানি লাঠে উঠবে? আসলেই কি সুইডেনে কাজের সময় ছয় ঘন্টা? যেখানে কাজের সময় বৃদ্ধি করার কথা সেখানে সুইডেন কি করে চলছে উল্টো পথে? ইত্যাদি অনেক প্রশ্নই চলে আসে সামনে।

সম্প্রতি Science Alert website সুইডেন জুড়ে ছয় ঘন্টা কর্মসূচির কথা ফলাও করে প্রথমে প্রকাশিত করলেও বাস্তবে মাত্র কয়েকটি কর্মস্থল ছাড়া আর কথাও এই নিয়মের প্রতি এখন পর্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করা হয়নি। Science Alert মতে সুইডেনের কিছু কিছু হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্সরা দিনে ছয় ঘন্টা কাজ করছে বলে বলা হয়েছে। এছাড়া গুতেনবর্গের একটি অবসরপ্রাপ্তদের হোমে পরীক্ষামূলকভাবে চলতি বছর থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ছয় ঘন্টা কাজের সময় চালু করা হয়েছে বলে বলা হয়েছে। ফলে এই হোমে কর্মী নিয়োগের খরচ, রোগীর প্রতি যত্ন বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে বলেও পত্রিকাটি প্রকাশ করেছে। কিন্তু আসলে বিষয়টি এমন নয়।

এধরনের সংবাদের আদৌ পরিপূর্ণভাবে কোনো বাস্তবতা নেই বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। সুইডেনের দুই একটা কর্মস্থলে পরীক্ষামূলকভাবে এমন বেবস্থা গ্রহণ করলেও সারা সুইডেনে এখন পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘন্টা করেই কাজ করতে হয়। অর্থাত সপ্তাহে চল্লিশ ঘন্টা। অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মতই শনি ও রবিরার ছুটি। তবে একথা সত্য যে এই আট ঘন্টা কাজে সন্তষ্ট নয় সুইডিশরা। তারা দীর্ঘদিন থেকে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের দাবি জানিয়ে আসছে। বর্তমানে সুইডিশ পার্লামেন্টে একমাত্র সুইডিশ লেফট পার্টি ও গ্রিন পার্টি থেকে এই দাবি জানানো হয়েছে। এই দুইটি রাজনৈতিক দল চায় সুইডেনের দৈনন্দিন কাজের সময় আট ঘন্টা থেকে কমিয়ে ছয় ঘন্টায় নিয়ে আসার জন্য। প্রথমদিকে এই দুইটি দল থেকে এই দাবি যতটুকু শক্তভাবে তুলে ধরা হয়েছিল এখন আর সেই পর্যায়ে নাই বললেই চলে। তবে লেফট পার্টি এখনো তাদের পহেলা মের মিছিলে স্লোগান দিয়ে থাকে ছয় ঘন্টার কর্ম সময়ের দাবি জানিয়ে। এছাড়া আর কথাও এই দাবি নিয়ে কোনো কথা বলতে শুনা যায় না। গ্রিন পার্টি এখন এই দাবির বেপারে মোটামুটিভাবে নিরবতা পালন করছে বলা যেতে পারে।

অন্যদিকে সুইডেনের দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক দল মোডরেট ও লেবার পার্টি বলছে সম্পুর্ন অন্য কথা। তাদের মতে কাজের সময়সীমা কমিয়ে আনা তো দুরের কথা উল্টো অবসরে যাওয়ার বর্তমান ৬৫ বত্সর থেকে বাড়িয়ে ৬৮ আনার পক্ষপাতি এই দল দুইটি। বর্তমানে সুইডেনে অবসরে যাওয়ার বয়স ৬৫ হলেও ঐচ্ছিক ৬৭ পর্যন্ত কাজ করার নিয়ম রয়েছে। অর্থাত ৬৫ বত্সরে অবসর ভাতা নিয়ে যদি কেউ চায় তাহলে ৬৭ বত্সর পর্যন্ত কাজ করতে পারবে। চাকুরিদাতার এবেপারে কিছুই বলার ক্ষমতা নেই। এইসময় একদিকে আসবে অবসর ভাতা অন্যদিকে আসবে মাসিক বেতন। অবসর ভাতা কম পাওয়ার কারণে বর্তমানে অনেকেই এই দুই বত্সরের ঐচ্ছিক সুযোগকে গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি মোডরেট ও লেবার এই ঐচ্ছিক সময়কে বাড়িয়ে ৬৭ থেকে ৬৮ বত্সরে আনার বেপারে একমত হয়েছে। ২০১৭ কোনো এক সময়ে জাতীয় সংসদে চূড়ান্ত স্বিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে বলা হয়েছে। সুতরাং আইনগতভাবে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময়ের নিয়ম আদৌ পূরণ হবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে বলা যেতে পারে।

এদিকে সুইডেনে যারা প্রতিদিন ছয় ঘন্টা কাজের পক্ষে তাদের মতে এতে করে কোম্পানির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানুষ তাদের ব্যক্তিগত জীবন উপভোগ করার সুযোগ পাবে এবং সুখী হবে। অন্যদিকে বেকার সমস্যা সমাধানের একটা পথ উন্মুক্ত হবে। সুইডেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর গুটেনবর্গের টয়োটা সেন্টার গত ১৩ বত্সর থেকে তাদের কোম্পানিতে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণ করে আসছে বলা হয়েছে। কোম্পানির রিপোর্ট অনুসারে এই বেবস্থা কার্যকর করার পর থেকে কর্মচারীরা সুখী, কোম্পানির লাভ বৃদ্ধি এবং নুতন করে কর্মচারী নীয়গের হার কমে গিয়েছে। রাজধানী স্টকহোম ভিত্তিক একটি অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার কোম্পানি Filimundus ২০১৪ থেকে ছয় ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণ করেছে বলে উধাহরণ টানা হয়েছে। দৈনন্দিন আট ঘন্টা কাজ ভালো নয় বলে মন্তব্য করেছেন এই কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। নির্দিষ্ট কাজের সময় দীর্ঘ আট ঘন্টার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি মনে করেন। এবেপারে তিনি বলেন, আমরা প্রতিদিনের কাজ আরো সহনীয় করতে একই সময়ে বিরতিও দিয়ে থাকি। আমাদের মনে রাখতে হবে যে কাজের বাইরে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনও পরিচালনা করতে হয় যা অত্যন্ত কঠিন কাজ। তিনি বলেন, স্টাফদের কাজের সময় সোশ্যাল মিডিয়ার সাথে সকল প্রকার যোগাযোগে কোনো অনুমতি দেওয়া হয় না। অন্যদিকে অফিসে মিটিংএর সময়সূচি সংকোচিত করে আনা হয়েছে। এই সময় দিনের অন্যান্য বিক্ষেপ দূর করা হয়েছে। তবে কর্মচারীদের কাজের সময় অফিসে একাগ্রভাবে কাজ করার উদ্দেস্য ও লক্ষ্য বোজায় রাখতে হবে। তিনি বলেন কর্মচারীদের নিশ্চিত করতে হবে যে দৈনন্দিন কাজের শেষে তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেন যথেষ্ট এনার্জি থাকে। দৈনন্দিন আট ঘন্টা কাজ করার পর এই এনার্জি পাওয়া কঠিন বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে ৭ অক্টোবর ২০১৫ VICE সুইডেন নামের একটি অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক কামিলা কাতালিনা এক কলমে লিখেছেন, না, সুইডেনে প্রতিদিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। তার এই লেখায় তিনি উল্লেখ করেন গত সপ্তাহে বিজনেস নিউজ ওয়েব সাইডে Fast Company নামকরণে একটি আর্টিকেলের শিরোনামে লেখা হয়েছে, সুইডেনে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের কথা। লেখাটিকে ফোকাস করা হয় সুইডেনের একটি আই টি কোম্পানির উদাহরণ টেনে। যেখানে পরীক্ষামূলকভাবে দিনে ছয় ঘন্টা কাজের কর্মসূচি চালু করা হয়েছে বলে বলা হয়। ফলে কর্মচারীরা তাদের বেক্তিগত জীবনে সুখী এবং স্বাস্থ্যসম্মত থাকবে বলে বলা হয়েছে। এখানে এও উল্লেখ করা হয়েছে যে সুইডেনে এখন ছয় ঘন্টা কাজ সাধারণ বেপার হয়ে দাড়িয়েছে। বিশ্ব এই সংবাদের পরিপেক্ষিতে বিশ্বাস করেছে সুইডেনে এখন দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তিতে সংবাদটিকে The Guardian, The Independent ও Conde Nast Traveller ফলাও করে প্রকাশ করে আমাদের বোকা বানিয়েছে। মনে হয়েছে এধরনের দিন আদৌ কি আসবে সুইডেনে?

সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পর আমি(কামিলা কাতালিনা)মূলত দৈনন্দিন ছয় ঘন্টার কর্মী হিসেবে আমার নতুন জীবন কেমন হবে তা নিয়ে সপ্তাহান্তে কল্পনা করে কাটিয়েছি, এবং আমার চোখের সামনে একটি সম্ভাবনার সম্পূর্ণ নতুন অধিকার খোলার স্বপ্ন দেখেছি। তবে উত্তেজিত হওয়ার পূর্বে এবেপারে আমি কিছু তথ্য অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেই। এই মহিমান্বিত নতুন জীবন কবে থেকে শুরু হবে জানার জন্য আমি প্রথমেই সুইডিশ ন্যাশনাল নিয়োগ অফিস (SNEOE)যোগাযোগ করি। নীচে টেলিফোনে আমাদের কথাগুলো তুলে ধরা হলো।

SNEOE: ইউনাস বলছি, আমি কিভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?

VICE: হাই, আমি শুধু জানতে চাচ্ছি সুইডেনে প্রতিদিন মাত্র ছয় ঘণ্টার কাজের সময়সূচি কবে থেকে চালু করা হচ্ছে?

SNEOE: আমি আপনাকে ঠিকমত বুঝতে পারছিনা।

VICE: সিএনএন, হাফিংটন পোস্ট ও টেলিগ্রাফ এ সম্পর্কে লিখেছে আপনি কি এবেপারে কিছুই শুনেন নি?

SNEOE: ওয়েল, আমরা এসম্পর্কে কিছু বলতে পারব না। এটা পত্রিকার সংবাদ। আমার কাছে এবেপারে কোনো তথ্য নেই। এই মুহূর্তে, আমাদের কাছে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা করে নতুন কাজের সময়সূচি বাস্তবায়ন সম্পর্কে কোন তথ্য নেই। So I don’t really know what to tell you.

VICE: ঠিক আছে, ধন্যবাদ ।

সুতরাং সুইডেনে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় এখন আমার কাছে শুধু ফ্যান্টাসি হয়ে থাকলো বলে বলেন কামিলা। স্থানীয় একটি সুইডিশ নিউজ সাইট লিখেছে, সুইডেনের মোট ছয়টি কোম্পানি তাদের স্টাফদের প্রস্তাব দিয়েছে স্বল্প সময়ের জন্য চুক্তি মোতাবেক পরীক্ষিতভাবে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের জন্য। শুধুমাত্র এইটুকুই। আর এই বিষয়টিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া অন্যভাবে প্রচার করেছে। এদিকে সুইডেনের বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক পত্রিকা দোগেনস নিহতার একটি নিবন্ধে প্রকাশ করেছে, সুইডেন সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী এক বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি করা হয়েছে। সুতরাং সবশেষে বলা যেতে পারে যে সুইডেনে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় এখন পর্যন্ত শুধু স্বর্গোদ্যান এর মতই রয়েগেছে। ভবিস্যতে আদৌ সর্ব সাধারণের জন্য দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজের সময় বাস্তবে হবে কি না তা বলা কঠিন। তবে লেফট পার্টি ও গ্রিন পার্টি যদি কখনো সুইডিশ পার্লামেন্টে শক্ত অবস্থানে আসতে পারে তাহলে হয়তো এধরনের একটা পরিবর্তনের আশা করা যেতে পারে। কিন্তু বর্তমান মুহুর্তে দৈনন্দিন ছয় ঘন্টা কাজ আমাদের কাছে শুধু স্বপ্নের মতই বিরাজ করছে।

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু: সুইডেন প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় মূলধারার রাজনীতিক

আরও পড়ুন