আনোয়ারুল করিম রাজু।
পৃথিবীতে চির বৈরী দেশগুলোর মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের নাম সমার্থক। ভারতে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই বৈরীতা বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছিল। সীমান্তে মাঝেমধ্যেই চলে গোলাগুলি। বাগযুদ্ধ তো নিয়মিত ব্যাপার। সেই দু’টো দেশের একটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি শুক্রবার যা করলেন, তা এক কথায় অনন্য। নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে হঠাৎ বললেন, যাবেন পাকিস্তান, দেখা করবেন নওয়াজ শরীফের সঙ্গে। জানাবেন জন্মদিনের শুভেচ্ছা। রীতিমতো ’উঠ মেয়ে তোর বিয়ে’র মতো আয়োজনে তিনি গেলেন কারাচি। সবমিলিয়ে কূটনীতিতে এক জম্পেশ আলোচনার জন্ম দিলেন তিনি। এটিকে কূটনৈতিক কূটনীতি বলাও কম হয়ে যায়!
কূটনৈতিক অভিধান তন্নতন্ন করেও এহেন অপ্রত্যাশিত বিষয় খুঁজে পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। আজ যেমনটার সাক্ষী থাকল এই উপমহাদেশ। আজ সকালে ফোনে নওয়াজ শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার আমন্ত্রণে দিল্লি ফেরার পথে সটান লাহৌরে পৌঁছে গেলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নওয়াজের বাসভবন রাইওয়ান্দ প্যালেসে প্রায় এক ঘন্টা কাটিয়ে ভারতে ফিরলেন তিনি। তারই মধ্যে সারলেন পাক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক। যার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ বলেছেন, ‘‘শোরগোলের বাইরে এ এক ব্যক্তিগত যোগাযোগ।’’
কিন্তু এই ‘ব্যক্তিগত যোগাযোগের’ আবহটি ছিল এতই অপ্রত্যাশিত যে তার ধাক্কায় বিশেষণ হারিয়ে ফেলেছেন উপস্থিত ধারাভাষ্যকাররা। আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে সময় নিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গাছে ওঠা গল্পের গরু-সম চিত্রনাট্যও হার মেনে গিয়েছে মোদীর এই চূড়ান্ত ‘আউট অব দ্য বক্স’ চালে।
মোদি কারাচি যাওয়ার সময় শুধু নওয়াজ শরীফের জন্য নয়, তার নাতনির জন্যও উপহার নিয়ে গেছেন। যাও এক কথায় অনন্য।
মোদী এবং নওয়াজের টুইট অনুযায়ী, আজ সকালে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে প্রধানমন্ত্রী কাবুল থেকে ফোন করেন পাক রাষ্ট্রপ্রধানকে। ধন্যবাদ জানিয়ে নওয়াজ শরিফ বলেন যে তিনি তো লাহৌরে নিজের বাড়িতেই রয়েছেন। ফেরার পথে একবার ঘুরে যান না কেন মোদী! সঙ্গে সঙ্গেই আমন্ত্রণ স্বীকার করে মোদী জানান তিনি আসছেন! এরপর ফের টুইটে মোদী লেখেন, ‘‘আজ বিকেলে নওয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে। দিল্লি ফেরার পথে যাচ্ছি সেখানে।’’
প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে দু’দেশেরই সংবাদমাধ্যম। আজ জন্মদিনের নানাবিধ অনুষ্ঠান ছিল নওয়াজের। তাছাড়া রাইউইন্দ প্যালেসে আগামিকাল থেকে শুরু হচ্ছে নওয়াজের নাতনি মেহেরুন্নিসার শাদির উৎসব। সমস্ত কাটছাঁট করে সাদা পাঠান স্যুট পরে বিমানবন্দরে লোকলস্কর নিয়ে হাজির হয়ে যান পাকিস্তানের ওয়জির-এ-আজম। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে প্রায় আধঘন্টা অপেক্ষাও করেন তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়া-১৩৪ বিমানটি টারম্যাক ছুঁতেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধকালীন তৎপরতা। কিন্তু নাটকের তখনও কিছু বাকি ছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানে আসছেন, এই খবরটি প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নওয়াজ শরিফের অফিস সূত্রে জানানো হয়েছিল বিমানবন্দরেই কিছুক্ষণ থাকবেন তিনি। সেখানেই খাওয়াদাওয়া সেরে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে যাবেন দিল্লি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, গেরুয়া কুর্তা-পাজামা পরিহিত সহাস্য প্রধানমন্ত্রী একাই তরতর করে নেমে আসছেন বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে, যেখানে কার্যত উদ্বাহু হয়ে অপেক্ষায় শরিফ। দু’জনে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলেন, উপস্থিত কর্তাদের সঙ্গে করমর্দনও হল। এরপর দুই নেতা হাত ধরাধরি করে লাল কার্পেট মাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন অদূরে অপেক্ষারত হেলিকপ্টারের দিকে! তখন জানা গেল, বিমানবন্দরে বন্দি হয়ে থাকতে আসেননি মোদী। তাঁকে নিয়ে নিজের বাসভবনে পৌঁছলেন শরিফ। মোদী নিরামিষাশী, তাই তাঁর জন্য আয়োজন করা হয়েছিল মখমলি পনির, বেসনের বড়া, গাজরের হালুয়া-সহ বিভিন্ন পদের।
ভারত-পাকিস্তানের এই উদ্যোগ কতদূর যাবে, তা এখন বলা না গেলেও উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর রাষ্ট্রনায়করা কি পারবেন এই নজির দেখাতে?
আলোচনা-সমালোচনা নিজ দেশে: ভারত-পাকিস্তানের ৬৮ বছরের সম্পর্কে প্রথম কোনও প্রধানমন্ত্রী কূটনীতিকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিলেন! বিজেপি নেতা সিদ্ধার্থনাথ সিংহ এবং বিজেপি সাংসদ এম জে আকবর মোদীর এই সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
কিন্তু, বিরোধীরা আবার মোদির এই কাবুল ফেরতা হঠাৎই লাহৌরে নেমে পড়ার মধ্যে দূরদৃষ্টি তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র যৌক্তিকতাও খুঁজে পাচ্ছেন না! কংগ্রেস সাংসদ রাজীব শুক্লর প্রশ্ন, ইউপিএ আমলে পাকিস্তানের দিকে তাকালেও, বিজেপি রে রে করতে উঠত! আর এখন তো মোদী একেবারে পাকিস্তানেই চলে যাচ্ছেন!
কংগ্রেস এবং এনসিপির আরও প্রশ্ন, বিজেপি বিরোধী আসনে থাকাকালীন বলত, সন্ত্রাসবাদ আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না, তাহলে কি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করে দিয়েছে?
তবে, সবচেয়ে বড় খোঁচাটা মোদীর দিকে এসেছে শরিক শিবসেনার থেকে! তাঁরা আবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিনের সঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমের জন্মদিনের প্রসঙ্গ টেনে এনেছে! শিবসেনা মুখপাত্র সঞ্জয় রাউতের অভিযোগ, পাকিস্তানে দাউদের জন্মদিন ধূমধাম করে পালন করা হবে। তাঁর প্রশ্ন, মোদী ও শরিফের আজকের বৈঠকের পর দাউদকে কি দেশে ফেরানো যাবে?
বিরোধীদের দাবি, একসময় কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করা হবে না, এই অবস্থানে অনড় থেকে মোদী সরকার ইসলমাবাদের সঙ্গে আলোচনা বাতিল করে দিয়েছিল! পরে সেই মোদী সরকারই কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয় এবং প্রথমবার কোনও তৃতীয় দেশে অর্থাৎ ব্যাঙ্ককে গিয়ে দু’দেশের মধ্যে বৈঠক হয়! আর এবার তো প্রধানমন্ত্রী নিজেই হঠাৎ লাহোরে চলে গেলেন! এভাবে মোদি সরকার পিছু হঠছে কেন? প্রশ্ন বিরোধীদের!
আনোয়ারুল করিম রাজু: দৈনিক আমাদের অর্থনীতি’র বিশেষ প্রতিনিধি ও কূটনৈতিক প্রতিবেদক।



