বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

১৯৫ পাকিস্তানী সেনার যুদ্ধাপরাধের তদন্ত করবে ট্রাইব্যুনাল

Pakistani+Camp+in+Dhakaস্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যের বিচার করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

পাকিস্তানি এসব সৈন্যকে যুদ্ধের পর আটক করা হয়েছিলো। পরে ত্রিদেশীয় এক চুক্তির আওতায় তাদেরকে বিচার করার শর্তে পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু গত ৪৪ বছরেও তাদের কোনো বিচার হয়নি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে দু’জন রাজনীতিকের ফাঁসি কার্যকর করার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে তার সমালোচনা করে বিবৃতি দেওয়া হলে পাকিস্তানি সৈন্যদের বিচারের বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনা শুরু হয়।

গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের দুই মামলায় আট যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান এ কথা জানান।

তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ চলছে, প্রক্রিয়া চলমান আছে। অন্যান্য মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এ বিষয়েও তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিষয় হওয়ায় এ বিষয়ে সরকারের দিকনির্দেশনার প্রয়োজন আছে। ক্ষেত্র প্রস্তুত হলে এবং দিক-নির্দেশনা পেলে আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত শুরু হবে।”

এদিকে আগামী ২৬ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই ১৯৫ জনের প্রতীকী বিচার করার ঘোষণা দিয়েছে ‌‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ গণবিচার’ নামের একটি সংগঠন।
তদন্ত সংস্থার সংবাদ সম্মেলনে আবদুল হান্নান খান বলেন, “পাকিস্তানের ১৯৫ জনের বিচারের বিষয়ে সিভিল সোসাইটি যে দাবি, আমি মনে করি, এ দাবি যৌক্তিক; তাদের বিচার হওয়া উচিৎ।”

পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান যুক্ত করে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে জোর দেন তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এম সানাউল হক।

তিনি বলেন, ফৌজদারি মামলায় পলাতক আসামিদের সম্পত্তি জব্দ করার বিধান থাকলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে তা নেই। পুলিশ প্রবিধান অনুসারে তথ্য থাকার পর একই সময়ে একাধিক জায়গায় অভিযান পরিচালনা করতে পারলে পলাতক আসামিদের ধরা সম্ভব।

সানাউল হক জানান, দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত ও চলমান মামলায় সব মিলিয়ে ট্রাইব্যুনালের ৬৯ জন আসামি বর্তমানে পলাতক।

তিনি বলেন, “ট্রাইব্যুনাল যখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, গ্রেপ্তারের সে আদেশ তদন্ত সংস্থায় আসে না। কারণ আসামিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা তদন্ত সংস্থাকে দেওয়া হয়নি। তদন্ত চলাকালে প্রাথমিক অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিনা পরোয়ানায় আসামিকে গ্রেপ্তার অধিকার চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব করা হয়েছিল। মন্ত্রণালয় এর সঙ্গে একমত পোষণ করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এরপর আর অগ্রগতি দেখিনি।”

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসা গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন আগে থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আসা কোনো রায়েই সম্পদ জব্দ বা ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আসেনি।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন, “সকল যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান সংবিধানে না হলে প্রয়োজনে তা পরিবর্তন করে যুদ্ধাপরাধীদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।”

তদন্ত সংস্থার একজন আইনজীবী তুরিন আফরোজ  জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের আইন অনুসারে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি কেউ মানবতাবিরোধী অপরাধ করে থাকে এবং সে যে দেশেরই নাগরিক হোক না কেনো বাংলাদেশে তার বিচার করা সম্ভব। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইনেও বলা আছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা যেকোনো রাষ্ট্রেই হোক না কেনো, অন্য কোনো রাষ্ট্রও তার বিচার করতে পারে।

তুরিন আফরোজ বলেন, পাকিস্তানি এই সৈন্যদের বিচার করা যাবে কীনা তার আইনগত বিষয়গুলো তারা বছর দেড়েক আগে বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন। এর মধ্যেই ট্রাইব্যুনালে বিভিন্ন মামলায় পাকিস্তানি সৈন্যদের নামও এসেছে। তিনি জানান, এসব সৈন্যের ব্যাপারে তারা তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন।

তিনি বলেন, যখনই তারা পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ ও সাক্ষীর ব্যাপারে সন্তুষ্ট হবেন তখনই তারা এবিষয়ে ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করবেন। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৩ সালে স্বাক্ষরিত বন্দী বিনিময় এক চুক্তির আওতায় পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।

তিনি জানান, ওই চুক্তিতে সৈন্যদের পাকিস্তানের মাটিতে বিচারের কথা উল্লেখ করা না হলেও পাকিস্তান সরকার তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করবে এরকম সমঝোতা হয়েছিলো।

তবে তিনি এও বলেছেন যে এই চুক্তিটি বৈধ নয়। কারণ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার মতো অপরাধকে কেউ ক্ষমা করতে পারে না। এবং তারপরেও সেধরনের কোনো চুক্তি হলে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে সেটা বাতিল বলে গণ্য হবে।

তুরিন আফরোজ বলেন, বাংলাদেশের সংসদেও ওই আইনটি অনুমোদিত হয়নি। ফলে কোনো আদালত বিচারের সময় ওই আইনটিকে গ্রহণ করতে পারে না। এই ১৯৫ সৈন্যের মধ্যে এখনও অনেকে বেঁচে আছে বলে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ধারণা করছে। তবে তাদের সবাই যে পাকিস্তানে অবস্থান করছে তা নয়, অনেকে অন্য কোনো রাষ্ট্রেও বসবাস করছে। তাদের কে কোন পদে এবং কোথায় যুদ্ধ করেছে সেসব দলিল তদন্ত সংস্থার হাতে রয়েছে।

আরও পড়ুন