পৌর নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখলের পরিকল্পনা ক্ষমতাসীনরা করছে দাবি করে তা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
ভোটের দুদিন আগে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ‘বাধা’ এবং ইসির বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতের’ অভিযোগ তুললেও ভোটযুদ্ধে থাকার ঘোষণা দিয়ে এই আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনকে ‘প্রহসনে’ পরিণত করার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে দাবি করে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে সেনা মোতায়েনের দাবি পুনরায় জানিয়েছেন খালেদা।
আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় পৌর নির্বাচনে বিএনপির সেনা মোতায়েনের দাবি প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচন কমিশন বলছে, সেই রকম কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।
খালেদা বলেন, “আমরা জানি না, কত ভয়াবহ পরিস্থিতি হলে নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করবেন। আমরা জানি না, সেনা মোতায়েনে কমিশন ও সরকারের এত অনাগ্রহ কেন?
“অতীতেও সেনাবাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নিজ উদ্যোগেই এই কাজটি করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের রয়েছে। তাই আমরা আবারও পৌর নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানাচ্ছি।”
বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিতে দেশাসীর প্রতি আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা সবাই মিলে দলে দলে ব্যাপক সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে হাজির হয়ে সর্বশক্তি দিয়ে নিজেদের ভোট রক্ষায় আপ্রাণ চেষ্টা করুন।
“শাসক দল নির্বাচনের উপর অশুভ প্রভাব বিস্তারের যে পরিকল্পনা করেছে, তা শান্তিপূর্ণ পন্থায় ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ান।”
পৌর ভোটের প্রচারের শেষ দিনে গুলশানে নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যের পর টেবিলে থাকা দলীয় প্রতীক ধানের শীষ হাতে তুলে নেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
সংবাদ সম্মেলনে ৩০ মিনিটের বক্তব্যে বিএনপি প্রার্থীদের প্রচারে ক্ষমতাসীনদের ‘বাধা’ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তা ঠেকাতে ইসির ‘নিষ্ক্রিয়তার’ সমালোচনা করেন তিনি।
খালেদা বলেন, “নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার সব আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। বিরোধী দলের অফিস ও প্রার্থীদের উপর হামলা, সমর্থকদের হত্যা, প্রচারে বাধা দেওয়া, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, গ্রেপ্তার ও হুমকি চরম আকার ধারণ করেছে।
“সস্ত্রাসী ছাড়াও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির সদস্যকেও এই অপকর্মে ব্যবহার করা হচ্ছে। শাসক দলের সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও হামলা চালালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।”
ইসির সমালোচনা করে বিএনপি নেত্রী বলেন, “শাসক দলের মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচনী আচরণবিধি বেপরোয়াভাবে লঙ্ঘন করে চলেছেন। এর কিছু কিছু খবর সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত হলেও মামুলি কারণ দর্শানোর নোটিস এবং তারপর লোক দেখানো দুঃখ প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন দায় সারছে।”
বিএনপির এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ইসি বলছে, সুষ্ঠু ভোটের সব আয়োজনই করেছেন তারা। জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পাল্টা অভিযোগ করছে, ইসি বিএনপিকে ‘বাড়তি সুবিধা’ দিচ্ছে।
ভোটের চিত্র যাতে গণমাধ্যমে না আসে, তা ঠেকাতেও চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ বিএনপি চেয়ারপারসনের।
“সাংবাদিকরা যাতে নির্বাচন চলাকালে তাদের পেশাগত দায়িত্ব সঠিকভবে পালন করতে না পারেন, তার জন্য নানা ধরনের অপচেষ্টা চলছে। সাংবাদিকদের অনুমতিপত্র দেওয়ার ব্যাপারে সরকারদলীয় নেতাদের গোপন মতামত নেওয়া হচ্ছে।”
এই সংবাদ সম্মেলন কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করতে চাইলেও তাদের তা করতে দেওয়া হয়নি বলে বিএনপির অভিযোগ।
“কেবল তাই নয়, এই সরকার বিকল্প মিডিয়ার উপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। ফেইসবুক ও টুইটারের মতো অনলাইন মিডিয়া ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের উপরও খবরদারি করছে,” বলেন খালেদা।
পৌর নির্বাচনে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদার একটি বক্তব্য প্রচারের জন্য একটি বিজ্ঞাপন তৈরি করে বিএনপি, তা প্রচারে সরকার বাধা দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন দলটির নেতারা।
খালেদা বলেন, “সরকারের পরোক্ষ চাপের কারণে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলো সেই বিজ্ঞাপনটি প্রচারে রাজি হয়নি। এসব ঘটনায় সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ আরও ন্যক্কারজনকভাবে ফুটে উঠেছে।”
‘সজাগ থাকুন’
বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থানের জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া বলেন, “১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগের শাসনামলে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছিল। কিন্তু তারা সেটা দমন না করে বিরোধী দলের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়েছিল। আমরা পরবর্তীকালে সেই জঙ্গিবাদকে সাফল্যের সঙ্গে দমন করতে পেরেছি।”
সাম্প্রতিক জঙ্গি তৎপরতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “বিলুপ্তপ্রায় জঙ্গিবাদীরা এখন আবার নতুন শক্তিতে সংগঠিত হয়েছে কি না এবং তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে সবখানে সংশয় ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে।
“চারদিকে অশুভ আলামত ও বিপদজনক সব হামলার ঘটনার ব্যাপারে আমি সকলকে সতর্ক ও সজাগ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। দেশে যাতে কোনোভাবেই নৈরাজ্যকর নিরাপত্তা পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সেদিকে আমি সকলকে নজর রাখতে বলব।”
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বৈধতা নেই বলে আবারও দাবি করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
তিনি বলেন, “কলঙ্কিত সেই নির্বাচনের পর গঠিত সংসদের তথাকথিত বিরোধী দলটিও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব নিয়ে সরকারের অংশ হয়ে আছে। এই অদ্ভুত ব্যবস্থা কোনোক্রমেই গণতন্ত্র নয়। ওই নির্বাচন দেশে-বিদেশে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।
“ফলে ক্ষমতাসীন সরকারের নৈতিক বৈধতার সঙ্কট রয়ে গেছে। এই সঙ্কট কাটাতে প্রয়োজন একটি নিরপেক্ষ নির্দলীয় ব্যবস্থার অধীনে সবার অংশগ্রহণমূলক নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।”


