সিএনজি অটোরিকশাচালক রাশেদ আলী ও তার ভাগ্নে হারুন হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। এ সময় একটি বাস তাদের ধাক্কা দেয়। রাস্তায় ছিটকে পড়লেও তাদের আঘাত তেমন গুরুতর ছিল না। তারা বাসটির দরজার কাছে গিয়ে ধাক্কা দেওয়ার প্রতিবাদ করেন। কিন্তু এর জন্য এত বড় মাশুল দিতে হবে, তা হয়তো কল্পনাও করেননি রাশেদ।
তিনি প্রতিবাদ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বাসটির চালক-হেলপার। রাশেদকে শার্টের কলার ধরে বাসে টেনে তুলে প্রথমে গালমন্দ করেন হেলপার। পরক্ষণে তাকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেন। এর পর রাশেদকে বাসের চাকায় পিষ্ট করে চলে যান চালক। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গভীর রাতে তার মৃত্যু হয়। মর্মন্তুদ এ ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার রাজধানীর রামপুরার ওয়াপদা এলাকায়।
পুলিশ দুর্ঘটনায় দায়ী বাসটি জব্দ এবং চালককে আটক করেছে।
এর আগে গত ২২ ডিসেম্বর উত্তরার জসীমউদ্দীন এভিনিউ এলাকায় অটোরিকশায় ধাক্কা দেওয়ার প্রতিবাদ করায় চালক ফারুককে একই কায়দায় বাসচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। এদিকে নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সড়ক দুর্ঘটনার মামলা নিয়েছে রামপুরা থানা পুলিশ।
এ ব্যাপারে রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, নিহতের স্ত্রী নাসিমা বেগম পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন, রাস্তা পারাপারের সময় বাসচাপায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়। তিনি হত্যার কোনো অভিযোগ করেননি। তার অভিযোগের ভিত্তিতেই বাসচালক বেলালকে আসামি করে মামলা হয়। ঘটনার পর পরই বেলালকে গ্রেফতার ও বাসটি জব্দ করেছে পুলিশ। তদন্তে হত্যার প্রমাণ পেলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী নিহতের দূর সম্পর্কের ভাগ্নে হারুন সমকালকে বলেন, শুক্রবার বিকেল ৪টার দিকে তিনি ও রাশেদ বউবাজারের কাছে রাস্তা পার হওয়ার সময় পাবনা এক্সপ্রেস পরিবহনের একটি বাস তাদের ধাক্কা দেয়। এর প্রতিবাদ করতে গেলে চালক ও হেলপার তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
তারা বলেন, ‘ধাক্কা লাগছে তো কী হইছে? বেশি কথা কইলে গায়ের ওপর দিয়া চালাইয়া দিমু।’ একপর্যায়ে চালক সেই নির্মম কাজটিই করেন। হেলপারের ধাক্কায় রাশেদ পড়ে যাওয়ার পর বাসটি সোজা চলে গেলে তিনি চাপা পড়তেন না। কিন্তু তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইচ্ছা করেই চালক গাড়িটি একপাশে চাপিয়ে দেন। তখন বাসের পেছনের চাকা রাশেদের কোমরের ওপর দিয়ে চলে যায়। রক্তাক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থাকেন তিনি। মর্মান্তিক এ দৃশ্য দেখে হতবিহ্বল হারুন বাসটির পেছনে দৌড়াতে শুরু করেন। তিনি বাসের পেছনের বাম্পার ধরে ঝুলতে ঝুলতে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া মোড় পর্যন্ত চলে যান। সেখানে বাসটি থামলে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশকে হারুন ঘটনাটি জানান। পুলিশ বাসটি জব্দ ও চালককে আটক করে। তবে পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে হেলপার পালিয়ে যান।
এদিকে আশপাশের লোকজন মুমূর্ষু রাশেদকে নিয়ে যান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। এর আগেই দুর্ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান তার স্ত্রী নাসিমা।
নিহতের স্ত্রী নাসিমা বেগম সমকালকে জানান, বাসচাপায় তার স্বামী মারা গেছেন_ প্রথমে এটুকুই শুধু লোকমুখে শুনেছেন। পুলিশকেও তাই বলেছেন। কিন্তু পরে তিনি হারুনের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার স্বামীকে ইচ্ছা করে বাসচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তিনি স্বামীর ‘খুনিদের’ ফাঁসি চান।
নিহতের বন্ধু রফিকুল ইসলাম বলেন, রাশেদের গ্রামের বাড়ি জামালপুর সদর থানার কৈটলা এলাকায়। তার বাবার নাম সেকেন্দার আলী। গতকাল দুপুরে ময়নাতদন্তের পর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। রাশেদ-নাসিমার চার বছর বয়সী এক ছেলে রয়েছে। সে গ্রামের বাড়িতেই থাকে।
রামপুরা থানার ওসি বলেন, চালক বেলালকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে রাশেদের মৃত্যুকে সড়ক দুর্ঘটনা বলেই দাবি করেছে। এ মামলায় রিমান্ডে নেওয়ার সুযোগ থাকে না বলে রিমান্ড চেয়ে কোনো আবেদন করা হয়নি। গতকাল তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে হত্যা মামলায় রূপান্তর হলে তার রিমান্ড চাওয়া হবে।


