দুই দেশের মধ্যে কূটনীতি নিয়ে টানাপোড়েনের পর এবার পাকিস্তান সেদেশ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে। এ জন্য তাকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। যদিও বিষয়টি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো নির্দেশনায় জানানো হয়নি। মৌখিকভাবেই এই নির্দেশ দিয়েছে পাক সরকার। কূটনৈতিক অর্থে এভাবে কাউকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়াকে এক ধরনের ‘বহিষ্কার’ হিসেবেই দেখা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ একজন কর্মকর্তা মঙ্গলবার রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঢাকা থেকে পাকিস্তানি কূটনীতিক ফারিনা আরশাদকে প্রত্যাহারের জেরে এবার ইসলামাবাদ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে ফিরিয়ে নিতে বলা হলো। পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা পেয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর ইসলামাবাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনন ঢাকায় এ কূটনৈতিক বার্তায় এই তথ্য জানায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা মৌসুমী রহমান সেখানে কাউন্সেলর মর্যাদায় গত কয়েকমাস ধরে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। হাইকমিশনার সোহরাব হোসেন অনির্ধারিত ছুটিতে ঢাকায় থাকাকালীন মৌসুমী রহমানকে অবশ্য এর আগেও দুই দফা তলব করেছিল পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হলে বিষয়টি বেশ আলোড়ন তোলে। এরপর সিদ্ধান্ত হয়েছে, মৌসুমীকে ঢাকায় না এনে তাকে অন্য কোথাও বদলী করা হোক। সেই অনুযায়ী মঙ্গলবার সন্ধ্যাতেই তাকে পর্তুগালে বদলী করা হয়েছে।
কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে কেন বাংলাদেশ ফিরিয়ে নেবে, তা জানায়নি ইসলামাবাদ। জানা গেছে, ফারিনা আরশাদকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ যেমন পাকিস্তানকে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছিল, তেমনি মৌসুমী রহমানকে ফিরিয়ে নিতে ঢাকাকে মৌখিকভাবে বলেছে ইসলামাবাদ।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর, পাকিস্তানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) মৌসুমী রহমানকে সরকার ঢাকায় ফিরিয়ে আনছে না। তাকে পাকিস্তান থেকে পর্তুগালে বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যে তাকে পাকিস্তান ছেড়ে পর্তুগালের লিসবনে বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগদানের নির্দেশ পাঠানো হয়েছে।
সূত্রের খবর, পাকিস্তানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সোহরাব হোসেনকে মঙ্গলবার বিকেলে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠানো হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মৌসুমী রহমানকে নিয়ে সোহরাব হোসেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (দক্ষিণ এশিয়া ও সার্ক) মোহাম্মদ ফয়সালের সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় মোহাম্মদ ফয়সাল বৃহস্পতিবার বিকেলের মধ্যে মৌসুমী রহমানকে ইসলামাবাদ থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। এর পেছনে কোনো কারণ বা ব্যাখ্যা ওই মহাপরিচালক বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে দিতে পারেননি বলেও সূত্র উল্লেখ করে।
প্রসঙ্গত, ঢাকায় পাকিস্তানি হাইকমিশনের প্রথম সচিব ফারিনা আরশাদকে বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নিতে বলার কয়েক দিন পর গত ২৩ ডিসেম্বর তাকে প্রত্যাহার করে নেয় ইসলামাবাদ। এর এক দিন পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ফারিনা আরশাদকে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে হেনস্তা করেছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ধারাবাহিকভাবে তার বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানানোর পর তাকে ইসলামাবাদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার পাক হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব মাজহার খানকে জঙ্গি অর্থায়ন ও জাল টাকার কারবারে সহায়তার দায়ে বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর থেকে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক। সর্বশেষ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের পর দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ততার পর্যায়ে পৌঁছে। বাংলাদেশের অনেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নেরও দাবি জানিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো ধরনের শিক্ষামূলক সম্পর্কে যাবে না বলেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।


