মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির রায় সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ বহাল রাখার প্রতিবাদে আজ দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিলেও এ কর্মসূচি সফল করার মতো জোরালো প্রস্তুতি নেই দলের নেতাকর্মীদের। এমনকি ঢাকাসহ দেশের কোথাও আদৌ তারা রাজপথ মাড়াবেন কি না, তা নিয়েও রয়েছে নানা সংশয়। অথচ তাদের এ কর্মসূচিকে ঘিরে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে নাশকতার নানা শঙ্কা। এ নিয়ে খোদ সরকারের বিভিন্ন মহলেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাংগঠনিকভাবে জামায়াত দুর্বল হয়ে পড়লেও বোমাবাজি, গ্রেনেড হামলা ও যানবাহনে অগি্নসংযোগসহ চোরাগোপ্তা নানা নাশকতা ঘটানোর মতো সামর্থ্য তাদের রয়েছে। এ ছাড়া মৌলবাদী এ সংগঠনটি একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কারণে তাদের হরতাল কর্মসূচিকে কোনোভাবেই ‘ছোট’ করে দেখছে না সরকার। বরং কোনো ধরনের সুযোগ পেলেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে আস্থার সংকটে থাকা এ দলটি ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে এ আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সূত্র জানায়, উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দলের বিগত হরতালের মতো জামায়াতের আজকের কর্মসূচিকে ঘিরে একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সারাদেশে র্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৪০ হাজার সদস্য ওইদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার বিপুলসংখ্যক সদস্য মাঠে থাকছে।
তবে র্যাব-পুলিশের এ সাজ সাজ প্রস্তুতিও জনগণের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দূর করতে পারেনি।
তাই বুধবার দুপুরে জামায়াতের হরতাল ঘোষণার পরপরই বিভিন্ন মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। উদ্বিগ্ন নগরবাসীর অনেককেই হাতের কাজকর্ম সংক্ষেপ করে সন্ধ্যা নামার আগেই ঘরে ফেরার পথে পা রাখতে দেখা গেছে। যানবাহনে অগি্নসংযোগের আশঙ্কায় বিকাল গড়াতেই রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে পড়ে।
এদিকে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ অঘোষিত ছুটি ঘোষণা করেছে। রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কসংলগ্ন বিপণিবিতান ও শপিংমলসহ বিভিন্ন মার্কেটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি দেয়া হয়েছে। বেশকিছু কলকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও বৃহস্পতিবার দিনভর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক কর্তৃপক্ষ।
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ব্যবসায়ীদের তাদের দোকানপাট খোলা রাখতে এবং যানবাহন মালিক-শ্রমিকদের রাস্তায় গাড়ি নামানোর জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘নির্বিঘ্নে দোকানপাট খোলা রাখুন। নাশকতার আশঙ্কা নেই। কেউ যদি নাশকতার চেষ্টা করে, বোমাবাজি করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেউ রাস্তায় নেমে যানবাহন বন্ধের চেষ্টা করে, ভাংচুর ও অগি্নসংযোগ করে, তাহলে যা করার তা করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনগণ তাদের প্রতিহত করবে।’
তবে তার এ আশ্বাসে ব্যবসায়ী ও যানবাহন মালিকরা আদৌ আস্থা রাখতে পারবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। বুধবার একাধিক দোকান মালিক ও বাস-মিনিবাসচালক এ প্রতিবেদককে তাদের নানা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন।
সায়েদাবাদ-কুড়িল বিশ্বরোড রুটের বাসচালক জহির মিয়া জানান, বুধবার সন্ধ্যার আগেই অনেকে ঘরে ফিরে গেছেন। আতঙ্কিত জনগণের জরুরি কাজ ছাড়া বৃহস্পতিবার বাইরে বের হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাই হরতাল কর্মসূচি চলাকালে যাত্রীসংখ্যা কম হবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ এ সময় বোমাবাজি, অগি্নসংযোগসহ চোরাগোপ্তা নানা হামলা হতে পারে। তাই মালিক কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই রাস্তা থেকে গাড়ি সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার টাউন সার্ভিসের লক্কর-ঝক্কর মার্কা গাড়ি চলাচল করলেও কেউ দামি ভালো গাড়ি নামানোর ঝুঁকি নেবেন না বলে মনে করেন জহির মিয়া।
হকার্স, গাউছিয়া, গুলশান ডিসিসি মার্কেট, ইস্টার্ন প্লাজাসহ বেশ কয়েকটি বিপণিবিতানের দোকান মালিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মাঝেও একই ধরনের আতঙ্কের সুর পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা যা-ই থাক না কেন, তাদের কেউই ঝুঁকি নিয়ে বৃহস্পতিবার দোকানপাট খুলবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে বৃহস্পতিবারের হরতালে কোনো ধরনের নাশকতার আশঙ্কা নেই বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করলেও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দারা জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তাদের ভাষ্য, জামায়াতের চোরাগোপ্তা হামলাকারী টিম অত্যন্ত শক্তিশালী। নাশকতার তাৎক্ষণিক ছক এঁটে তারা যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো স্থানে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। একযোগে তা-ব চালানোর মতো সামর্থ্যও তাদের রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। তাদেরকে দুর্বল ভেবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা না হলে তা দেশের জন্য মারাত্মক ‘ভুল’ হবে বলেও মনে করেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, গোয়েন্দাদের মাঠ পর্যায়ের এসব সতর্কতা মাথায় রেখে রাজধানীসহ সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের নেতাদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নাশকতার পরিকল্পনায় গোপন মিটিং করার সময় তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়া, সাতক্ষীরা, নোয়াখালীও চট্টগ্রামসহ জামায়াত অধ্যুষিত ২৪ জেলায় বিশেষ নজরদারি চলছে।
তবে জামায়াত ও শিবিরের একাধিক নেতা জানান, বৃহস্পতিবারের হরতালে কোনো ধরনের সহিংসতা কিংবা নাশকতা চালানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে কেন্দ্র থেকে পিকেটিং না করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে হরতালের সমর্থনে ‘সুযোগ বুঝে’ ঝটিকা মিছিল বের করা হবে। র্যাব-পুলিশের মারমুখী আচরণের কারণে দলের নেতাকর্মীদের রাজপথে নামার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করেন তারা।
জামায়াতের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও প্রচার সহকারী মতিউর রহমান আকন্দ বুধবার বিকালে যায়যায়দিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ আদর্শের রাজনীতিতে জামায়াতকে মোকাবেলা করতে না পেরে শীর্ষ নেতাদের হত্যার মাধ্যমে জামায়াতকে নেতৃত্ব শূন্য করতে চায়। তারই অংশ হিসেবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মাদ কামারুজ্জামান এবং আব্দুল কাদের মোল্লাকে জুডিশিয়াল কিলিংয়ের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। এবার তারা বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা মওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। এর প্রতিবাদে তারা বৃহস্পতিবার নিয়মতান্ত্রিক হরতাল করবে।
এদিকে বুধবার হরতালের সমর্থনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির মিছিল বের করে। কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় আকস্মিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে দলের নেতাকর্মীরা।
এদিকে রাজশাহীর তালাইমারীতে মিছিলের প্রস্তুতিকালে শিবিরকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ৩ রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত হয়নি।
হরতালের সমর্থনে গাজীপুর মিছিল করেছে জামায়াতের নেতাকর্মীরা। দুপুরে গাজীপুরের ভোগরা চৌরাস্তায় বিক্ষোভ মিছিলটি শুরু হয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ সময় সড়ক অবরোধ করে হরতালের সমর্থনে সস্নোগান দেয় তারা। প্রায় একই সময় বগুড়ার বিভিন্ন স্থানেও বিক্ষোভ করেছে জামায়াত।


