বছর দুয়েক আগে একবার নকল ফরিদা আহসান (৭২) সাজিয়ে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে আট কাঠা জমির ওপর নির্মিত বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয়েছিল। আরেক দফায় ওই বাড়ি দখল করতে প্রকৃত মালিক ফরিদাকে ‘মৃত’ দেখানো হয়। এর পর নকল কাগজপত্র তৈরি করে একটি চক্র বাড়িটি হাতবদলের চেষ্টা চালায়। এর আগে নব্বইয়ের দশকে আসল দলিল চুরি করে বাড়িটি দখলের চেষ্টা করা হয়। মাঝে আরেকটি ডেভেলপার কোম্পানিরও দৃষ্টি পড়ে বাড়িটির ওপর। সর্বশেষ পঞ্চম দফায় সন্ত্রাসী কায়দায় জোর করে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ফরিদার বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। গত রোববার রাতে প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের আট কাঠা জমির ওপর নির্মিত বাড়িটির প্রধান গেটের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা। এর পর কলাপসিবল গেটের তালাও ভেঙে ফেলা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে হাতেনাতে একজন ব্যারিস্টারসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে উত্তরা-পূর্ব থানায় মামলা করা হয়েছে। উত্তরায় এই চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটলেও পুরো বিষয়টি এতদিন রহস্যজনক কারণে গোপন ছিল। পুলিশ এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেনি। এর আগেও প্রতারণা করে বাড়িটি দখলের চেষ্টার ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলা দুদকে তদন্তাধীন। দলিল চুরির ঘটনায় আরেকটি জিডি রয়েছে উত্তরা-পূর্ব থানায়।
উত্তরা-পূর্ব থানার ওসি আবু বকর জানান, ৪ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর সড়কের ৯৫ নম্বর বাড়িটির মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ফরিদা আহসান। ১৯৮২ সালে ‘বিদেশি কোটায়’ রাজউক থেকে জায়গাটির বরাদ্দ পান তিনি। ১৯৬৫ সাল থেকে স্বামীসহ বসবাস করছেন লন্ডনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করেন একাধিক প্রতিষ্ঠানে। এর পর লন্ডনে গিয়ে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। রাজউকের কাছ থেকে কেনা আট কাঠা জমির ওপর নির্মিত আড়াইতলা বাড়ির দোতলায় ১৯৯০ সাল থেকে বসবাস করছেন ফরিদার ভাই খলিলুর রহমান। নিচতলা ‘ব্রিলিয়ান্ট কলেজ’ নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়। চলতি মাসে বাড়ি ছেড়ে দেয় কলেজটি।
গত রোববার রাত ৭টার দিকে ১০-১২ ব্যক্তি ওই বাড়িতে গিয়ে প্রধান ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির মালিকের ভাই খলিলুর রহমানের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ১০ জনকে গ্রেফতার করে। তারা হলেন_ ব্যারিস্টার কামাল উদ্দিন, সাইফুদ্দিন ওরফে সোহেল, হারুন অর রশিদ, সাইফুল ইসলাম, সোহেল রানা, খাদেমুল ইসলাম মাসুম, এরশাদ আলী, শহীদুল ইসলাম, মো. ইউনূছ ও নজরুল ইসলাম। তাদের মধ্যে শহীদুল ইসলাম ক্রিসেন্ট ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপক। অন্যরা ‘ম্যাগনাম এন্টারপ্রাইজ’-এর পক্ষে ওই বাড়ি দখল করতে যান। আটক ব্যক্তিদের ছাড়াতে পুলিশের কাছে ওপর মহল থেকে জোর তদবিরও করা হয়।
ওসি জানান, আটক ব্যক্তিরা ওই বাড়ি দখলের পক্ষে কোনো বৈধ দলিল বা কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তারা মূলত সন্ত্রাসী কায়দায় বাড়িটি দখল করতে এসেছিলেন।
মাস দুয়েক আগে লন্ডন থেকে দেশে এসে লালমাটিয়ায় নিজের ফ্ল্যাটে উঠেছেন ফরিদা আহসান। গতকাল আলাপকালে তিনি বলেন, এর আগেও অন্তত চার দফায় বাড়িটি দখলের চেষ্টা করা হয়েছিল। একবার ভুয়া ফরিদা আহসান সাজিয়ে বাড়িটি হাতবদলের চেষ্টা করা হয়। বছরখানেক আগে আরেক দফা বাড়িটি দখলের চেষ্টা করা হয় আসল ফরিদাকে ‘মৃত’ সাজিয়ে। এবার সন্ত্রাসী কায়দায় জোর করে তার বাড়ি দখলের চেষ্টা করা হয়েছে।
ফরিদা আহসান বলেন, ‘একাত্তরে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলার সময় লন্ডন থেকে টাকা তুলে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে দেশে টাকা পাঠাতাম। লন্ডনে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে কার্গো ব্যবসা শুরু করি। চার ছেলেমেয়েও সেখানে বড় হয়েছে। তারা সেখানে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শেষ বয়সে স্বামী-সন্তান নিয়ে মাঝেমধ্যে দেশে এসে থাকার পরিকল্পনা ছিল। এখন আর সে ভাবনা নেই।’ ফরিদা আহসান দাবি করেন, তার বাড়ি দখলে জড়িত প্রতারক চক্রটির সঙ্গে রাজউকের কোনো অশুভ সিন্ডিকেট জড়িত থাকতে পারে।
এ ব্যাপারে রাজউকের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদিন ভুঁইয়া বলেন, রাজউকের কোনো সদস্য এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকলে তদন্ত করে অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে উত্তরায় ফরিদা আহসান নামে কোনো নারীর বাড়ি দখলের চেষ্টার ব্যাপারে তাকে কেউ জানাননি।
ব্রিলিয়ান্ট কলেজের অধ্যক্ষ জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, চার বছর ধরে ওই বাড়ির একটি অংশ ভাড়া নিয়ে কলেজ পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে দু-এক দিন পরপরই অপরিচিত লোকজন এসে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি-ধমকি দিত। মাঝেমধ্যে ফোনেও হুমকি দিয়েছে। এ ঘটনায় তিনি উত্তরা-পূর্ব থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছেন। তিনি জানান, বাড়িটি কেনার জন্য ফরিদা আসহানের সঙ্গে বায়না হয়েছিল বলে আগন্তুকরা দাবি করত। তবে কখনা প্রতারক চক্রটি বায়নার কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। সর্বশেষ গত রোববার সকালেও একটি গ্রুপ এসে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কলেজ সরিয়ে নেওয়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়।


