বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

কালিবাঙ্গানের মাতৃমূর্তি: সন্তান জিম্মি করিয়া জননীর মর্যাদা আদায়

Shahnaz-Gaziশাহনাজ গাজী, ম্যানিলা থেকে।

শুনিয়াছি প্রাচীন ভারতে কালিবাঙ্গান নামে একটি সমৃদ্ধ নগর ছিল। সে স্থানের নারীরা ছিলেন যেমনই জ্ঞানী, তেমনই কর্মপটু, সাহসী ও স্বাধীনচেতা । নগরবাসী তাহাদিগকে দেবীবত শ্রদ্ধা করিতেন। শোনা যায়, নগরবাসী তাহাদের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ নগরীর কেন্দ্রস্থলে শ্বাশ্বত কালিবাঙ্গান নারীর একখানি সৌম্য মাতৃমূর্তি স্থাপন করিয়াছিলেন, যাহার বদন ও গঠন ছিল খানিকটা দেবী স্বরস্বতীর ন্যায়।

যাহাদের এত গুণ ও যাহারা সমাজে এত শ্রদ্ধা লাভে অভ্যস্থ, তাহারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে ক্রমে ক্রমে অধিকতর সচেতন ও চিন্তাশীল হইয়া উঠিবেন ইহাই স্বাভাবিক।

সুতরাং তাহাই হইল। নগরীর বিবাহিত নারীরা, যাহারা ইতোমধ্যেই জননী হইয়াছেন, ভাবিয়া দেখিলেন, তাহারা নিতান্ত ক্লেশপূর্বক দিনভর সন্তান পালন করেন, প্রজন্ম তৈয়ার করেন, অথচ তাহারা যে সুযোগ সুবিধা ভোগ করিতে পান, তাহা তাহাদের সন্তানদিগের পিতার চাইতে কেমন যেন ক্ষুদ্র বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। জননীগণ ইহাও ধারণা করিলেন, তাহাদের মর্যাদাও সমাজে কেমন যেন কমিয়া যাইতেছে। তাহাদের মনে পড়িল, তাহাদের স্বামীগণ দিব্যি ঘোড়ার পিঠে চড়িয়া বেড়াইতেছেন, শকট হাঁকাইতেছেন, কাহারো কাহারো হস্তে আবার নগররক্ষার বর্শা রহিয়াছে, কাহারো নিকট বংশদণ্ড প্রদত্ত হইয়াছে (তস্কর ঠেঙাইবার নিমিত্তে)। কিন্তু কই, স্ত্রীদিগের নিকট তো উক্ত সামগ্রী ও অস্ত্রাদি দেওয়া হয় নাই !

ইহা ভাবিয়া নগরের মাতৃকুল বড়ই ক্লিষ্ট হইলেন। নিজেদের সুবিধাবঞ্চিত বোধ করত: বিক্ষুব্ধ এসকল জননী জোটবদ্ধ হইয়া নগর পঞ্চায়েতের নিকট তাহাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য আবেদন করিলেন। পঞ্চায়েত যারপরনাই আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, জননী তো জননীই, তাহার মর্যাদা যে সর্বকালে সর্বাবস্থায়ই সকলের উচ্চে ! অর্থ বা ক্ষমতা দিয়া এই এই মর্যাদা পরিমাপ করে কাহার সাধ্য!

শুনিয়া জননীর দল বড্ড অভিমান করিলেন। কহিলেন, আমরা সিন্ধুর জলে ভাসিয়া আসি নাই।

অন্যান্য নগরবাসী প্রাকৃত ভাষায় যাহা কহিলেন তাহা অনুবাদ করা আমার সাধ্য নহে। তবে অনুমান করি, তাদের কথাবার্তার সার ছিল অনেকটা এরূপ– অহো, ইয়ে বাড়হি তাজ্জব কি বাত হ্যায়। আমরা যাহারা কামার, তাতী, চাষী, শ্রমিক, আমাদের রহিয়াছে কুঠার,তাঁত, কাস্তে, লাঙ্গল। নগরের জননীগণ পঞ্চায়েতের নিকট চাহিলে চাহিবেন এমন সরঞ্জামাদি যাহা সংসারে প্রয়োজন, সন্তান লালন-পালনের জন্য আবশ্যক। বর্শা, বংশদণ্ড বা ঘোড়া লইয়া তাহারা কি করিবেন ?

এ কথা কানে আসিলে জননীগনের অভিমান বাড়িল বই কমিল না। তাহারা পঞ্চায়েত এবং অন্যান্যদের একটি কঠোর শিক্ষা দিতে মনস্থির করিলেন।

পরদিন সকালে পৃথিবীর উপর সূর্য আলো বিছাইল, ফুলেরা সুবাস বিলাইল, পক্ষীকুল গান গাহিল, কিন্তু নগরের ক্ষুব্ধ মাতৃকুল সন্তানকে খাদ্য দিলেন না। নবজাতক মাতৃস্তন্য হইতে বঞ্চিত রহিল, বুলি ফোটা ও চলিতে শেখা সন্তানাদি ক্ষুধার জ্বালায়, খাদ্যের আশায় জননীর পশ্চাতে পশ্চাতে ঘুরিতে লাগিল, মাত: মাত: বলিয়া আবেদন, নিবেদন, ক্রন্দন করিতে লাগিল, তখাপি জননীগণ ফিরিয়াও চাহিলেন না। দুই একজন অবশ্য গ্রীবা ঘুরাইয়া কহিতে বাধ্য হইলেন — আ মর, বালক বালিকার দল, হাড় জালাইলি! বলি আমরা জননী, আমাদিগের নিকট মর্যাদা বেশী, না তোরা? সন্তানাদি উত্তর করিতে পারিল না।

ক্রমে সন্ধ্যা হইল, অভুক্ত শিশুরা পথের ধুলায় পড়িয়া রহিল। কেহ কেহ ঘুমাইয়া পড়িল, পিপিলিকা ও কীটের দংশনে জর্জরিত হইল, কিন্তু জননীরা নির্বিকার।

এমনি করিয়া নগরীর সমস্ত শিশুরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় কাতর হইয়া অযত্নে অবহেলায় মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হইলে পঞ্চায়েত ও অন্যান্য সকলের বোধোদয় হইল। এক্ষণে তাহারা জননীগণের নিকট আসিয়া করজোড়ে বলিলেন, হে দেবীকুল, তোমরা যাহা চাও তাহাই হইবে।

অতপর জননীকুল একটি করিয়া ঘোড়া পাইলেন, কেহ কেহ পিতলের বর্শা, কেহবা বংশদণ্ড বাছিয়া লইলেন। মুদ্রার কথা নাই বলিলাম, উহার প্রয়োজন তো সংসারে রহিয়াছেই। এইরূপে নিজ নিজ সন্তানকে জিম্মি করিয়া কালিবাঙ্গান নগরীর জননীরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করিয়াছিলেন, এই ধরনীতে জননীরূপে স্মীয় মর্যাদা বৃদ্ধি করিয়াছিলেন।

উপসংহার :
ঘোড়া ও বংশ দণ্ডিকাসমূহ দ্বারা জননীগলের কি লাভ হইয়াছিল বলিতে পারিনা, তবে শুনিয়াছি, যেই দিন তাহারা মর্যাদা ফিরিয়া পাইয়াছিলেন, লক্ষ্মী ও স্বরস্বতীর যুগপৎ টানাটানিতে নগরীর কেন্দ্রস্থলে শ্বাশ্বত কালিবাঙ্গান নারীর সেই শান্ত সৌম্য মাতৃমূর্তীখানি নাকি চুরচুর করিয়া ভাঙ্গিয়া, ধুলায় লুটাইয়া পড়িয়াছিল।

পরবর্তীতে উক্ত মূর্তিখানি পুনর্বার নির্মাণ ও স্থাপন করিতে কাহারও নাকি আর প্রবৃত্তি হয় নাই।

শাহনাজ গাজী: ফিলিপাইন্সে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা।

কূটনীতিক শাহনাজ গাজীর পূর্বের লেখা পড়তে পারেন:

o আমাদের কৈশোরের রোমিওরা…

আরও পড়ুন