কমরেড অমল সেন চলে গেছেন ১৩ বছর হয়। নতুন প্রজন্মের মানুষ বিশেষ তাকে চেনেন না। বুর্জোয়া নেতারা যেভাবে প্রচারের আলোতে থাকেন, একজন কমিউনিস্ট নেতার এদেশে সে সৌভাগ্য হয় না- যদিও দেশের পরিবর্তনকারী ঘটনায় তাদের ভূমিকা অসামান্য। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান যুগ ও বাংলাদেশ সময়- এ তিন কাল ধরে তার সংগ্রামী জীবন বিস্তৃত। এ সময়কালগুলোর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এদেশের রাজনীতি, সমাজ সম্পর্ক ও আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি যে ভূমিকা রেখে গেছেন তার একটি সময়ের হিসাবেই তাকে অনন্য জীবনাধিকারী বলা যায়।
ব্রিটিশ আমলে কৈশোরে অমল সেন যুক্ত হয়েছিলেন অগ্নিযুগের বাংলার যুব বিদ্রোহী সংগঠন অনুশীলনে। সেখানে তার উত্তরণ ঘটেছিল কমিউনিস্ট পার্টিতে। এখানেই তিনি বেছে নেন কৃষককে, বিশেষ করে সমাজের একেবারে নিুবর্ণ কৃষককে সংগঠিত করার কাজ। এদের নিয়েই গড়ে তুলেছিলেন এক অভূতপূর্ব কৃষক সংগ্রাম, ইতিহাসে যা তেভাগা আন্দোলন নামে খ্যাত। তেভাগার এ আন্দোলনে তার অঞ্চলের কৃষক সংগ্রামীরা জমিদার মহাজন আর ব্রিটিশ রাজের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়, যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পাল্টা রাষ্ট্রভিত গড়া পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
তেভাগা আন্দোলনের সময়েই ভারত ভাগ হয়ে দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয়। সেই পাকিস্তানে তেভাগা সংগ্রামী কমিউনিস্টদের জায়গা হয় জেলখানায় অথবা ভূতল বা আন্ডারগ্রাউন্ডে। এদেশে তখন সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। কমরেড অমল সেনরা সচেষ্ট হলেন নতুন সংগ্রাম গড়ে তুলতে। ভাষা আন্দোলন এদেশের মানুষকে আবার বদলে দিল। জেলখানায় বসে কমরেড অমল সেন স্বস্তিবোধ করলেন ঘটনাবলীর এই মোড় পরিবর্তনে। কিন্তু ওই পাকিস্তানের জেলখানায় কমরেডদের এ জীবনশিক্ষা দেয়া ছাড়া আর কিছু করার উপায় থাকেনি অমল সেনের জন্য। তবে ওই জেলখানাকেই আদর্শ বিদ্যাপীঠ বানিয়েছিলেন তিনি সব কমিউনিস্ট ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীদের জন্য। শুধু রাজনীতি নয়- রাজনীতি, সংস্কৃতি, নাটক, নাচ, গান, বাঁশি বাজানো- সবকিছুতেই মাতিয়ে রাখতেন কর্মীদের। কিন্তু যখন রাজনীতির দুরূহ প্রশ্ন আসত, সেখানে অমল সেন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পথচলার আসল জায়গাটি বেছে নিতে ভুল করতেন না। এভাবেই কমিউনিস্টদের মস্কো-পিকিং আন্তর্জাতিক বিতর্কে তিনি পিকিংয়ের সংশোধনবাদের বিরোধী অবস্থানের সমর্থন করলেও অন্ধভাবে পথ চলতে রাজি হননি।
এরই ধারাবাহিকতায় ভারতীয় কমিউনিস্ট আন্দোলনে নকশালপন্থার উদ্ভব ঘটে এবং চীন তাকে সমর্থন করে কমরেড অমল সেন তখন তা মানতে রাজি হননি এবং এদেশের সে লাইনের অনুসরণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি নকশালপন্থার ভ্রান্ত লাইনকে বিরোধিতা করেননি শুধু, এসবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে অনন্য ভূমিকা রাখেন। এক্ষেত্রে কমিউনিস্ট ও বামপন্থী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এ সমন্বয় কমিটির ভূমিকা নানা প্রচারে কিছুটা বিস্মৃত অধ্যায় পরিণত হলেও, এটা বাস্তব যে সেদিন ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুর অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় চৌদ্দটি স্থানে প্রতিরোধ ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টরের সঙ্গেও এই সমন্বয় কমিটি ঐক্য গড়ে তুলেছিল।
কমরেড অমল সেনের এ অবস্থান সেদিন বহু তরুণকে ভ্রান্তির হাত থেকে রক্ষা করেছিল। কিন্তু ওই ভ্রান্ত রাজনীতি জনগণ থেকে বাম কমিউনিস্টদের যে বিচ্ছিন্নতার জন্ম দিয়েছিল তার থেকে দীর্ঘকাল এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনকে উদ্ধার করা যায়নি। এ ধরনের এক অবস্থায় বাংলাদেশ উত্তরকালে কমরেড অমল সেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে পার্টিকে পুনর্গঠিত করার উদ্যোগ নেন। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ববাংলা সমন্বয় কমিটি, কমিউনিস্ট সংহতি কেন্দ্র ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (হাতিয়ার) গ্রুপ ঐক্যবদ্ধ গড়ে ওঠে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (লেনিনবাদী), যা তার দ্বিতীয় কংগ্রেসে ১৯৮০-তে ওয়ার্কার্স পার্টি নাম ধারণ করে। কমরেড অমল সেন প্রথমে এর সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি হন। তার মৃত্যু এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে শূন্যতা সৃষ্টি করেছে তা অপূরণীয়।
অমল সেন শুধু একজন বিপ্লবীই ছিলেন না। তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী জীবন অধিকারী। বিপ্লব ও বিপ্লবী আদর্শের প্রতি তিনি যেমন একনিষ্ঠ ছিলেন, একই সময় মানুষ হিসেবে তার জীবনবোধ, রসবোধ, জীবনকে উপভোগ করার শক্তি ছিল অতুলনীয়। তার সংস্পর্শে এসে যে কোনো মানুষ আনন্দ পেত। কি বয়স্ক, কি যুবক-কিশোর-শিশু- সবার কাছেই তিনি ছিলেন আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব।
বিপ্লবের প্রয়োজনে অমল সেনকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ত্যাগ করতে হয়েছিল। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক পড়াশোনায়- শুধু মার্কসীয় দর্শন ও তত্ত্বই নয়, সাহিত্য, শিল্পকলা, বিজ্ঞান এমনকি চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কেও তার পারদর্শিতা ছিল। ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক সবকিছুই তার মনোযোগ পেয়েছে। এ বিনয়ী-নম্র মানুষটি আবার সংগ্রামে ছিলেন দৃঢ়চিত্ত- সে রাজনৈতিক সংগ্রামই হোক, তাত্ত্বিক সংগ্রামী হোক, অমল সেন চলে গেছেন। রেখে গেছেন এমন আদর্শ যার মৃত্যু ঘটে না। তিনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন এদেশের মাটিতে, কমরেড অমল সেন লাল সালাম।
রাশেদ খান মেনন : বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী



