বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

‘বেডরুম ভিডিও ক্যামেরায় না দেখে সরাসরি শোনাই ভালো’

'বেলা শেষে' নিয়ে পর্যালোচনাফারহানা হাফিজ।

বেশ কদিন ধরে অনেকেই ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া কলকাতার সিনেমা “বেলাশেষে” নিয়ে তাদের মতামত দিচ্ছেন। সিনেমার বিষয়বস্তুটাই এমন যা মানুষকে ভাবতে বা ভাবতে বাধ্য করবে।

কী সেই ভাবনা?

সংক্ষেপে যদি বলি, কলকাতায় বসবাসকারী বিশ্বনাথ ও আরতীর ৪৯ বছরের সংসার জীবন তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে। দশমী উপলক্ষ্যে এই দম্পতি সব ছেলেমেয়ে ও তাদের সন্তানদের ডাকে বিশ্বনাথ কিছু বলবে বলে। পূজা শেষে ঘরোয়া বৈঠকে বিশ্বনাথ জানান, তিনি আরতীকে ডিভোর্স করতে চান, কারণ তাঁর মনে হয়েছে, ৪৯ বছরের সংসার জীবনে তিনি আরতীর কাছ থেকে কিছু পাননি, যেভাবে তিনি চেয়েছেন। সবকিছুই একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বনাথের ভাষায়, আরতীর জীবন অনেক বেশী সংসারের তেল, নুন, চিনির মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে বিশ্বনাথের মনোজগত কলকাতার প্রকাশনা থেকে শুরু করে সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের আনাগোনায় উদ্দীপ্ত। কাহিনী এগিয়ে যেতে থাকলে আমরা এও জানতে পারি, ৪৯ বছরে বিশ্বনাথ ও আরতীর জানা হয়নি একে অপরের ভালো লাগা, স্বপ্নের কথা।

মোদ্দা কথায় মানসিক বা শারীরিক কোন দিক থেকেই বিশ্বনাথ ও আরতীর ভালোবাসার বন্ধনটি মজবুত নয়, যদিও এগুলো শোনা গেছে বিশ্বনাথের কথায়। আরতীর ভাবনাটি সিনেমাতে পরে আসে, এবং সেখানেই দর্শক হিসেবে, নারী হিসেবে আমার আপত্তি আছে। সে কথায় পরে আসছি।

“বেলাশেষে” সিনেমাটি বিষয় নির্বাচনের দিক থেকে অত্যন্ত সময়োপযোগী। দর্শকের মনের কোনে, সমাজের বৈবাহিক সম্পর্ক নিয়ে সনাতন ধারণার বুকে আঘাত দিয়ে সিনেমাটির কাহিনী শুরু হয়। কিন্তু কাহিনী যতো এগোতে থাকে, আমরা দেখতে পাই কিভাবে আধুনিক হতে গিয়েও সিনেমাটি দাম্পত্য জীবনের চিরন্তন যে ধারণা তার চোরাগলির মধ্যেই হারিয়ে যায়।

কিছুটা আলোর দ্বীপশিখা হয়ে উঠছিলো যখন আরতীর কন্ঠে শুনতে পাই সংগীতের রাগ-রাগীনির সুর। কিন্তু পরক্ষণেই তা উবে যায় আরতীর নাতনীকে তেল মাখানোর স্বপ্ন প্রকাশের মধ্যে। কিংবা আশার আলো হয়ে উঠছিলো যখন আরতী বলেন, বিশ্বনাথ তাঁর জন্মদিন মনে রাখতে পারেনি। কিন্তু তা জ্বলে উঠার আগেই নিভে যায় যখন আরতী বলেন, বিশ্বনাথকে আর তাঁর পরিবারের সবাইকে সেবার মধ্যেই তিনি প্রেম খুঁজে পান। তীব্র একটা আওয়াজ ছিলো আরতীর বিশ্বনাথের প্রতি “যাওয়ার সময় তো বলে যাওনি, এখন ফেরার সময় কেন?” কিন্তু সেই আওয়াজ মিইয়ে যায় আরতীরই কথায়, “ভেতরটা আমি আর বাহিরটা তুমি সামলাবে, এমনটাই তো কথা ছিলো”।

শুরুতে যে বলেছিলাম, বিষয় নির্বাচনটা ঠিক ছিল, কিন্তু কাহিনীর আবর্তে দেখতে পেলাম পুরোটাই বিশ্বনাথের চোখে, তার মেধা ও মননের চাহিদার মাপকাঠিতে। এখানে আরতীর ভাবনার প্রতিফলন আবারও সেই সংসারের ঘেরাটোপের মধ্যে। যদিও শেষবেলায় আরতীকে কিছুটা স্বাবলম্বি করে দেখানোর একটা প্রয়াস ছিলো, কিন্তু তাও তো বিশ্বনাথের পছন্দে বা তার চাপিয়ে দেয়া বৃত্তের মধ্যে।

ব্যক্তি হিসেবে সব সময় বিশ্বাস করি, বৈবাহিক সম্পর্কের সুরটা কখনও দায়িত্ববোধের উপর ভিত্তি করে বাজতে পারেনা, এটা বাজতে হবে পারস্পরিক অনুধাবন, পারস্পরিক উপভোগ ও পারস্পরিক উদযাপনের ঢঙে, সেটা মানসিক তো বটেই, শারীরিক দিক থেকেও। দায়িত্ব সেখানে একটি অনুষঙ্গ মাত্র। কিন্তু আমাদের সংস্কৃতিতে অনুষঙ্গটাই মূল হয়ে যায়, আর প্রতিদিন বিশ্বনাথ ও আরতীর মতো ৪৯ কেন, ৬০ বছরেও একে অপরকে জানার, ভালোবাসার দরকার হয় না।

সিনেমা সবসময় সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, আর ‘বেলাশেষে’ একটি হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারতো আরতীর চরিত্রটিকে ভিন্নভাবে দেখানো হলে। বা বিশ্বনাথ ও আরতীর সন্তানরা যদি বাবা-মার বেডরুমে ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে কথোপকথনটা না শুনে মুখোমুখি হতেন।

লেখাটা শেষ করছি আর ভাবছি আমার প্রিয় পরিচালক প্রয়াত ঋতুপর্ণের কথা। যদি ঋতুপর্ণ এ্রই ছবিটির পরিচালক হতেন, তাহলে কী অসামান্যই না একটি সিনেমা হতো! যেমনটি পেয়েছি Memories in March কে।

তারপরও সবশেষে বলবো, বিষয়বস্তু, নির্মাণশৈলী ও অভিনয় গুনে ” বেলাশেষে” একটি ভালো সিনেমা যা সবার দেখা উচিত এবং অনুধাবন করা উচিত সম্পর্ক প্রতিদিনের পরিচর্যার বিষয়, হোক তা মানসিক বা শারীরিক।

প্রসঙ্গত, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত অভিনীত সিনেমাটির এ সাফল্যে উচ্ছ্বসিত এর দুই পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। সিনেমায় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, শঙ্কর চক্রবর্তী, ইন্দ্রাণী দত্ত, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অপরাজিতা আঢ্য, খরাজ মুখোপাধ্যায়, অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, মনামি ঘোষ প্রমুখ।

সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমার পর সৌমিত্র ও স্বাতীলেখা আবারও একসঙ্গে অভিনয় করেছেন তিন দশক পর।

সিনেমায় দেখা যায়, পারিবারিক আনন্দঘন এক মুহূর্তে স্ত্রী আরতির সঙ্গে ৪৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের ইতি টানার ঘোষণা দেন বিশ্বনাথ মজুমদার। তার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দম্পতির চার সন্তান ও তাদের পরিবারে নানা টানাপড়েন শুরু হয়।

আরও পড়ুন