বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী বয়স কমাচ্ছেন: বিপাকে নির্বাচন কমিশন

NID-ddঅষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের ফিক্সেশনে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অত্যাবশ্যকীয় হয়েছে। এই সুযোগে যারা এটাকে এতোদিন গুরুত্ব দেননি, বা ভুলভাল তথ্য দিয়ে কার্ড করেছিলেন, এখন তারা এই সুযোগে বয়স কমানোর চেষ্টা করছেন।
এছাড়া আরো অনেকে চেষ্টা করছেন যদি বয়স কমানো যায় তবে তো ভালোই হয়! প্রায় চার লাখ এমন আবেদনের পর নির্বাচন কমিশন থেকে বিষয়গুলোকে ‘সন্দেহজনক’ অভিহিত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, নির্বাচন কমিশন মনে করছে, এতো বিপুল সংখ্যক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বয়স এতোদিন ধরে ভুল থাকার কথা নয়। সরকারি চাকরি যারা করেন, তাদের তো চাকরিতে যোগদানের সময়ই বয়সের উল্লেখ করতে হয়েছে, তাই এখন লাখখানেক ‘ভুল সংশোধন’ স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। এর মধ্যে নিশ্চয়ই কিন্তু রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র অণুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সালেহ উদ্দীন বলছিলেন, “অনেক সরকারি কর্মকর্তা ‘সার্টিফিকেটে বয়স কম দেখিয়ে’ চাকরি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বয়সের সঠিক তথ্য যাচাই করলে দেখা যাবে, তাদের অবসরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। পরিচয়পত্রের সঙ্গে সার্টিফিকেটের বয়সের এমন তারতম্য অনেক সন্দেহেরও জন্ম দিচ্ছে।”

চার লাখের মতো একই ধরনের আবেদনকারী সরকারি চাকরিজীবীদের এই বিশাল এ সংখ্যাকে ‘বিস্ময়কর’ উল্লেখ করে জাতীয পরিচয়পত্র অণুবিভাগের মহাপরিচালক বলেন, এটা নির্বাচন কমিশনের তথ্য সংগ্রহকারী ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের ভুল নয়। তিনি বলেন, “ধরে নিলাম অনেকের নামের বানান ভুল, নামের বানানে ভুল ধরা পড়লেও এখন বয়স কম হওয়ার কারণ কি? এটাকে তো সংশোধন বলা যায় না; বলতে হবে তথ্য পরিবর্তনের আবেদন।”

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ও জন্মতারিখ পরিবর্তনসহ তথ্য অসঙ্গতির বিষয়টি এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন আকারে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, “সরকারি চাকরি যারা করেন, তাদের বয়সের এত হেরফের হওয়ার তো কথা নয়। আমরা চাচ্ছি বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে আনতে। সেক্ষেত্রে মাস খানেকের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তালিকা পাঠাব।”

সরকারি চাকুরেদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য সংশোধনের চাপের মধ্যে ভুল তথ্য লিপিবদ্ধ করা নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে ভুক্তভোগী এবং জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পক্ষ থেকে।

এদিকে শুধু সরকারি কর্মকর্তাই নন, আরও অনেক নাগরিকের পরিচয়পত্রে মিলছে ভুল। ভুক্তভোগীরা এর ‘সম্পূর্ণ দায়’ ডাটা এন্ট্রি অপারেটরদের ওপর দিয়ে বলছেন, তথ্য লিপিবদ্ধ করার সময় তাদের অসচেতনতাই সমস্যা বাড়িয়েছে।

তবে নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পাল্টা অভিযোগ চাকুরেদের প্রতি। তারা মনে করছে, অনেক চাকুরে বয়স কমিয়ে চাকরিতে থাকার চেষ্টা চালানোয় তথ্যবিভ্রাটের এই ঝঞ্ঝাট।

নিবন্ধন অনুবিভাগের ‘সন্দেহ’কে আমলে নিচ্ছেন না সরকারি কর্মকর্তারা। তাদের ভাষ্য, নিজেদের ভুল ঢাকতে এনআইডি সংশ্লিষ্টরা এ ‘চাতুরীর’ আশ্রয় নিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, “নিবন্ধন ফরমে সঠিক তথ্য দিয়েছি। কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রে দেখেছি উল্টো এসেছে। তাহলে ভুল কোথায় হয়েছে? ডাটা এন্ট্রির সময় উল্টোভাবে করায় এমন দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।”

অবশ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল সংশোধন না করার জন্য নিজেকেও খানিকটা দায়ী করেছেন এই সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “জাতীয় পরিচয়পত্র যে এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা আগে চিন্তাই করিনি। ইচ্ছা ছিল সময়-সুযোগ বুঝে সংশোধন করব।কিন্তু এখন তো এটা জরুরি হয়ে পড়েছে।”

একাধিক ভুক্তভোগী জানান, বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশকে কেন্দ্র করে স্বল্প সময়ের মধ্যে এনআইডি সংশোধনে সরকারের ‘আকস্মিক’ নির্দেশনায় বিপাকে পড়েছেন তারা।

সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রকাশের পর জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহারের নির্দেশনা আসায় তথ্য সংশোধনের হিড়িক পড়ে।

সারাদেশে ভোটার তালিকা হালনাগাদের পাশাপাশি তথ্য সংশোধনের এ বিশাল আবেদনে ‘চাপে পড়া’র কথা স্বীকার করেছে এনআইডি কর্তৃপক্ষও।

‘ম্যানুয়ালি’ বেতন কাঠামো ঠিক করে এনআইডি সংশোধনের জন্য অন্তত তিন মাস সময় দিলে পরিস্থিতি এতটা জটিল হতো না বলে মত তাদের।

এদিকে উপজেলা পর‌্যায়ে ‘তথ্য পরিবর্তনের’ আবেদন নিয়েও ইসিতে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।মাসের পর মাস অপেক্ষার পরও সেখানকার নাগরিকরা সংশোধিত এনআইডি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ধরনের ‘অনিষ্পন্ন’ আবেদনের বিষয়গুলো সম্প্রতি কমিশনের সভায় তুলেছেন জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুল মোবারক।

সভায় এ নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে সেগুলো নিষ্পত্তির জন্যে তার পক্ষ থেকে ‘অনানুষ্ঠানিক’ নোট দেওয়া হয়েছে বলেও কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এ নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সালেহ উদ্দীন।

আরও পড়ুন