বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

অষ্টম পে-স্কেল ৯৫% চাকরিজীবীই ক্ষতির সম্মুখীন হবেন

Pay-Scale (1)প্রীণন ফারুক।

আমি সরকারি চাকুরে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাষ্ট্রের কাজে নিয়োজিত থাকি। আমার পক্ষে অন্য কোনো কাজ করা সম্ভব নয়। আইনগতভাবে বৈধও নয়। আমাকে চাকুরি থেকে প্রাপ্ত বেতন দিয়েই চলতে হয়। আমি তো আর একা নই। আমার একজন স্ত্রী থাকতে পারে, দু’একজন সন্তান থাকতে পারে, মা-বাবা-ভাই-বোন থাকতে পারে। সব মিলিয়ে গড়ে ৪/৫ জনের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসার নিশ্চয়তা আমাকেই করতে হয়। রাষ্ট্র যেহেতু আমার সমস্ত কর্মঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে, সেহেতু রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে যায় আমার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া।

এখন আমি কী খাব, কী পরব, কোথায় থাকব, কোথায় কী চিকিৎসা নেব, সন্তানদের কোথায় পড়াব তা আপেক্ষিক ব্যাপার। কেননা, দুনিয়াটা সাম্যবাদের নয়। তারপরও ন্যূনতম একটা মান অবশ্যই রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে। শিক্ষা ও চিকিৎসা এখন দেশের প্রধান কয়েকটি পণ্যের মধ্যে পড়ে। রাষ্ট্র এ দুটো সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। স্বাভাবিকভাবেই আয়ের বড় একটা অংশ এসব খাতে ব্যয় করতে হচ্ছে। বাসস্থানের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। আয়ের বড় অংশটা চলে যাচ্ছে এ খাতে। আমি কী পরবো? বছরে অন্তত ২/৩ টা শার্ট, দুটো প্যান্ট পরা কি বিলাসিতার মধ্যে পড়বে?

অন্য-বস্ত্রের কথা কিংবা পরিবারের অন্যান্যদের বস্ত্রের কথাও ভাবতে হবে। আমি তো প্রতিদিন বিরিয়ানি-পোলাও খেতে চাচ্ছি না। আমাকে দিনে এক টুকরো মাছ, সপ্তাহে এক টুকরো মাংস, কয়েকটা ডিম, কিছু শাকসবজি, সাদা মোটা চালের ভাতের ব্যবস্থা তো আমাকে করতে হয়, হবে। এটুকু চাওয়া তো অনেক বেশি কিছু হতে পারে না। যেহেতু আমি আমার নিজেকে রাষ্ট্রের জন্য নিয়োজিত করছি, সেহেতু রাষ্ট্রকেও আমাকে ও আমার পরিবারকে দেখতে হবে। এটা ভিক্ষা, অনুকম্পা কিংবা করুণা নয়; এটা আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে।
কেউ কেউ বলবে, গরিব দেশ, এতো টাকা দেবে কীভাবে! তাদের বলব, আশেপাশে একটু তাকাতে! আমাদের থেকেও নিম্ন আয়ের দেশের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আমাদের থেকেও কয়েক গুণ বেশি। কেউ কেউ বলবে, সরকারি চাকুরেরা দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় বানাচ্ছে। কথা সত্য। কিন্তু এটা তো স্বাভাবিকের মধ্যে পড়ে না। এটাকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের, রাষ্ট্রের। আর এদেশে দুর্নীতি করার সুযোগ আছে কত ভাগ চাকুরের?

এদেশে দুর্নীতি করে না কিংবা করার সুযোগ পায় না এমন কোন সরকারি চাকুরে আছে যে মোটামুটি চলতে পারে, সমাজের সাথে ন্যূনতম তাল মিলিয়ে চলতে পারে? একজনও নেই। যারা পারে তাদের উত্তরাধিকার সুত্রে কিছু ছিল বলে কিংবা পরিবারের অন্যান্যদের সহযোগিতার কারণে। তাহলে যারা দুর্নীতি করে না রাষ্ট্র তাদের কী পুরস্কার দিচ্ছে!

কোনও স্কেলেই সরকারি চাকুরেদের বেতন বাড়ে না আসলে। বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেখানে গিয়ে ঠেকে সরকার পে-স্কেলের মাধ্যমে তার সাথে বেতনের সমন্বয় করে থাকে মাত্র। পে-স্কেল বাস্তবায়নের সাথে সাথেই বাজারও লাফিয়ে ওঠে। ফলাফল- যেই লাউ, সেই কদু।

দীর্ঘদিনের গবেষণা, আলোচনা, সমালোচনার পর গেজেট হয়েছে অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেলের। সরকার পক্ষ থেকে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছে চাকুরেদের বেতন বেড়েছে দ্বিগুণ। দেশের কোটি মানুষের সবাই জানে এমন কথা। কিন্তু এটা একটা রাজনৈতিক চাল, গোঁজামিল ও শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এটা সত্য যে, চাকুরেদের মূল বেতন এক লাফে মোটামুটি দ্বিগুণ করে দেওয়া হয়েছে। এটাই হচ্ছে টোপ। এ টোপ গিলেই মারা পড়বে সবাই। প্রতিটি পে স্কেলেই ৬০-৭০% বেতন বৃদ্ধি করা হয়, এক্ষেত্রে বেড়েছে তার থেকেও বেশি। কিন্তু তারপর?

অষ্টম পে-স্কেলকে স্থায়ী পে-স্কেলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। আগে সাধারণত ৫/৬ বছর পর পর পে-স্কেল ঘোষণা করা হতো, বেতন বৃদ্ধি পেত ৫৫-৭০% পর্যন্ত; ধরে নেই গড়ে তা ৬০%। অর্থাৎ পাটিগণিতের হিসেবে বেতন বৃদ্ধি পেত বছরে ১০-১২%। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ স্কেলে বেতন বৃদ্ধি পাবে সর্বোচ্চ বার্ষিক ৫%, যা বিরাট-বিশাল প্রতারণা। এই ৫% সমানুপাতিক হারে বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তো নগন্যই। এমনকি পূর্বতন পদ্ধতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির থেকেও কম।

একটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি পরিস্কার করা যায়। রাষ্ট্রের দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাদের স্কেল ছিল ৮০০০ টাকা, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ৪৫০ টাকা। এখন ৮০০০ টাকা হয়েছে ১৬০০০ টাকা। পূর্বের পদ্ধতিতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হতো ৯০০ টাকা। বর্তমান পদ্ধতিতে এ স্কেল প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর শেষে হবে ১৬৮০০, ১৭৬৪০ ও ১৮৫৩০ টাকা। পূর্বের পদ্ধতিতে হতো ১৬৯০০, ১৭৮০০ ও ১৮৭০০ টাকা।

এখানে, পূর্বের পদ্ধতিকে ধরতে পারছে না বর্তমান পদ্ধতি। চতুর্থ বছরে বর্তমান পদ্ধতিতে হবে ১৯৪৬০ টাকা, কিন্তু পূর্বের পদ্ধতিতে সিলেকশন গ্রেড পেয়ে হয়ে যেতো অন্তত ২২৯৮০ টাকা। কতো বড় প্রতারণা! পূর্বের পদ্ধতিতে আবার ৫/৬ বছর পর আরেকটা পে-স্কেল হয়ে স্কেল বৃদ্ধি পেতো ৫৫-৭০%! বর্তমান পদ্ধতিতে ৬ বছর পরে এ স্কেলের বেতন হবে ২১৪৭০ টাকা; কিন্তু পূর্বের পদ্ধতিতে সেটা ৩০ হাজার ছাড়িয়ে যেত। স্কেল দ্বিগুণ বৃদ্ধি দেখিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন করে দিচ্ছে আমাদের, এটা যে-ই গভীরভাবে ভাববে তারই গা শিউরে উঠবে।

রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অধিকাংশের পদই ব্লক পদ, কোনো প্রমোশন নেই। কিছু কিছু পদে কদাচিৎ প্রমোশন হয়। ২২-২৩ লক্ষ চাকুরের মধ্যে নিয়মিত প্রমোশন লাভ করে হাতেগোনা কয়েকজনে। সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেলের সুবিধা বাতিলের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ৯৫% চাকুরেই ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ১০ বছর ও ১৬ বছরের যে গোঁজামিল দেখানো হচ্ছে তা এককথায় হাস্যকরই।

আগে প্রতিটি পে-স্কেলে বেতন বৃদ্ধি হতো মোটামুটি ৫৫-৭০%। এটা পরিস্কার যে, উচ্চ শ্রেণির চাকুরেদের ৫৫%, নিম্নশ্রেণিদের ৭০%। এতে করে বেতন বৈষম্য কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে থাকতো। এখন ৫ থেকে ২০তম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধি পাবে একই হারে। এটার কুফল চিন্তা করলে গা শিউরে ওঠে! বেতন বৈষম্য পাহাড়সম হতে বেশি দেরি লাগবে না। ৫ থেকে ২০ তম গ্রেডকে একভাগ না করে অন্তত ৩/৪ টা ভাগ করলে পাহাড়সম বেতন বৈষম্য কিছুটা ঠেকানো যেতো। এসবই শুভঙ্করের ফাঁকি, প্রজাদের সাথে প্রজাতন্ত্রের কর্তাব্যক্তিদের প্রতারণা।

ফালতু এ পে-স্কেলের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের বিভিন্ন শ্রেণির চাকুরেদের মধ্যে বৈষম্য ঢুকিয়ে দিয়ে একটা জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলা হয়েছে। পে-স্কেল কার্যকর ১ জুলাই, ২০১৫ থেকে অথচ সিলেকশন গ্রেডের সুবিধা গেজেট প্রকাশের আগের দিন পর্যন্ত! এটাকে হাস্যকর বললেও কম বলা হয়। সবচেয়ে হাস্যকর কথা হলো, বলা হচ্ছে পে-স্কেল কার্যকর ১ জুলাই, ২০১৫ থেকে আর প্রবৃদ্ধি হবে প্রতি বছরের ১ জুলাইয়ে, কিন্তু ১ জুলাই, ২০১৫ তে হবে না! কেন ভাই, পে-স্কেল কার্যকর হবে ১ জুলাই, ২০১৫ এর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ডের সময়? ওটা সই করার পর আর প্রবৃদ্ধিতে সই করার সময় থাকবে না? মানুষ কতোটা বেহায়া, বেশরম, গর্দভ হলে এমন বিধান করতে পারে!
গেজেট প্রকাশের পর এখন আবার শুরু হয়েছে ৮ ও ৯ নম্বর গ্রেডের রম্য নাটক! এ সবই গোঁজামিল।

অষ্টম জাতীয় বেতন স্কেল হলো গোঁজামিল ও শুভঙ্করের ফাঁকির পে-স্কেল। রাষ্ট্রের সামান্য কয়েকজন চাকুরে কর্তৃক অধিকাংশ চাকুরেকে অপমান করার পে-স্কেল। অধিকাংশ চাকুরেদেরকে অসন্তুষ্ট রাখার এ স্কেল নিঃসন্দেহে এদেশের জাতীয় রেকর্ড। এতো সময় নিয়ে পে-স্কেল প্রসব, এটাও মনে হয় রেকর্ড।

রূপকথার গল্পে পড়েছিলাম, বারো হাত কাঁকরের তেরো হাত বিচি। রূপকথাকে হার মানিয়েছে আজকের এই বাংলাদেশ। এদেশের প্রবল প্রভাব ও প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সুপারিশও এদেশের জনগণের চাকর আমলারা থোড়াই কেয়ার করে! আমলাদের মগজ ও মানসিকতার জন্য আমাদের করুণা ও ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই জাগে না।

প্রীণন ফারুক, সোনালী ব্যাংক-এ কর্মরত।

আরও পড়ুন