কল্লোল কর্মকার, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল ভালস সতর্কবানী উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, শরণার্থী সমস্যার যদি কোনো ঠিকঠাক সমাধান না হয় তাহলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভেঙে দেয়া হতে পারে।
গ্রিস উপকূলে আবারও নৌকাডুবে ৪৩জন শরণার্থীর মৃত্যু হলো। এর আগে এই গ্রীসের সমুদ্র উপকূলেই ছোট্টো শিশু আয়লান কুর্দির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গোটা ইউরোপে শরণার্থী বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল এবং ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে ইউরোপ শরণার্থীদের জন্য তার দরজা খুলে দিয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া বেশকিছু সন্ত্রাসী হামলার কারণে শরণার্থী ইস্যুটি যখন প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের কাছে, তখনই আবার এই ৪৩জন শরণার্থী মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে সঙ্কটে ফেলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে।
শরণার্থী সমস্যা কতটা গুরুতর
গত বছর কমপক্ষে দুই মিলিয়নের কাছাকাছি অভিবাসী এবং শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করেছে। আর এই বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারীর অধিকাংশই তুরস্ক হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করেছে। কিন্তু শীতকাল চলে আসায় ধারণা করা হয়েছিল যে, শরণার্থীদের ইউরোপ প্রবেশ কিছুটা কমবে। যদিও বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। জানুয়ারি মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই প্রায় চল্লিশ হাজার শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করেছে। অথচ গত বছর জানুয়ারি মাসে যেখানে মাত্র ১৬০০ শরণার্থী প্রবেশ করেছিল।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা
গত বসন্ত থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বেশকিছু উদ্যোগ নেয়া হয় এই সমস্যা মোকাবেলায়। পৃথক পৃথক ছয়টি সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা শরণার্থী সমস্যা নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন কিন্তু সবগুলো আলোচনার ফলাফলই খুব শ্লথ। আলোচনার টেবিলে তারা শরণার্থীদের প্রবেশ ঠেকানো, স্থানান্তর প্রক্রিয়া, নতুন সীমান্তরক্ষী পুলিশ এবং তুরস্কের সঙ্গে শরণার্থী অনুপ্রবেশ বিষয়ে চুক্তি করেছে যাতে সিরিয়া থেকে শরণার্থীরা ইউরোপে প্রবেশ করতে না পারে।
স্থানান্তর প্রশ্নে সমস্যা
ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে এক লাখ ষাট হাজার মানুষ স্থানান্তর করার পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই বিতর্কিত হয়েছে। ইউরোপের পূর্বাঞ্চলীয় দেশগুলো যেমন হাঙ্গেরি আলোচনার টেবিলে দেখিয়েছে যে, কিভাবে শরণার্থীরা বার্লিনে প্রবেশ করতে চায় বুদাপেস্টে নয়। আর ওই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার ফলাফলও অতটা আশাপ্রদ নয়, কারণ গত সেপ্টেম্বর থেকে মাত্র ৩৩১জন শরণার্থীকে স্থানান্তর করা গেছে। ইউরোপের বাইরে শরণার্থীদের আবাসান করে দেয়ার পরিকল্পনাটি সফল হয়নি। গত বছরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষকে ইউরোপ বাইরে পাঠাতে পারেনি, এমনকি চলতি বছরের শুরুতেও কোনো আশাব্যাঞ্জক ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সীমান্ত পুলিশ পরিকল্পনা
গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা একটি পরিকল্পনা প্রনয়ন করেন যেখানে ইউরোপের সীমান্ত এবং নৌবাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাবনা করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রিস এবং ইতালি যেখান দিয়ে সর্বাধিক সংখ্যক শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করে। শরণার্থীদের যাতে গ্রিস থেকেই সঠিক কাগজপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করে সামনের দিকে পাঠানো হয় সেদিকেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুত বলেন, ‘আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যেই শরণার্থী ইস্যুটি আমাদের নিয়ন্ত্রনের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।’ অর্থাৎ বোঝাই যাচ্ছে, ইউরোপের নেতারা শরণার্থী সমস্যাটিকে দীর্ঘদিন জিইয়ে রাখতে চাচ্ছেন না।
তুরস্ক কি সাহায্য করবে?
শরণার্থীদের প্রবেশ ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্কের সঙ্গে ইতোমধ্যে তিন বিলিয়ন ইউরোর একটি চুক্তি করেছে। তুরস্ক নিজেও প্রায় সোয়া দুই মিলিয়ন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, যাদের মধ্যে অধিকাংশই সিরিয়া, ইরাক এবং অন্যান্য যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসা। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থমন্ত্রীরা এখনও নিশ্চিত হতে পারছেন না যে, এই শরণার্থীদের সমস্যা মোকাবেলার ব্যয় কাদের দিতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মকর্তারা শুরু থেকেই তুরস্কের প্রতি অভিযোগ করে আসছে যে, সমস্যা মোকাবেলায় তুরস্কের যতটুকু করা দরকার তারা সেটা করছে না। অপরদিকে আঙ্কারা বলছে, সমস্যা মোকাবেলার জন্য তিন বিলিয়ন ইউরো যথেষ্ট নয়।
ইউরোপ কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শরণার্থীরা ইউরোপের জন্য এখন আর্শীবাদ। গেল বছরের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের করা এক রিপোর্ট অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির হার আগের তুলনায় বেড়েছে কমার বদলে। অস্ট্রিয়া, জার্মানি এবং সুইডেনের সাবেক প্রবৃদ্ধি হারের সঙ্গে এক দশমিক এক শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। শুধু তাই নয়, শরণার্থীরা আসার ফলে ইউরোপের যে জনসংখ্যা সমস্যা চলছিল সেটাও অনেকটাই কমেছে। তবে অন্যদিকে ইউরোপের কর্মক্ষম শ্রমিকের সংখ্যা ২৪০ মিলিয়ন থেকে ২০৫০ সাল নাগাদ ২০৭ মিলিয়নে পৌছাতে পারে। এমনকি শরণার্থীরা যদি বর্তমান সময়ের মতোই ইউরোপে প্রবেশ করে তাহলে শ্রমিকের সংখ্যা কমে দাড়াবে ১৬৯ মিলিয়নে।
জার্মানির দরজা খোলা বা বন্ধ করার কারণ
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল সিরীয় শরণার্থীদের তার দেশে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম কুড়িয়েছেন। কিন্তু জার্মানির আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে মেরকেলকে তার অবস্থান থেকে সরে দাড়াতে হয়েছে। নতুন বছরের শুরুর রাতে জার্মানিতে শরণার্থীদের হাতে নারী লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনা শরণার্থীদের জন্য জার্মানির দরজা বন্ধ করতে আরও সহায়ক হয়। নতুন বছরের রাতের ওই ঘটনার জন্য মেরকেলের বিরোধী দলগুলো সরাসরি শরণার্থীদের দায়ী করছে।
ঝুঁকির মুখে ইউরোপের অভিন্ন সীমান্ত
ইউরোপে এক দেশের পাসপোর্ট দিয়ে সবগুলো দেশেই যাওয়া যায়। বিশেষ করে অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থা চালু করার পর থেকে ইউরোপবাসী এই সুবিধা পেয়ে আসছে। আর শরণার্থীরাও এই সুবিধাটিকেই কাজে লাগাচ্ছে তাদের জীবন বাঁচানোর তাড়নায়। কিন্তু তারপরেও অস্ট্রিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, ডেনমার্ক এবং নরওয়ে(নরওয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত নয়) অস্থায়ীভাবে সীমান্তে তল্লাসী চৌকি বসিয়েছে। দ্য ইউরোপীয়ান কমিশনের প্রেসিডেন্ট জেন ক্লঁদ জাঙ্কার সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, যদি অভিন্ন সীমান্ত ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে বাৎসরিক আড়াই বিলিয়ন ডলার ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্রেফ ব্যবসা ক্ষেত্রে। অপরদিকে ইউরোপীয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড তুস্ক বলেন, আগামী মাসে যদি শরণার্থী ইস্যুতে নেতারা কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারেন তাহলে অভিন্ন সীমান্ত ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
কি হবে গ্রিসের?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুসারে আশ্রয় প্রার্থীদের অবশ্যই প্রথম নিরাপদ দেশে নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু এই ‘ডাবলিন’ নীতিমালা গ্রিস এবং ইতালির উপর অনেক প্রশাসনিক বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে এবং সেটা বৃহদার্থে অবহেলা করে অধিকাংশ শরণার্থীই সমুদ্রপথ বা সড়কপথে জার্মানি এবং সুইডেনে যাচ্ছে। গত মার্চ মাসে এই কারণে নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল কোটা ব্যবস্থার সূচনা করে।


