পুলিশের প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। দূর করতে হবে দীর্ঘদিনের আবাসন ও যানবাহন সংকট। গঠন করতে হবে স্বতন্ত্র পুলিশ ডিভিশন। বাড়াতে হবে ঝুঁকিভাতার পরিধি। এরকম ১৮টি দাবি তুলে ধরা হবে এবারের পুলিশ সপ্তাহে। ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে দাবির খসড়া। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না- এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এবার পুলিশ সপ্তাহে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরে প্রতিকারের দাবি জানানোর প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।
আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের ক্যাডার কর্মকর্তাদের নির্ধারিত বৈঠকে এটিসহ মোট ১৮ দফা দাবি তুলে ধরা হবে। পুলিশের প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবিটি হচ্ছে অন্যতম। ইতিমধ্যে দাবির খসড়া তৈরি করেছেন পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। এখন চলছে খসড়ার ওপর চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পুলিশ বাহিনীর অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে- আসামি গ্রেফতারের পর ছেড়ে দেয়া বা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে কাউকে গ্রেফতারের জন্য রাজনৈতিকভাবে চাপ না দেয়া, পুলিশ বিভাগে সচিব পদমর্যাদায় আরও ৩টি গ্রেড-১ পদ সৃষ্টি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশের জন্য স্বতন্ত্র একটি পুলিশ ডিভিশন গঠন, ইন্সপেক্টর থেকে তার উপরের পদের কর্মকর্তাদের ঝুঁকিভাতা প্রদান, কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত ঝুঁকিভাতা দেয়ার ক্ষেত্রে নতুন বেতন স্কেলে ঘোষিত বৈষম্য দূর করা, পুলিশের আবাসন সংকট দূর করা, যানবাহন সংকট নিরসন, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ।
পুলিশ সদর দফতরের একজন কর্মকর্তা রোববার জানান, পুলিশের নানা সমস্যা নিরসনে ১৮টি দাবির একটি খসড়া তৈরি করা হয়েছে। চূড়ান্ত করার আগে দাবির সংখ্যা কম-বেশি হতে পারে।
জানা গেছে, পুলিশে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন এসব প্রশাসনিক কাজে ব্যাপক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক নেতারা নানাভাবে প্রভাব খাটান। এতে অনেক দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তাও বিশেষ কোনো রাজনৈতিক নেতার আস্থাভাজন না হওয়ায় বা তাদের কথামতো কাজ না করার কারণে হয়রানির শিকার হন। এ নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ। কিন্তু তারা সেটি প্রকাশ করতে পারেন না। বিশেষ করে কনস্টেবল নিয়োগের সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা তাদের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে চাপ দেন। সে অনুযায়ী নিয়োগ না হলে অনেকেই পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। অনেক কর্মকর্তাকে হয়রানিমূলক বদলিও করা হয়। যার ফলে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কাজে অনাবশ্যক জটিলতা দেখা দেয়। এ অবস্থা নিরসনে প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক নেতাদের হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দাবি জোরাল হয়ে উঠেছে।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি জেলার পুলিশ সুপার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাদকদ্রব্য কিংবা নাশকতার মামলার আসামি গ্রেফতারের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ছাড়িয়ে নিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রায়ই তদবির করেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে নিরপরাধ লোককে গ্রেফতারের জন্য ক্ষমতাসীন দলের নেতারা পুলিশের ওপর চাপপ্রয়োগ করেন। এসব তদবির না শুনলে পুলিশকে রোষানলে পড়তে হয়। পুলিশ সদর দফতরসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করা হয়। এর ফলে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা হয়রানির শিকার হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে পুলিশ বিভাগে সচিব পদমর্যাদার গ্রেড-১ পদ আছে ২টি। এবার পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে আরও ৩টি গ্রেড-১ পদ সৃষ্টির দাবি জানানো হবে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, পুুলিশের সার্বিক কাজের গতি বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা ‘পুলিশ ডিভিশন’ করতে গত কয়েক বছর থেকেই দাবি জানিয়ে আসছে পুলিশ। এটি বাস্তবায়িত হলে আগামীতে নিজেদের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ নিজেরাই করতে পারবে পুলিশ। এর ফলে বদলি, পদোন্নতি, বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা, আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত কার্যাবলী দ্রুত সম্পন্ন হবে। এবারের পুলিশ সপ্তাহের অনুষ্ঠানে এ দাবি জোরালভাবে উত্থাপন করা হবে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের আলাদা ডিভিশন আছে। এতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাজের গতি বেড়েছে। কিন্তু আলাদা ডিভিশন না থাকায় দাফতরিক নানা জটিলতায় পড়ে পুলিশের বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ক্ষেপণ হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পুলিশ (প্রথম শ্রেণী) সদস্যরা ঝুঁকিভাতা পান না। তারা ঝুঁকিভাতা প্রবর্তণের জন্য দাবি তুলে ধরবেন এবার। এ প্রসঙ্গে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অপরাধ দমনের এবং আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুলিশকে জঙ্গিবাদ দমনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজও করতে হয়।
টহল-তল্লাশির পাশাপাশি জঙ্গি-সন্ত্রাসী দমনে ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। কিন্তু ইন্সপেক্টর বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা ঝুঁকিভাতা পান না। এমনকি সরাসরি অভিযানে সম্পৃক্ত বা বোমা-বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণে জড়িত কর্মকর্তারাও ঝুঁকিভাতা থেকে বঞ্চিত। তাই এবারের পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে জোরালভাবে এ বিষয়টি তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি নতুন বেতন স্কেলে কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত কর্মরত পুলিশ সদস্যদের ঝুঁকিভাতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। সেটা নিরসনেরও দাবি জানানো হবে।
পুলিশ সূত্র জানায়, যানবাহন সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের পুলিশের টহল কার্যক্রম, আসামি গ্রেফতারসহ নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটে। পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের জন্য ডাবল কেবিন পিকআপ এবং দ্রুতগতির মোটরসাইকেল চাওয়া হবে। এছাড়া জঙ্গি ও সন্ত্রাসী মোকাবেলায় আরও আধুনিক অস্ত্র ও নিরাপত্তাসামগ্রী চাওয়া হবে পুলিশ সদস্যদের পক্ষ থেকে।
এদিকে পুলিশের ১৮ দফা দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা জেলার এসপি হাবিবুর রহমান রোববার রাতে বলেন, ঝুঁকিভাতা ও স্বতন্ত্র পুলিশ ডিভিশন গঠনসহ আমাদের বেশকিছু দাবি-দাওয়া আছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়; আমরা চাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে আলাদা পুলিশ ডিভিশন। ইতিমধ্যে অ্যাসোসিয়েশনের বৈঠকে আমরা এসব দাবি নিয়ে আলোচনা করেছি। সবার সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। পুলিশের প্রশাসনিক কাজে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবি প্রসঙ্গে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।


