দুদকের গণশুনানিতে অংশ নিয়ে সাবেক দুদক কর্মকর্তা, অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রশিদ খান বলেন, ১৯৯৮ সালে তিনি উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পে একটি প্লট বরাদ্দ পান। ধার্যকৃত টাকা পরিশোধের এক যুগ পরও তিনি প্লট বুঝে পাচ্ছেন না। রাজউক কর্মকর্তাদের কাছে অসংখ্যবার ধরনা দিয়ে তিনি এখন হতাশ। ২০০৪ সালে কর্তব্যরত কয়েকজন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে সাবেক এই আমলা বলেন, ওই কর্মকর্তারা তার কাছে ঘুষ দাবি করেছিলেন। তিনি তাদের দাবি পূরণ করতে পারেননি বলেই এই অবস্থা। তিনি বলেন, বিভিন্ন দফতরে প্লটের জন্য তদবির করতে গেলে এখনকার এক কর্মকর্তা জানান, ৬০ হাজার টাকার নিচে রাজউকের ওই ফাইল নড়বে না।
সঞ্চালকের মাধ্যমে তিনি রাজউকের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান তার প্লট পেতে আর কত যুগ সময় লাগবে। অভিযোগের জবাবে রাজউকের সদস্য (এস্টেট) মো. আবদুল হাই জানান, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে তার প্লট বুঝিয়ে দিতে বেশি সময় লেগেছে। তবে তাকে প্লটের দখল বুঝে পেতে আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে না। আগামী ৬ মাসের মধ্যে তাকে প্লট বুঝিয়ে দিতে পারবে রাজউক।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিরুদ্ধে গ্রাহকদের এ ধরনের অভিযোগের শেষ নেই। বুধবার দুদকের গণশুনানিতে অংশ নিয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা প্রকাশ্যেই রাজউক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ-দুর্নীতির অবিশ্বাস্য সব অভিযোগ তুলে ধরেন। একজনের প্লট অন্যজনের নামে বরাদ্দ, ভিন্ন মালিককে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র প্রদান ও নকশা অনুমোদন, প্লটের নম্বর পরিবর্তন, টাকা ছাড়া ফাইল অনুমোদন না করা এবং ফাইল গায়েবসহ এমন কিছু নেই যা ঘটে না রাজউকে। অসংখ্য অভিযোগ তাদের। বুধবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে ৩৬ জন অংশ নেন।
তাদের অভিযোগ, রাজউকের অবহেলায় বেসমেন্টের পার্কিংয়ের জায়গা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতেই আবাসিক প্লটের বাণিজ্যিক ব্যবহার, পরিত্যক্ত প্লটের একাধিক মালিকানা, প্লটের দখলে দীর্ঘসূত্রতা, নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না করার মতো ঘটনাও অবাধে ঘটছে। গণশুনানিতে অংশ নিয়ে বাড্ডার বাসিন্দা মো. শহীদুল্লাহ অভিযোগ করেন, ক্ষতিগ্রস্ত মালিক হিসাবে আমার শ্বশুর ১৯৮৭ সালে একটি প্লট পান। এ প্লটের তদবির করতে করতে আমার শ্বশুর মারা গেছেন, শাশুড়িও মারা গেছেন। মাঝে কেটে গেছে ২৮ বছর। প্লটটি আজ পর্যন্ত বুঝে পাইনি আমরা। তিনি জানতে চান আর কত বছর লাগবে এই প্লট বুঝে পেতে?
দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামানের সভাপতিত্বে গণশুনানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, দুদকের কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ, দুদক সচিব আবু মো. মোস্তফা কামাল, রাজউক চেয়ারম্যান জিএম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়া, দুদকের মহাপরিচালক জিয়াউদ্দীন আহমেদ ও ড. মো. শামসুল আরেফিন, ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক মো. নাসিম আনোয়ারসহ কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। গণশুনানি সঞ্চালনা করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আখতার হোসেন।
তাদের অভিযোগ রাজউকের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নকশা পরিবর্তন, কর্তব্যে অবহেলা, দুর্ব্যবহার, ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে ক্ষতিপূরণ ও প্লট না পাওয়া, ক্ষতিগ্রস্তের প্লট অন্যজনকে প্রদান, সিরিয়াল ওভারটেক করে প্লটের দখল বুঝে দেয়া, এক কোটায় আবেদন অন্য কোটায় প্লট বরাদ্দ, গ্রাহকের তথ্যের চেয়েও হলফনামায় বেশি আয়কর দেখানো, নিয়মবহির্ভূত স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাপনা গ্রহণ না করা, মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অমান্য, ড্যাপে আবাসিক এলাকাকে সড়ক দেখানোরও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
প্রবাসী গ্রাহক ডা. রেজাউল ইসলাম জানান, উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ৪১ নম্বর প্লটটি তিনি রাজউক থেকে বরাদ্দ পান। টাকা পরিশোধের পর প্লট তার দখলে ছিল। প্রবাসী হওয়ার কারণে তার প্লটের দেখাশোনা করত একজন কেয়ারটেকার। পার্শ্ববর্তী ১১ নম্বর সেক্টরের ৪৩ নম্বর প্লটের গ্রাহক তার ওই প্লটের ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নকশা অনুমোদন নিয়ে তার ৪১ নম্বর প্লটে বহুতল ভবনের স্ট্রাকচার গড়ে তুলেছেন। রাজউকের কাছে অভিযোগ করলেও কোনো সমাধান তিনি পাচ্ছেন না।
জবাবে রাজউকের পক্ষে সদস্য (এস্টেট) মো. আবদুল হাই ও অতিরিক্ত পরিচালক (ভূমি) বাবুল মিয়া জানান, ঘটনাটি তাদের জানা। মসজিদ করতে গিয়ে ওই সেক্টরের ১ নম্বর প্লট মসজিদের সীমানায় চলে গেছে। ফলে সেখানে একটি প্লট কম হয়ে যাওয়ায় এই অব্যবস্থাপনার সৃষ্টি হয়েছে। তারা দুই মাসের মধ্যে গ্রাহকের সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্র“তি দেন। সঞ্চালকের পক্ষ থেকে বলা হয়, সম্ভব হলে তার প্লট ফিরিয়ে দেয়া হোক, নইলে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পে তাকে অন্য একটি প্লট দেয়ার ব্যবস্থা করা হোক। এ সময় এই প্রবাসী গ্রাহক রাজউকের নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন।
ঝিলমিল প্রকল্পে প্লট গ্রহীতা শাহজালাল জানান, রাজউকে তার প্লটের নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন থেকে তাকে প্লট বুঝিয়ে দেয়ার নামে ঘোরানো হচ্ছে। গণশুনানিতে রাজউকের সম্পত্তি বিভাগ থেকে দুই মাসের মধ্যে গ্রাহকের সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের কথা জানানো হয়।
উত্তরার গ্রাহক মো. আবুল হোসেন জানান, উত্তরা সেক্টর ১০-তৃতীয় প্রকল্পে তার স্ত্রী নুরজাহান বেগমের নামে একটি প্লট বরাদ্দ পান। রহস্যজনক কারণে তাদের প্লট রাজউক বাতিল করে দেয়। এরপর রাজউকের পিছে ঘুরে ঘুরে তারা হয়রান। এ ব্যাপারে তিনি দুদকের সহায়তা কামনা করেন। জবাবে রাজউকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী এক মাসের মধ্যে তাকে প্লট বুঝিয়ে দেয়া হবে।
একেএম ফিরোজ ২০১১ সালে স্বায়ত্তশাসিত কোটায় প্লট বরাদ্দের আবেদন জানান। কিন্তু তিনি প্লট বরাদ্দ পান ভিন্ন কোটায়। এখন তাদের প্লট বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে না। জবাবে রাজউকের সম্পত্তি বিভাগ জানায়, ভুল রাজউক করেছে। এর সমাধান রাজউককেই করতে হবে। এমন ২২ জন প্লট গ্রহীতা রয়েছে। রাজউক আগামী ৩ মাসের মধ্যে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করবে বলে জানায়।
আবদুল হক ভূইয়া বলেন, যাত্রাবাড়ীর কোনাপাড়া এলাকায় দেড় কাঠা জমির উপর একজন অনুমোদন ছাড়া ৭ তলা ভবন নির্মাণ করেছে। এ ব্যাপারে রাজউকের কাছে অভিযোগ জানালেও রাজউক তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। আশপাশের বাসিন্দারা অনুমোদনহীন দুর্বল কাঠামোর ভবন ধসে প্রাণহানির আশংকা করছেন। জবাবে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) আসমাউল হোসেন জানান, এ ব্যাপারে ভবন মালিক উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেছে। মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার আগে তাদের কিছু করার নেই।
বাড্ডার বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মো. আমানুল্লাহ জানান, রাজউকের বাড্ডা প্রকল্পে তার নামে একটি প্লট বরাদ্দ থাকলেও তিনি আজ পর্যন্ত দখল বুঝে পাচ্ছেন না। এ ব্যাপারে তিন মন্ত্রী সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি রাজউক। জবাবে রাজউক জানায়, ঢাকার ডিসি অফিস থেকে জায়গা বুঝে না পাওয়ার কারণে এই জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রচেষ্টা চলছে দ্রুত বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা তাওহীদা ফারুকী জানান, আবাসিক এলাকার সুউচ্চ দালানকোঠাকে ড্যাপে সড়ক দেখানো হয়েছে। এ কারণে তার প্লটের ভবন নির্মাণের অনুমোদন পাচ্ছেন না তিনি। জবাবে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম জানান, ড্যাপের নকশা সংশোধনযোগ্য। এ ব্যাপারে একটি আবেদন করার পরামর্শ দেয়া হয় গ্রাহককে।
গণশুনানির আগে বক্তৃতা পর্বে প্রধান অতিথির ভাষণে গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেন, রাজউকে মানুষ হয়রানি হয় না, তা বলব না। তবে আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর হয়রানি, প্রতারণা, দুর্নীতি, নিয়মবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের ব্যাপারে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। রাজউকের বর্তমান অবস্থা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক ভালো।
মন্ত্রী আরও বলেন, বেজমেন্টের কার পার্কিংয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম, আবাসিক এলাকার বাণিজ্যিক ব্যবহার, নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ না করার দায় রাজউক এড়াতে পারে না। এছাড়া তিনি ফুটপাত-সড়ক দখলের কারণে যানজট হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া প্লটগুলো দুর্নীতিবাজদের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন করার কথা জানান। বক্তৃতায় মন্ত্রী রাজউকের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্রও তুলে ধরেন। সভাপতির বক্তৃতায় দুদক চেয়ারম্যান মো. বদিউজ্জামান বলেন, রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। বেশি দুর্নীতি হচ্ছে প্লট বুঝিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে। অনেক জ্বলন্ত উদাহরণও রয়েছে আমাদের কাছে। এ সময় তিনি তার এক প্লট গ্রহীতার হয়রানির কথা বর্ণনা করেন।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরাও কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়াতে বাধ্য করেন। এক হাতে কখনও তালি বাজে না। গ্রাহকরাও উৎকোচের মাধ্যমে বিভিন্ন অন্যায় সুবিধা আদায় করে নেন। এসময় তিনি বলেন, রাজউক সিস্টেম মেনে কাজ করলে দুদকের গণশুনানি করার প্রয়োজন হতো না।
দুদক কমিশনার ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, পরিকল্পিত নগর উন্নয়নে রাজউকের ইতিবাচক কার্যক্রম আমরা স্বীকার করি। তবে এর মধ্যে কিছু ভুল-ত্রুটিও রয়েছে। আমরা ভুল-ত্র“টি শুধরে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। এ সময় তিনি দুদকের গণশুনানির ইতিবাচক কার্যক্রম তুলে ধরেন।
দুদক কমিশনার মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রীর বক্তব্য আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো হয়েছে। দুর্নীতি কোথায় ঘটে এবং কীভাবে ঘটে তা মানুষ জানে। এ সময় তিনি রাজউক, ডিসিসি, ভূমি অফিসের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন. দুদকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংস্থায় টিম গঠন করে দেয়া হয়েছিল দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য। সে সময় দুদকের টিমের সদস্যরাও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এ কারণে পরে গণশুনানির আয়োজন করা হয়েছে। এসময় তিনি গণশুনানির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, অপবাদ বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে গণশুনানি নয়। এর মূল উদ্দেশ্য দুর্নীতি প্রতিরোধ করা। রাজউকের কর্মকর্তারা আমাদের কথা শুনবেন, বুঝবেন এবং তা অনুধাবন করে কাজ করবেন এটাই আমরা চাই।
রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জিএম জয়নাল আবেদীন ভূইয়া বলেন, দুদকের গণশুনানি রাজউকের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। এখানে গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা কিছু সমস্যা তাৎক্ষণিকভাবে চিহ্নিত করলাম। এগুলো আমরা দ্রুত সমাধান করব। এ সময় তিনি প্রতি সপ্তাহে রাজউকের সাপ্তাহিক শুনানিতেও গ্রাহকদের সমস্যা জানানোর দাবি জানান।


