বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

দাঁড়ালেই দণ্ড: এ কথা লিখেছে কোন ভণ্ড

Dhaka_In_waএই পথে নিয়মিত যাতায়াত করি। পথ একেক দিন একেক রূপ নিয়ে আমার সামনে আবির্ভূত হয়। আগের দিন যাকে রাস্তার একপাশে বিষণ্ণ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি, পরের দিন তাকে আর দেখি না; আগের দিন যার মায়াভরা চোখ দেখে অভিভূত হই, পরের দিন তার খোঁজ মিলে না। সময়ের স্রোতে ভেসে চলা মানুষের মানচিত্র প্রতিমুহূর্তে পাল্টায়। এর মধ্যে আমি ক্ষণিকের সাক্ষী মাত্র।

এখন আমি সাক্ষী হয়েছি যে ঘটনাপ্রবাহের, সেখানে রাষ্ট্রীয় ব্যাপার-স্যাপার আছে। রাষ্ট্রের দেয়া পোশাক ও অস্ত্রের অধিকারী হয়ে ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্ট বাহাদুর কালো রোদচশমায় দু’চোখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছেন। তার আশপাশে একাধিক কনস্টেবল ব্যস্ত সময় পার করছে। আমি যে বাসের যাত্রী, একজন কনস্টেবলের হাতের ইশারা পেয়ে সেটা রাস্তার একপাশে থেমে আছে। ভেবেছিলাম, অনেক ঝামেলা হবে। সেসব কিছুই হল না। বাসের হেলপার একশ’ টাকার একটা নোট হাতে নিয়ে কনস্টেবল বরাবর দৌড় দিল। কনস্টেবলের শরীরে তার শরীর ঢুস খাওয়ার আগেই ওখান থেকে চিৎকার ভেসে এলো-

: ওস্তাদ, গিয়ার লাগান…

আজ আমি বসেছি দরজার পাশের সিটে। হেলপার ফিরে এসে বাসের হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে পড়তেই জিজ্ঞেস করলাম-

: মামা, গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে?

– একশ’ পার্সেন্ট ঠিক।

: তাইলে ট্রাফিকরে টাকা দিলা কেন?

আমার কথা শুনে বাসের হেলপার মুচকি হাসল। বলল-

: এইটা হইল সকালের নাস্তা। না দিলে মামলা খাওয়াইয়া দিব।

– গাড়ির কাগজপত্র ঠিক থাকলে মামলা দিবে কীভাবে?

: কাগজপত্র ঠিক থাকলেই কী! আসমানে যত তারা, পুলিশের তত ধারা। পুলিশের ধারার অভাব নাই। একটা না একটা কারণ দেখাইয়া মামলা ঢুকাইয়া দিবে।

– কত টাকার মামলা দেয়?

– ঠিক নাই। ৫শ’ টাকার দেয়, ৯শ’ টাকার দেয়, আবার ১৫শ’ টাকারও দেয়। সবকিছু নির্ভর করে মেজাজ-মর্জির ওপর।

মহাকালের গর্ভে ঘটনাপ্রবাহকে সঁপে দিয়ে বাস শ্যামলী থেকে সামনের দিকে অগ্রসর হয়। কখনও থামে। কখনও দৌড়ায়। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় একসময় ‘গেটলক’, ‘সময় নিয়ন্ত্রণ’ ইত্যাদি সার্ভিস চালু ছিল। গেটলক, সময় নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি নামধারী বাস সার্ভিসের মান ও ধরন নিয়ে তখন যাত্রীদের সঙ্গে বাসের স্টাফদের কথা কাটাকাটি, ধরাধরি ছিল নিত্যদিনের চিত্র। একপর্যায়ে এগুলো ঝুলে যাওয়ায় শুরু হল ‘ডাইরেক্ট’ সার্ভিসের যুগ। ‘ডাইরেক্ট সার্ভিস’ যখন ল্যাংড়া হয়ে গেল, সেসময় একদিন দেখলাম- মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য একটা বাসের শরীরে লিখে রাখা হয়েছে, ‘আল্লাহর কসম ডাইরেক্ট সার্ভিস’। এখন রাজধানীতে ডাইরেক্ট বলে কোনো বাস সার্ভিস নেই। সবই লোকাল। লোকাল শব্দটার মধ্যে এক ধরনের লেবড়া-চেবড়া ব্যাপার আছে। স্মার্ট বাস মালিকরা বাসের শরীর থেকে এটা দূর করার জন্য নতুন একটা ফন্দি বের করেছে। এ ফন্দির ফসল হচ্ছে ‘কম স্টপেজ সার্ভিস’। রাজধানীতে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসের গায়ে এখন ‘কম স্টপেজ সার্ভিস’ লেখা স্টিকার শোভা পাচ্ছে। কম মানে কত কম- এর কোনো সীমারেখা না থাকায় একমাত্র ফ্লাইওভার ছাড়া বাদবাকি রাস্তায় বাসগুলো হুঁক্কাসেবী কোনো বৃদ্ধের মুখ থেকে যেভাবে ধোঁয়া নির্গত হয়, সেভাবে চলাচল করে থাকে।

মিরপুর এক নম্বরে এসে বাসটা আবারও ঝামেলায় পড়ল। এবার ড্রাইভার নিজেই কাগজপত্র নিয়ে সার্জেন্টের কাছে ছুটে গেল। মনে হচ্ছে, ছোটখাটো ঝামেলা নয়, অনেক বড় ঝামেলা। ঝামেলা পরিমাপ করতে গিয়ে মনে হল, বিয়েবাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। গেটের ওপাশে কনেপক্ষের ধুড়া-আধুড়া পোলাপান। তারা বরপক্ষের লোকজনের সঙ্গে পয়সাকড়ি নিয়ে দর কষাকষি করছে। এ সময় বাসের সামনে বসা এক যাত্রী চিৎকার করে উঠলেন। তার চিৎকারে মনের মধ্যে তৈরি হওয়া দৃশ্যকল্প বাষ্প হয়ে অজানায় মিলিয়ে গেল।

বাস্তবতার রোদ চোখের পাতা স্পর্শ করতেই পূর্ণদৃষ্টিতে সামনে তাকালাম। যাত্রী ভদ্রলোক রাগে গজগজ করছেন। একপর্যায়ে সার্জেন্টের দিকে আঙুল তুলে বললেন-

: মানুষ চোর ধরে। ডাকাত ধরে। এরা হইল বড় ডাকাত। এই ব্যাটাদের মানুষ ধরে না কেন?

আহা রে! ভদ্রলোকের নিশ্চয়ই তাড়া আছে। ভদ্রলোকের যাতনা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি-পাশ থেকে একজন যাত্রী বলে উঠলেন-

: কেমনে ধরবে? এরা হইল লাইসেন্স পাওয়া ডাকাত।

বাস, ট্রেন ও চায়ের দোকানসহ অন্যান্য গণসমাবেশে একবার কোনো প্রসঙ্গে কথা উঠলে বক্তার অভাব হয় না। এখানেও তাই ঘটল। অল্পবয়সী এক যাত্রী রেগে যাওয়া সেই যাত্রী ভদ্রলোকের উদ্দেশে বলে উঠলেন-

: মুরব্বি, আপনে যান; ব্যাটারে ধইরা লইয়া আসেন।

ভদ্রলোক হাফ গরম ছিলেন। এবার পুরোপুরি গরম হয়ে গেলেন। বললেন-

: আমি একলা যাব কেন? বাসে তো আপনেরাও আছেন। চলেন, সবাই মিইল্যা যাই।

দলবেঁধে গেলে কাজ হবে কি? রাষ্ট্রের দেয়া আইন ও বিধান দ্বারা এই ট্রাফিক সার্জেন্ট সুরক্ষিত। প্রয়োজন মনে করলে তিনি রাস্তায় চলাচলকারী যে কোনো যানবাহনের কাগজপত্র পরীক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন। এর অন্তরালে তিনি কী অকাম করছেন, ‘অন্ধ’ আইন সেটা বিবেচনায় নেবে না। যে বা যারা এ অন্যায়ের প্রতিকার করতে তার সঙ্গে তর্ক কিংবা হাতাহাতিতে জড়াবে, উল্টো তারাই ফেঁসে যাবে। আইনের বর্ম পরিধানকারীরা অনেক সময় বিনা নোটিশে রাস্তার মাঝখানে যানবাহন থেকে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। এখানে যে সে রকম কিছু ঘটছে না- এটাই কম কী! শুকরিয়া।

বাস মিরপুর দশ, অরিজিনাল দশ, এগারো, সাড়ে এগারো ও বারো নম্বর হয়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে কালশী অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। মিরপুর বারো পার হওয়ার পর একটু ফাঁকা জায়গা পাওয়া যায়। পেছনে রেখে আসা এলাকাগুলোর চেয়ে এখানকার বাতাস কি কিছুটা কম বিষাক্ত? আহ! চোখ বন্ধ করে ফুসফুসে বাতাস ভরছি- শোরগোল কানে এলো। তাকিয়ে দেখি, বাস কালশী মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিরপুর এক নম্বরের ঘটনা যাকে গরম করে দিয়েছিল, সেই ভদ্রলোক এবার নতুন একটা বিষয়ে যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। কথাবার্তায় বোঝা যাচ্ছে, ভদ্রলোকের গরমভাব এখনও কাটেনি। তিনি উচ্চৈঃস্বরে বললেন-

: এর চাইতে বড় তামাশা জগতে আর কিছু আছে?

বুঝতে পারছিলাম না- তিনি কী নিয়ে কথা বলছেন। রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা একটা সাইনবোর্ডের দিকে ভদ্রলোক সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। বললেন-

: এই যে লেইখ্যা রাখছে- বাস দাঁড়াইলেই দণ্ড! কই, কারও তো দণ্ড হইতেছে না! বলেন, এই ধরনের ভণ্ডামির কোনো মানে হয়?

এবার বিষয়টা পরিষ্কার হল। এখান দিয়ে যাওয়ার সময় প্রতিবারই রাস্তার মোড়ের এ সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। সেখানে লেখা- এখানে বাস দাঁড়ানো নিষেধ। দাঁড়ালেই দণ্ড। এর নিচে দণ্ডদাতা কর্তৃপক্ষ হিসেবে যাদের নাম লেখা রয়েছে, তারা হলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ। এই রুটে চলাচলকারী প্রত্যেকটা বাস মোড়ে এসে ব্রেক কষে। অন্যদিন করি না, আজ ভদ্রলোকের কথা শুনে আশপাশে দণ্ডদাতাদের কেউ আছে কি-না, তালাশ করলাম। না, কেউ নেই। জলাশয়ের কচ্ছপ বালির মধ্যে ডিম ছেড়ে দিয়ে আবার জলাশয়ে চলে যায়। রেখে যাওয়া ডিম নষ্ট হল, না শিয়ালের পেটে গেল- এ ব্যাপারে মা কচ্ছপের কোনো ভূমিকা থাকে না। এখানকার ব্যাপারও সে রকমই মনে হচ্ছে। বাসের হেলপার রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী সংগ্রহ করছিল। ভদ্রলোক তাকে বললেন-

: এই মিয়া, সাইনবোর্ডটা উল্টাইয়া রাইখ্যা আসো তো।

সাইনবোর্ডটা দেখে আমার মধ্যে আগে কখনও কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে হল, সাইনবোর্ডটা আসলেই উল্টিয়ে রাখা উচিত। এ সাইনবোর্ডের মাধ্যমে মানুষকে প্রতিনিয়ত আইন অমান্য করতে প্ররোচিত করা হচ্ছে। মানুষ যখন দেখে, আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ঘোষণার সঙ্গে কাজের মিল নেই- তখন তারা আইনকে অবজ্ঞা করতে শিখে। ছোট ছোট আইনগুলো অবজ্ঞা করতে করতে তারা বড় আইন অবজ্ঞা করার সাহস দেখায়। এর ফলে রাষ্ট্র একটা বিশৃংখল অবস্থার দিকে ধাবিত হয়। আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারীর বিচারের বিধান দেশে রয়েছে। আইন অবজ্ঞা করতে প্ররোচনা জোগায় যারা, তাদের ক্ষেত্রে বিচারের কোনো বিধান আছে কি? আমি জানি না।

গুলশান দুই নম্বর গোলচক্কর পৌঁছার পর বাস থেকে নেমে পড়লাম। রাস্তা পার হয়ে একজন রিকশাওয়ালার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর বললাম-

: ওই মিয়া, এত ফ্যাটাঙ কিসের তোমার? ডাকতেছি- শুন না!

রিকশাওয়ালা আমার দিকে ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে রইল। তার এ ভাব লক্ষ করে বললাম-

: কী হইল, যাবা না?

– না।

: কেন?

– গদি নাই।

এতক্ষণ খেয়াল করিনি। রিকশাওয়ালার কথায় তাকিয়ে দেখি, সত্যিই রিকশায় সিট নেই। আশ্চর্য হয়ে বললাম-

: গদি গেছে কই?

– নিয়া গেছে।

: কে নিয়া গেছে?

রিকশাওয়ালা হাত তুলে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আনসার বাহিনীর একজন সদস্যকে দেখিয়ে দিল। এই সড়কে রিকশার প্রবেশ নিষেধ। আনসার সদস্য তার দায়িত্ব পালন করেছে ভেবে আমি অন্য রিকশার খোঁজে সামনে পা বাড়াতেই রিকশাওয়ালা অনুনয় করে বলল-

: স্যার, আমি গরিব মানুষ। আপনে একটু বইল্যা দেন, গদিটা যাতে দিয়া দেয়।

– তুমি এই সড়কে ঢুকছ কেন?

: সে-ই তো আমারে ঢুকতে দিছে।

– ঢুকতে দিলে এখন গদি নিয়া গেছে কীজন্য?

রিকশাওয়ালা এ প্রশ্নের উত্তর দিল না। অন্য একটা রিকশায় আরোহণের আগে গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা আইনের রক্ষকের উদ্দেশে বললাম-

: ভাই, রিকশাওয়ালা গরিব মানুষ। ওর গদিটা দিয়া দেন।

– গদি তো আমার কাছে না।

: কার কাছে?

– বক্সে চইল্যা গেছে।

বক্স বলতে কী বোঝানো হচ্ছে- বুঝতে পারছিলাম না। আমি যে রিকশায় সওয়ার হয়েছি, তার চালক বিষয়টা পরিষ্কার করার পর গদিহারা রিকশাওয়ালার উদ্দেশে বলল-

: গদি একবার পুলিশ বক্সে চইল্যা গেলে ৫০ থেইক্যা ৮০ টাকার মামলা। কান্নাকাটি কইরা লাভ নাই। টাকা লইয়া যাও, গদি দিয়া দিবে।

আমি যাব পুলিশের সাবেক এক আইজির বাসায়। সদ্য সমাপ্ত পুলিশ সপ্তাহ সামনে রেখে তার একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য। সাক্ষাৎকার প্রদানকালে পুলিশ বাহিনীর নানা বিচ্যুতি ও অনিয়মের প্রসঙ্গ উঠলে পুলিশের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি নিশ্চয়ই এ থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে বলবেন। এবারের পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীও পুলিশ বিভাগের বর্তমান অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে একটা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় পুলিশকে জনগণের সেবক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো দাঁড়াতে বলেছেন। এ মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে- সবই অরণ্যে রোদন।

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

আরও পড়ুন