বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

একাত্তরের রাজাকার তাহের ও ননীকে ফাঁসিতে ঝোলানো রায়

taher-noni_EDএকাত্তরে হত্যা, ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধের দায়ে নেত্রকোণার রাজাকার মো. ওবায়দুল হক ওরফে আবু তাহের ও আতাউর রহমান ননীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত। বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করে।

ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদী। রায়ে বলা হয়, আসামি তাহের ও ননীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে চারটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে এই দুই যুদ্ধাপরাধীর দণ্ড কার্যকর করতে বলেছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাহের ছিলেন নেজামী ইসলামী পার্টির স্থানীয় নেতা। চার দশক পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন তিনি।

তাহের ও ননী একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতা করতে গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন। সে সময় নেত্রকোণা জেলা সদর ও বারহাট্টা থানাসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তারা ‘কুখ্যাত রাজাকার’ হিসেবে পরিচিতি পান বলে এ মামলার বিচারে উঠে এসেছে।

এ পর্যন্ত রায় আসা ২২টি মামলার ২৬ আসামির মধ্যে তাহের ও ননীকে নিয়ে মোট ১৮ যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হল।

রায়ের জন্য দুই যুদ্ধাপরাধীকে সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়। সাড়ে ১০টার পর তাদের কাঠগড়ায় তুলে পড়ে শোনানো হয় ২৬৮ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত সার। পরে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সাজা ঘোষণা করেন।

নিয়ম অনুযায়ী এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগ পাবেন তাহের ও ননী।

একজন নেজামী ইসলামী থেকে বিএনপিতে, আরেকজন ফুটবলার
অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওবায়দুল হক তাহের নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলার ভোগাপাড়ার শুনই এলাকার মঞ্জুরুল হকের ছেলে। তার জন্ম ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি।

বিকম ডিগ্রি পাওয়ার পর তাহের নেজামী ইসলামী পার্টির রাজনীতিতে যোগ দেন। এ দেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম শুরু হলে তিনি তার বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় গঠিত রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে নেত্রকোণা সদরের কমান্ডারের দায়িত্ব পান।

আরেক যুদ্ধাপরাধী আতাউর রহমান ননী একই জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কচন্দরা এলাকার মৃত আহছান আলী ওরফে আছান আলী ওরফে হাছেন আলীর ছেলে।

এসএসসির সনদে ননীর জন্ম তারিখ ১৯৫৬ সালের ৭ জুলাই উল্লেখ করা হলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে লেখা হয়েছে ৮ অগাস্ট ১৯৫৮।

পৌর শহরের সাবেক এই ফুটবলারও একাত্তরে তাহেরের নেতৃত্বে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন এবং বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধে অংশ নেন বলে এ মামলার বিচারে উঠে এসেছে।

২০১৪ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে নেত্রকোনা পৌর শহরের তেরী বাজারে ব্যবসা করতেন তাহের। তিনি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন বলে প্রসিকিউশনের তদন্ত দলের তথ্য।

পৌর শহরের মোক্তারপাড়া এলাকার বাসিন্দা ননীও গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ব্যবসা করতেন। একাত্তরে মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি নানা মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নেন বলে এ মামলার অভিযোগপত্রের তথ্য।

মামলা বৃত্তান্ত
নেত্রোকোণার মুক্তিযোদ্ধা আলী রেজা কাঞ্চন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালে ননী ও তাহেরসহ ১২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করলে পরে বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে আসে।

২০১৩ সালের ৬ জুন এ দুই আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত সংস্থা। এক বছর চার মাস ২৮ দিন তদন্তের পরে ২০১৪ সালের ৫ নভেম্বর দেওয়া হয় ৬৩ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন।

প্রসিকিউশনের আবেদনে আদালত পরোয়ানা জারি করলে ওইবছর ১২ অগাস্ট দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে নেত্রকোণার পুলিশ। পরদিন তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পাঠানো হয় কারাগারে।

প্রসিকিউশন এ মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল।

এরপর গতবছর ২ মার্চ যুদ্ধাপরাধের ছয় ঘটনায় অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে তাহের ও ননীর যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়।

২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ। প্রসিকিউশনের পক্ষে মোট ২৩ জন জবানবন্দি উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ একজন সাফাই সাক্ষীর নাম দিলেও তাকে তারা হাজির করতে পারেনি।

৪ জানুয়ারি থেকে চার দিন দুই পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের পর্যায়ে আসে। প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলায় শুনানি করেন প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল ও সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নী। আসামিপক্ষে ছিলেন আব্দুস সোবাহান তরফদার ও গাজি এম এইচ তামিম।

দ্বাবিংশ রায়
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরু হয়। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক রুকন আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে। পলাতক থাকায় তিনি আপিলের সুযোগ পাননি।

৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় রায়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়, যা প্রত্যাখ্যান করে রাজধানীর শাহবাগে অবস্থান নেয় হাজার হাজার মানুষ।

যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সেই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে জনতার দাবির মুখে সরকার ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন আনে। এর মধ্যে দিয়ে রায়ের বিরুদ্ধে দুই পক্ষেরই আপিলের সমান সুযোগ তৈরি হয়। ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ এ মামলার চূড়ান্ত রায়ে কাদের মোল্লাকে প্রাণদণ্ড দেয়, যা কার্যকর করা হয় ১২ ডিসেম্বর।

ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সাঈদী আপিল করলে গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ‘দেইল্যা রাজাকার’ নামে খ্যাত এই জামায়াত নেতার সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেয় সর্বোচ্চ আদালত।

২০১৩ সালের ৯ মে ট্রাইব্যুনালের চতুর্থ রায়ে জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকেও মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।  গতবছর ৩ নভেম্বর আপিলের রায়েও তার সর্বোচ্চ সাজা বহাল থাকে। তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয় ১১ এপ্রিল।

মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা ও উসকানির দায়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন জামায়াত আমীর গোলাম আযমকে ২০১৩ সালের ১৫ জুন ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এটি ছিল ট্রাইব্যুনালের পঞ্চম রায়। তার আপিলের শুনানি চলার মধ্যেই গতবছর ২৩ অক্টোবর রাতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৯২ বছর বয়সী জামায়াতগুরু।

২০১৩ সালের ১৭ জুলাই ষষ্ঠ রায়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ বছর ১৬ জুন আপিলের রায়েও সেই সাজা বহাল থাকে।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর সপ্তম রায়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রামের সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় আসে। তার সাজাও ২৯ জুলাই দেওয়া আপিল বিভাগের রায়ে বহাল রাখা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে বিএনপির সাবেক মন্ত্রী আবদুল আলীমের আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় হয় ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর। যুদ্ধাপরাধের দণ্ড ভোগের মধ্যে ৮৩ বছর বয়সে গতবছর ৩০ অগাস্ট মারা যান আলীম। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ১১ মাস কারাবন্দি অবস্থায় হাসপাতালের প্রিজন সেলে ছিলেন তিনি।

বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে একাত্তরের দুই বদর নেতা আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মুঈনুদ্দীনকে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। তারা দুজনেই পলাতক।

দশম রায় আসে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর। জামায়াত আমির একাত্তরের বদর প্রধান মতিউর রহমান নিজামীকেও দেওয়া হয় সর্বোচ্চ সাজা, যিনি বাঙালি জাতিকে সমূলে ধ্বংস করতে ‘স্বেচ্ছায় ও সচেতনভাবে’ ইসলামের অপব্যবহার করেন বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়। তিনিও এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন।

একাদশ রায়ে গতবছর ২ নভেম্বর চট্টগ্রামের আলবদর কমান্ডার মীর কাসেম আলীকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়। জামায়াতে ইসলামীর এই শুরা সদস্যকে দলটির প্রধান অর্থ যোগানদাতা বলা হয়ে থাকে।

এরপর ১৩ নভেম্বর ফরিদপুরের রাজাকার কমান্ডার পলাতক জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের ফাঁসির আদেশ আসে। ২৪ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা মোবারক হোসেনকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দেয়।

এরশাদ আমলের প্রতিমন্ত্রী ও একাত্তরে হবিগঞ্জের মুসলিম লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের সর্বোচ্চ সাজার আদেশ হয় গতবছর ২৩ ডিসেম্বর। এরপর ৩০ ডিসেম্বর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের ফাঁসির রায় আসে।

চলতি বছরের প্রথম রায়ে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির আব্দুস সুবহানকেও একই সাজা দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের সপ্তদশ রায়ে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পার্টির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান পলাতক আবদুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আদালত।

গত ২০ মে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাহিদুর রহমান ও আফসার হোসেন চুটুকেও আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৯ জুন কিশোরগঞ্জের রাজাকার পলাতক সৈয়দ মো. হাসান আলীকে ফাঁসি অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।

এরপর গতবছর ১৬ জুলাই পটুয়াখালীর রাজাকার সহযোগী ফোরকান মল্লিককে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে। সর্বশেষ ১১ অগাস্ট বাগেরহাটের রাজাকার নেতা শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টারকে মৃত্যুদণ্ড এবং খান আকরাম হোসেনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আদালত।

আরও পড়ুন