বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

চাকরি ও ফিনিক্স পাখি: হাল ছেড়ো না বন্ধু…

Ikbal_আশরাফুল আলম ইকবাল।

বিভিন্ন শিকারী প্রজাতির মধ্যে বাজপাখি সবচাইতে বেশিদিন বাঁচে। এরা প্রায় ৭০ বছর জীবিত থাকে। কিন্তু এই ৭০ বছর শিকারী হয়ে বাঁচতে গেলে এদের খুব কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ৪০ বছর পরে। এই সময়ে বাজপাখির শরীরের সবচাইতে কার্যকর তিনটা অঙ্গ দুর্বল হয়ে পড়ে-
ক) পায়ের থাবাগুলো লম্বা ও নরম হয়ে যাবার ফলে শিকার ধরা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

খ) এর লম্বা এবং তীক্ষ্ণ ঠোঁট সামনের দিকে বাঁকা হয়ে যায় ফলে ঠোঁট দিয়ে শিকারকে ঠোকর দেয়া কঠিন হয়।

গ) বয়সের সাথে সাথে পালকগুলো মোটা ও ভারী হওয়ায় তার দীর্ঘ ডানা বুকের সাথে লেগে আসায় উড়াউড়ি খুবই কষ্টকর হয়ে দাড়ায়।এমতাবস্থায়, শিকার করা ও আহাড় গ্রহণ খুব কঠিন হয়ে যায়।

তখন বাজপাখির সামনে দুইটা পথ খোলা থাকে ১) মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষা ২) নিজেকে পুনর্গঠনের কষ্টসাধ্য সংগ্রাম বেছে নেয়া যা অনেকটা পুনর্জন্মের মতই।

এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সে দুর পাহাড়ে অবস্থান নেয়। সেখানেই বাসা বাঁধে। শুরু করে পুনর্জন্মের সাধনা। প্রথমেই সে তার ঠোঁট দিয়ে পাথরে আঘাত করতে থাকে এবং এরকম চলতে থাকে ঠোঁট গুলো উপড়ে যাওয়া পর্যন্ত। পাথরে আঘাত করে ঠোঁট উপড়ে ফেলার মত যন্ত্রণার আর কিছু নেই। এ পর্যায়ে সে অপেক্ষা করে নতুন ঠোঁট গজানোর। নতুন ঠোঁট গজালে সে তার ঠোঁট দিয়ে পায়ের থাবার দুর্বল নখগুলো উপড়ে ফেলে। অতঃপর উপড়ে ফেলে তার পুরনো ভারী পালকগুলো। অপেক্ষা করতে থাকে নতুন দিনের। ১৫০ দিনের যন্ত্রণা ও প্রতীক্ষার পর সে নতুন করে ফিরে পায় তার সেই তীক্ষ্ণ ঠোঁট, শিকারী থাবা এবং ক্ষীপ্র উড্ডয়ন। এরপর সে আরো ৩০ বছর বেঁচে থাকে শক্তি ও গরিমা নিয়ে।

২.
ফিনিক্স পাখি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে একটি পৌরাণিক প্রতীক হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। গ্রিক পুরাণে ফিনিক্স পাখিকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন পাখি হিসাবে যা হাজার বছর ধরে বাঁচে এবং একটা পর্যায়ে আবার পুনর্জন্ম লাভ করে। চৈনিক সভ্যতায় এই পাখিকে হুয়াং ফেং বলা হয় এবং বিবেচনা করা হয় পূর্ণতা কিংবা অবিনশ্বরতার প্রতীক হিসাবে। সেই একই পাখি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিকট অবতার বিষ্ণুর বাহন হিসেবে পরিচিত। তবে ফিনিক্স পাখিকে রূপকার্থে ব্যবহার করা হয়হয়উত্থানের প্রতীক হিসেবে; ধ্বংসস্তুপের মাঝে থেকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রতীক হিসেবে।

ফিনিক্স পাখি প্রায় হাজার বছর বাঁচে। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এদের প্রয়োজন হয় পুনর্জন্মের সাধনা। এ সময়ে এরা দারুচিনি গাছের ডাল দিয়ে বাসা বাঁধে। এরপরসেই বাসার ভিতরে অবস্থান করে বাসাটা আগুনে প্রজ্বলিত করে। অবর্ণনীয় কষ্টের এই অগ্নিদহন প্রক্রিয়া চলতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত বাসা এবং ফিনিক্স উভয়ই ছাইভস্মে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর, সেই ছাইভস্ম থেকেই জন্ম হয় নতুন ফিনিক্স পাখির; নতুনভাবে শুরু হয় হাজার বছরের পথচলা।

৩.
জীবনে সার্থকতার সাথে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের জীবনেও এরকম মূহুর্ত আসে যখন প্রয়োজন হয় সংগ্রামের; হতাশায় ভেঙ্গে না পরে ঘুরে দাঁড়ানোর। কিছুদিন আগে ক্যাম্পাসে এক ছোট ভাইয়ের সাথে দেখা। কথায় কথায় জানালো তার হতাশার কথা। সে ডিপার্টমেন্টে দ্বিতীয় হয়েও শিক্ষক হতে পারেনি; শিক্ষক হতে পারেনি তার সাথেই প্রথম স্থান অধিকারী ছেলেটাও। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণত যারা প্রথম/দ্বিতীয় হয় তারা শিক্ষকতার জন্যই অন্য পেশার চাকুরির জন্য চেষ্টা করেন না। তাদের ক্ষেত্রে এরকম ঘটনা খুব বড় একটা দুর্ঘটনাই; কারন এই প্রথম হবার যুদ্ধে অবতীর্ণ থাকায় অন্য চাকুরির প্রস্তুতি নেয়া হয় না।

৩৬তম বিসিএস প্রিলিমিনারির রেজাল্ট দিয়েছে। ২ লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর মাঝ থেকে মাত্র ১৩,৮০০ পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি তাদের হতাশ হয়ে বসে থাকার প্রয়োজন নেই। নিজেকে নতুনভাবে প্রস্তুত করার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হবে। হয়ত বিসিএস-এর চাইতেও বড় কিছু অপেক্ষা করছে অথবা এর পরবর্তী বিসিএস-এ আপনার জন্য একেবারে প্রথম দিকের কোন ক্যাডার অপেক্ষা করছে। এই পৃথিবীতে যে সুযোগ হারালাম সেটাই একমাত্র সুযোগ নয়। হয়ত আমাদের পাশেই এর চাইতে বড় কোন সুযোগ অপেক্ষা করছে। প্রয়োজন হলো হাল ছেড়ে না দিয়ে পুনরায় চেষ্টা করা; ধ্বংসস্তূপের মাঝ থেকেও ফিনিক্স পাখির মত নতুন করে জেগে ওঠার সাহস রাখা।  কবির সুমনের গানের মতই বলি, “হাল ছেড়ো না বন্ধু, বরংকণ্ঠ ছাড়ো জোড়ে; তোমায় আমায় দেখা হবে অন্য গানের ভোরে”।

আশরাফুল আলম ইকবাল: প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে কর্মরত।

আরও পড়ুন