হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের অভিযোগে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের পদত্যাগ দাবি করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। ‘হিন্দু সম্পত্তি দখল প্রতিবাদ করায় পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথের নামে মন্ত্রীর পাঠানো উকিল নোটিশ প্রত্যাহারের’ দাবিতে আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে সংগঠনের নেতারা এ কথা বলেন।
মানববন্ধনে বলা হয়, ৭ দিনের নোটিশ প্রত্যাহার না হলে আবার আন্দোলন শুরু হবে ।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর উপজেলার চণ্ডীপুর ইউনিয়নের ৫৫টি ভূমিহীন হিন্দু (ক্ষত্রিয়) পরিবারের ভোগদখল জমি দখলের অপচেষ্টা করছেন মন্ত্রী ও তাঁর খালাতো ভাই এমদাদ। এর প্রতিবাদ করায় কাজল দেবনাথকে অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে। তাঁরা বলেন, সংখ্যালঘু জনগণ কোনো ভাবেই এটা মেনে নেবে না ।
মানববন্ধনে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত বলেন, ‘আমরা এটাকে উকিল নোটিশ মনে করি না। এটা হচ্ছে হয়রানিমূলক। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে কিন্তু এগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকে বাধা দিচ্ছে।’ তিনি বলেন, যদি এই নোটিশ প্রত্যাহার করা না হয়, তাহলে সারা বাংলাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে।
প্রত্যক্ষদর্শী পদ্মাবতী দেবী বলেন, সম্পত্তি দখলের সেই চেষ্টা ছিল বিভীষিকাময়। হিন্দুদের বাড়ি-ঘর, গরু-ছাগল পুড়িয়ে দিয়েছে, মহিলাদের সঙ্গে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেছে। এখনো অনেকে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন, তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা দরকার।
এদিকে এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে সংখ্যালঘুদের জমি দখলের অভিযোগ আনা হয়েছে। এ অভিযোগের বিন্দু পরিমাণ সত্যতা নেই। যদি কেউ আমার এলাকায় গিয়ে এক তিল জমি দখলের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেন তাহলে আমার গলা আমি কেটে ফেলবো। বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ হয়। এসব নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন মন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, পার্বতীপুরের চণ্ডিপুর ক্ষত্রিয় পরিবারের যে ৪৫ বিঘা জমি দখলের কথা বলা হচ্ছে সেই জমি ক্ষত্রিয় পরিবারের নয়। সে জমি ১১ বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এমদাদ চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি পেয়েছেন। কিন্তু গত ১১ বছরেও সেই জমি ওই ব্যক্তি বুঝিয়ে পায়নি। এটা নিয়ে কিন্তু কেউ সংবাদ প্রকাশ করে না। গত ৩৫ বছর ধরে ওই জমি নিয়ে মামলা চলছিল। ১১ বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট এমদাদ নামে এক ব্যক্তির পক্ষে রায় দিয়েছে কিন্তু ওই ব্যক্তি জমি এখনো দখলে নিতে পারেনি। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বিরুদ্ধে কার কী করার আছে। অর্পিত সম্পত্তি সুপ্রিম কোর্ট যদি কাউকে দিয়ে দেয় তাহলে তো কারও কিছু করার নেই। এটা কিন্তু বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতারাও জানেন। কিন্তু অযথা পরিস্থিতি ঘোলাটে করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৮ জানুয়ারি প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি কাজল দেবনাথ বলেন, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে ক্ষত্রিয় পরিবারের ৫৫টি পরিবারের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন হচ্ছে। এর সাথে জড়িত সাংসদ ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান।
এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, কাজল দেবনাথের সাথে আমার কথা হয়েছে, সেকোনো তথ্য দিতে পারেনি। শুধু বলেছে সাংবাদিকরা জানতে চেয়েছে তাই বলে দিয়েছি। মন্ত্রী বলেন, আমি কাজল দেবনাথকে বলেছি সারাদেশের মানুষ তো মনে করছে আমি সংখ্যালঘুদের জমি দখল করেছি। কিন্তু আমি তো করিনি। আপনি এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিবেনে। তিনি আমাকে বললেন, আপনি রিজয়েন্ডার দেন। আমি বললাম, আমি কেন রিজয়েন্ডার দেবো? আপনি দেবেন। মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন আপনি। গণশিক্ষামন্ত্রী বলেন, কাজল দেবনাথ যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় আমি নিরূপায় হয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছি।
উলেখ্য, মন্ত্রী-এমপিরা সংখ্যালঘুদের জমি দখলের সাথে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। গত মাসে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেছিলেন। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রী-এমপিসহ ক্ষমতাবানরা বিভিন্নভাবে দুর্বল সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করছে। সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা চালাচ্ছে। বেশিরভাগ জায়গায় জমি দখলের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে বলেও জানান তিনি। সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম ও তার সমর্থকদের দ্বারা ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখল এবং হামলার বিষয়ে তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে আসক, এলএলআরডি, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদসহ ৮টি সংগঠন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংসদ সদস্য দবিরের জড়িত থাকার সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ফরিদপুরের ঘটনায় মন্ত্রীর জড়িত থাকার কথা উঠেছে।
সেদিন পূজা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার পাল বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার তার খালাতো ভাই এমদাদকে নিয়ে হিন্দুদের জায়গা দখল করছে। প্রধান মন্ত্রীর কাছে আহ্বান এই মন্ত্রীকে অপসারণ করুন।


