বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

ভাড়া বাড়ল, সেবা কই?

dhaka-komolapur-rail-stationস্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকে দফায় দফায় রেলওয়ের যাত্রী ও মালামাল পরিবহনে ভাড়া বাড়ানো হলেও বাড়েনি যাত্রীসেবার মান। ভোক্তা অধিকার সংগঠনের আপত্তির মধ্যেই ট্রেন যাত্রায় বর্ধিত ভাড়া কার্যকর করেছে রেল কর্তৃপক্ষ; তাতে যাত্রী না কমলেও তাদের মুখে শোনা গেছে সেবার মান নিয়ে সেই বহু পুরনো অভিযোগ। আড়াই বছরের ব্যবধানে ২০ ফেব্রুয়ারি শনিবার থেকে সর্বশেষ দফায় বাড়ানো হয়েছে ভাড়া। এ নিয়ে ১৯৭৩ সাল থেকে ১৭ দফায় রেলের ভাড়া বাড়ানো হলো।

২০১২ সালের অক্টোবর মাসে যখন ভাড়া বাড়ানো হয় তখন বলা হয়েছিল, ট্রেনের সব শ্রেণির ফ্যান, লাইট, পরিষ্কার সিট, ঝাঁড় দেয়া কোচের সব সুবিধা যাত্রীরা সমানভাবে ভোগ করবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। যাত্রীরা আগের নোংরা পরিবেশেই ভ্রমণ করছেন। ওইসময় ভাড়া ৫০ শতাংশ বাড়ানো হলেও বাস্তবে বেড়েছে ৮০ শতাংশ।

এই হারে ভাড়া বৃদ্ধিকে ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ বলেছেন যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বলেন, “যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর অঙ্গীকার করে ২০১২ সালেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেবার মানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে রেলে লোকসান হয়, আর এখন যাত্রীদের ওপর তার ভার চাপাচ্ছে।”

মোজাম্মেল হক জানান, সম্প্রতি রেলপথে নিয়মিত ভ্রমণকারী প্রায় তিনশ’ যাত্রীর ওপর একটি জরিপ চালিয়েছেন তারা, যাতে ৮৫ শতাংশ উত্তরদাতা ভাড়া বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক’ বলেছেন। সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রামের পথে চলাচলকারী অন্যতম বিলাশবহুল ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেসের যাত্রীদের মধ্যে ওই জরিপ চালানো হয়। পুরো ট্রেনের বিভিন্ন কোচে ভাঙা আসন, ছারপোকা ও তেলাপোকার উপদ্রুপ দেখা গেছে। পাশাপাশি টিকিটবিহীন যাত্রী ওঠানামাসহ নানা অনিয়ম দেখেছে জরিপকারী দল।”

জরিপ প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, যাত্রীসেবার মান, রেল স্টেশনের সার্বিক পরিবেশ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা- ইত্যাদি বিষয়ে ‘সন্তুষ্ট নন’ বলে জানিয়েছেন ৭২ শতাংশ উত্তরদাতা। অন্যদিকে ২৬ শতাংশ উত্তরদাতা রেলের সেবার মান ‘সন্তোষজনক’ বলেছেন।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়,৭০ শতাংশ উত্তরদাতা নিয়মিত কালোবাজারির কাছ থেকে টিকিট কিনে ভ্রমণ করতে বাধ্য হওয়ার কথা বলেছেন। তিন শতাংশ বলেছেন, তারা ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেলপুলিশ, আমলা, এমপি-মন্ত্রীর তদবিরের মাধ্যমে টিকিট সংগ্রহ করেন।

বুকিং সহকারী, অনুসন্ধান কর্মকর্তা, স্টেশান মাস্টার, স্টেশান ম্যানেজার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে অসন্তুষ্টির কথা বলেছেন জরিপের ৬৫ শতাংশ উত্তরদাতা।

ওই জরিপেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল শনিবার সকালে কমলাপুর স্টেশনে আসা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে।

মো. হাসেম আলী নামের এক যাত্রী জানালেন, একটি আন্তঃনগর ট্রেনের আসন বিহীন টিকিট কেটে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুরে এসেছেন তিনি। বাসে আসতে যানজটে পড়তে হয় বলে এভাবেই তিনি মতিঝিলে এসে অফিস করেন।

“অন্য সময়ে ৩৫ টাকায় চলে আসি। শনিবার ৪৫ টাকা নিলো। কিন্তু সার্ভিস তো আগের মতই। কেনো বাড়তি সুবিধা নিশ্চিত না করে কেবল ভাড়াটাই চাপিয়ে দিল সরকার।”

“একতা এক্সপ্রেসের যাত্রী সিরাজগঞ্জের শরীফ বলেন, “ট্রেন ১১টায় ছাড়ার কথা, কিন্তু দেরি হচ্ছে। এ সমস্যা তো নিয়মিত হয়।”

কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী বলছেন, তাদের আন্তরিকতার কোনো ‘অভাব নেই’। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে তারা ‘সব সময়ই সচেষ্ট’।

বর্ধিত ভাড়া ও সেবার মান নিয়ে যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “যাত্রীদের মধ্যে তো কোনো অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে না। তারা অসন্তুষ্ট- এমন কোনো অভিযোগও তো পাইনি।”

শনিবার থেকে শতকরা ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর করা হয়। রেলওয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন জানান, ‘লোকসানের হাত থেকে রেলওয়েকে বাঁচাতেই এই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ভাড়ার নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে কিলোমিটারে ৩৯ পয়সা। আগে এ হার ছিলো ৩৬ পয়সা।’

এদিকে রেলওয়ে সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি গত ১২ জানুয়ারি রেলওয়ের ভাড়া বাড়ানোর পরামর্শ দেয়। তবে সেক্ষেত্রে অবশ্যই যাত্রীসেবার মান ঠিক রাখতে বলা হয়েছে। যদিও ২০১২ সালের অক্টোবর মাস থেকে সর্বশেষ বাংলাদেশে ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়। তখন কিলোমিটার প্রতি গড় ভাড়া ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩৬ পয়সা। কোথায়ও ভাড়া দ্বিগুণও করা হয়।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী বলেছেন, ‘বর্তমান রেলে যে ভাড়া আছে সেটা খুবই কম, তাই ভাড়া বাড়ানোর জন্য বলেছি। তবে এখানে অনেকগুলো বিষয় আছে, সেগুলো মাথায় রেখে ভাড়া বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়কে।’

রেল সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে ১৯৯২ সালের ১ মার্চ পর্যন্ত রেলওয়ের ভাড়া ১৬ দফা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরপর রেলওয়ে লোকসানের কথা বলে সর্বশেষ ২০১২ সালের ১ অক্টোবর থেকে ভাড়া বাড়ানো হয়। তখন বলা হয়েছিল, ভাড়া বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রেলওয়ে সেবার মানও বাড়ানো হবে।

২০১২ সালে ভাড়া বাড়ানোর পরিপত্রে বলা হয়, রেলের যাত্রী পরিবহন ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়িয়ে ৪০ পয়সা করার সুপারিশ করা হয়। ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাবে বলা হয়, গত আড়াই বছরে রেলের পরিচালনা ও প্রশাসনিক ব্যয় অনেক বেড়েছে। রেলের ভাড়া বৃদ্ধির পর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। এতে ২০১৩ সালে বাস ও লঞ্চের ভাড়া বাড়ানো হয়।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে রেলওয়ের আয় ছিল ৫৮৪ কোটি টাকা, আর ব্যয় ১ হাজার ৩৪২ কোটি টাকা। ফলে সে অর্থবছর রেলের লোকসান হয় ৭৫৮ কোটি টাকা। ২০১০-১১ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে আয় হয় যথাক্রমে ৬১৬ কোটি ও ৬২৯ কোটি টাকা। ওই দুই অর্থবছর সংস্থাটির ব্যয় ছিল- যথাক্রমে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি ও ১ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ লোকসান ছিল যথাক্রমে ৯৫৮ ও ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা।

২০১১ সালে ডিজেলের দাম তিন দফায় ১৫ টাকা বেড়ে যাওয়াকে লোকসানের অন্যতম কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলের ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১২ সালের ১ অক্টোবর যাত্রী ও পণ্য উভয় ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ করে ভাড়া বাড়ানো হয়। তবে বিভিন্ন যাত্রীবাহী ট্রেনের ভাড়ায় ছাড় তুলে দেয়ায় প্রকৃত ভাড়া বাড়ছে প্রায় ৭০-১১০ ভাগ। তবে যাত্রী ও পণ্য কমে যাওয়ায় ভাড়া বৃদ্ধির অনুপাতে রেলের আয় বাড়েনি। পাশাপাশি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে না সংস্থাটি। ভাড়া বাড়ানোর পর ২০১২-১৩ অর্থবছরে রেলের আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮০৪ কোটি টাকা। ওই অর্থবছর ব্যয় ছিল ১ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। ফলে লোকসান কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৮৮১ কোটি টাকায়। আর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেলের আয় হয় ৯৩১ কোটি টাকা, ব্যয় ১ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। ফলে লোকসান দাঁড়ায় ৮০৩ কোটি টাকা। লোকসান খুব বেশি না কমায় আবারো ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

২০১২ সালের পরিপত্র অনুসারে, রেলের কিলোমিটারপ্রতি দ্বিতীয় শ্রেণির লোকাল ট্রেনের বর্তমান ভাড়া ২৭ পয়সা ও মেইল ট্রেনের ৩৬ পয়সা। এছাড়া কমিউটার সার্ভিসের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ৪৫ পয়সা ও সুলভ শ্রেণির ৫৪ পয়সা। আর প্রতি কিলোমিটার শোভন শ্রেণির বর্তমান ভাড়া ৯০ পয়সা, শোভন চেয়ার ১ টাকা ৮ পয়সা, প্রথম শ্রেণির সিট (নন-এসি) ১ টাকা ৪৪ পয়সা, এসি চেয়ার (স্নিগ্ধা) কোচ ১ টাকা ৮০ পয়সা, প্রথম শ্রেণি বার্থ (নন-এসি) ২ টাকা ১৬ পয়সা, এসি সিট ২ টাকা ১৬ পয়সা ও এসি বার্থ ৩ টাকা ২৪ পয়সা।

নতুন প্রস্তাবে দ্বিতীয় ও মেইল ট্রেনে ১০ শতাংশ, কমিউটার ও সুলভ শ্রেণি ১২ শতাংশ এবং শোভন চেয়ার, প্রথম শ্রেণি ও এসি ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়। তবে ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব ভ্রমণ করলে অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে ভাড়ায় কিছুটা ছাড় অব্যাহত থাকবে। এছাড়া এসি চেয়ার, এসি সিট ও এসি বার্থের ওপর ১৫ শতাংশ অতিরিক্ত ভ্যাটও প্রযোজ্য থাকবে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন বলেন, ‘২০১২ সালে ভাড়া বাড়ানোর সময় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তিন বছর পর পর বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। সে সময় ভাড়া বাড়ানোর পর ২০১৩ সালে ডিজেলের দাম ৭ টাকা বাড়ানো হয়। এছাড়া মহার্ঘ ভাতা ঘোষণাসহ বিভিন্ন কারণে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়েছে। আবার নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে ব্যয় আরো বাড়বে। এতে রেলের লোকসান আবারো ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। তাই ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।’

রেলের ভাড়া বৃদ্ধি গণবিরোধী
রেলপথের যাত্রীদের ভাড়া বৃদ্ধি কার্যকর গণবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি  এই অযুক্তিক ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

দীর্ঘ ২০ বছর পর ২০১২ সালে রেল ভাড়ার ভুর্তুকি প্রত্যাহার করে সকল শ্রেণিতে রেল ভাড়া ৫০ ভাগ বৃদ্ধির মাত্র ৩ বছরের মাথায় আবার ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাবের এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে বিগত ভাড়া বৃদ্ধির সময়ে প্রদত্ত যাত্রী সেবার মান বাড়ানোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দাবি জানায় সংগঠনটি।

শনিবার সকালে সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘রেল দেশের সিংহভাগ নিম্ন আয়ের যাত্রী সাধারণের বাহন হিসেবে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে।’

শুধুমাত্র লাভ-ক্ষতির মানদণ্ড বিবেচনা না করে দেশের সাধারণ জনগণের যাতায়াতের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় আনার পাশাপাশি যেসব ট্রেন নাম মাত্র ফিতে ইজারা দেয়া হয়েছে এসব ইজারা বাতিল করে ইজারা ফি বাড়ানো, রেলের ভূমির বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ানো, সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিটি ট্রেনে বগি সংযোজনের ব্যবস্থা করা, রেলের গতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া, গ্রামীণফোনের রেলওয়ে ফিকোয়েন্সি ফি দ্বিগুণ করা, রেল ভূমি ইজারা বা লাইসেন্স ফি দ্বিগুণ করা, রেলের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পসমূহের সুশাসন নিশ্চিত করা, রেল কর্মকর্তাদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ করা ও অপ্রয়োজনীয় যানবাহন ব্যবহার বন্ধ করা গেলে যাত্রী ভাড়া বৃদ্ধি না করেও বাংলাদেশ রেলওয়েকে লাভজনক করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

রেলের ভাড়া বৃদ্ধি, সমস্যা প্রকট হবে
রেলের ভাড়া বাড়ানোর ফলে সমস্যা আরো প্রকট হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এর চেয়ারম্যান মো. আবু নাসের খান। তিনি বলেছেন, ‘যাত্রীরা ট্রেনে যেতে চাইবে না। ফলে রেলে লোকসানের পাল্লা আরো ভারি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রেল ভাড়া না বাড়িয়ে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কোচ সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হলে যাত্রী বাড়বে। বন্ধ রেল স্টেশন চালু করা হলে রেলের আয়ও বৃদ্ধি পাবে। অন্যের দখলে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পদ উদ্ধার করে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা মাফিক প্রকল্প গ্রহণ করলে রেলের আয় বৃদ্ধি পাবে।

আবু নাসের খান বলেন, ‘বর্তমানে এই ভাড়ায় বেসরকারিতে পরিচালিত ট্রেনসমূহ পরিচালনা ব্যয় কমিয়ে মুনাফা অর্জন করতে পারলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে পারছে না। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কর্ণফুলী এক্সপ্রেস ট্রেনের রেলওয়ের ব্যবস্থাপনায় আয় হতো ১,৩৯, ১০,৪০০ টাকা, আর বেসরকারিতে আয় হচ্ছে ১,৯১,১৮,৮০৮ টাকা।

অনুরূপভাবে মহুয়া এক্সপ্রেস ও দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ট্রেনের রেলওয়ের ব্যবস্থাপনায় আয় ছিল যথাক্রমে ৭২ লাখ ও ২ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার টাকা, আর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আয় হচ্ছে ১ কোটি ৮১ লাখ ৪৪ হাজার ও ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৯৫ হাজার ১৭৬ টাকা।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর প্রকল্প কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, ‘ট্রেনপ্রতি আয় শুধু যাত্রীর কাছ থেকে পাওয়া ভাড়ার ওপর নির্ভর করে না। ভাড়া ছাড়াও আরো যেসব বিষয়ে ওপর ট্রেনপ্রতি আয় নির্ভর করে তার মধ্যে রয়েছে ট্রেনপ্রতি কোচের সংখ্যা, বিভিন্ন ধরনের যাত্রীবাহী কোচের কম্বিনেশনে, কোচের যাত্রী ধারণক্ষমতা, কোচের সিটের অকুপেন্সি হার ও ট্রেনের টার্ন অ্যারাউন্ড।’

তিনি বলেন, ‘ট্রেনপ্রতি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ট্রেনের কোচের সংখ্যা বা ট্রেনের দৈর্ঘ্য। যেসব ট্রেনে যাত্রী চাহিদা বেশি সেসব রুটের ট্রেনে কোচ সংখ্যা বাড়ালে আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। কোচের সংখ্যা বাড়লে ট্রেন থেকে আয় বাড়ে, কিন্তু খরচ সমানুপাতে বাড়াতে হয় না।’ রেলওয়ের অনেক খরচ কোচের সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। যেমন- রেললাইন, ইঞ্জিন, গার্ড, চালক, প্লাটফর্মসহ অনেক খরচই কোচের সংখ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তিনি মনে করেন।

ভাড়া না বাড়িয়ে রেলের দুর্নীতি কমান
বছর বছর রেলের ভাড়া বাড়ানো করা হলে রেলে যাত্রী কমবে, আয় কমবে। এভাবে রেলকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়ার প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ।

তিনি মনে করেন, রেলের মাথাভারী প্রশাসন, অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ করে কোচ ও রেলের গতি বাড়িয়ে একক যাত্রীপ্রতি খরচ কমিয়ে রেলখাতে লোকসান কমানোর পাশাপাশি এ খাতকে ধীরে ধীরে লাভজনক করা সম্ভব হবে। এজন্য সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

আনু মোহাম্মদ আরো বলেন, ‘আমরা কথায় কথায় ভারতের উদাহরণ দিলেও ভারত কীভাবে রেলখাতে উন্নয়ন করেছে তা কাজে লাগাতে চাই না। বিশ্ব ব্যাংকের যে ঋণ গ্রহণ করা হচ্ছে তা রেলের উন্নয়নের চেয়ে দুর্নীতি ও লুটপাটে বেশি ব্যবহৃত হবে। এ ঋণের শর্ত হিসেবে বছর বছর ভাড়া বাড়ালে রেলে লুটপাট ও দুর্নীতি আরো বেড়ে যাবে।’ তিনি রেলের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ডের একটি স্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘সড়কপথে সরকার শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে রাস্তা নির্মাণ করছে, আর ব্যবসা করছে বেসরকারি বাস-ট্রাক মালিকরা। রেলের ক্ষেত্রে একদিকে লুটপাটতন্ত্র কায়েম করা হচ্ছে, অন্যদিকে ভাড়া বাড়িয়ে তা যাত্রীদের কাঁধে চাপানো হচ্ছে।’

বাসদ নেতা রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে রেলকে সংকুচিত করা হয়েছে। সড়কপথ সম্প্রসারিত করা হয়েছে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণের জন্য রেলের ভাড়া বৃদ্ধি প্রত্যাহার করা উচিত।’

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ আবদুল হক বলেন, ‘আমাদের রেল যেন অবহেলার প্রতীক। হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে উন্নত বিশ্বের রেল ব্যবস্থার সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম হচ্ছে না। ভারত, জাপান খুব কম খরচে উন্নত রেলসেবা দিতে সক্ষম হলেও আমাদের দেশে এত বিনিয়োগের পরও তা সম্ভব হচ্ছে না।’

আরও পড়ুন