বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি: ঠাঁই পেলেন বিতর্কিতরা বাদ যোগ্য অনেকে

033529Pic-23সম্মেলনের প্রায় সাত মাস পর গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় নিয়ে এ কমিটি গঠন করা হলেও তাতে স্থান পেয়েছেন অনেক অপরাধী ও বিভিন্ন সময়ে সংগঠন থেকে বহিষ্কৃতরাও। ইয়াবা ব্যবসা, অপহরণ, হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে—এমন অনেক নেতাও রয়েছেন কমিটিতে। ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় সংগঠনে নিষ্ক্রিয় অনেক নেতা পদ পেয়েছেন, আবার বিরাগভাজন হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় আছেন এমন অনেক নেতা বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। চাকরিতে যোগ দিলে কমিটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে—এমন লিখিত ঘোষণা দিয়ে পাঁচ সাংবাদিককে পদে রাখা হয়েছে। অনেক অছাত্রও ঠাঁই পেয়েছেন কমিটিতে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়ার কথা ২৫১ সদস্যের। তবে এবার কেন্দ্রীয়

কমিটি গঠন করা হয়েছে ৩০১ সদস্যের। এ কমিটিতে সহসভাপতি পদে রাখা হয়েছে ৬১ জনকে, আর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাখা হয়েছে ১১ জন করে। এ ছাড়া ১১১ জন উপসম্পাদক, ৪৬ জন সহসম্পাদক রাখা হয়েছে। বাকি ২৭ জন সদস্য রাখা হবে বলে জানা গেছে।

কমিটি ঘোষণার পর খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিহ্নিত অপরাধী ও মাদক ব্যবসায় জড়িত অনেক নেতা পদ পেয়েছেন। যদিও এর আগে বিভিন্ন সময় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরাধে যুক্তদের পদ দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছিলেন। আনোয়ার হোসেন আনু পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহসভাপতি পদ পেয়েছেন। তিনি সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক। এর আগে ছিলেন সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সাধারণ সম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে সলিমুল্লাহ হলের আশপাশ এলাকায় মাদক ব্যবসা ও জুনিয়রদের দিয়ে ছিনতাই করানোর অভিযোগ রয়েছে।

আশিকুল পাঠান সেতুকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক কর্মসূচি ও পরিকল্পনাবিষয়ক সম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে গত বছর ক্যাম্পাসে প্রাইভেট কারচাপা দিয়ে এক রিকশাচালককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চাঁদাবাজি ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সাকিব হাসান সুইমকে সহসভাপতি করা হয়েছে। তিনি ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। চাঁদা ও আধিপত্যের জেরে ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কলেজে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান ফারুক মারা যান। সুইম এ হত্যা মামলার অন্যতম আসামি। এই ঘটনার পরই তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। ঢাকা কলেজ ও আশপাশের এলকায় তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে চাঁদাবাজির অভিযোগও।

সৃজন ঘোষ সজিবকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপ-ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় ২০১৪ সালে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় তাঁকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এর পরও তিনি পদ পেয়েছেন।

কাজী এনায়েতকে সহসভাপতি করা হয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক। শাহবাগের ফুলের দোকানে চাঁদাবাজি ও শিক্ষা ভবনের টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের সাবেক সভাপতি আমিনুল ইসলাম বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি হয়েছেন। নানা অপরাধে জড়িয়ে ছাত্রজীবন শেষ করতে পারেননি তিনি।

নিশীতা ইকবাল নদীকে সহসভাপতি করা হয়েছে। তিনি শামসুন নাহার হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ইয়াবা ব্যবসার। প্রতিবাদ করায় চারুকলা অনুষদের এক ছাত্রীকে মারধর করে হল থেকে বের করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে নদীর বিরুদ্ধে।

মেহেদী হাসান পেয়েছেন সহসভাপতি পদ। তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ইয়াবা ব্যবসার। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ইয়াবা চালানের সময় আটককৃতরা জবানবন্দিতে মেহেদীর নাম বলেছিল।

বি এম এহতেশাম হয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি কবি জসীমউদ্দীন হলের সাধারণ সম্পাদক। দর্শন বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। ঠিকমতো শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ না নেওয়ায় তিনি ছাত্রত্ব হারিয়েছেন।

আব্দুল বাসেত গালীব হয়েছেন সহসভাপতি। তিনি গত কমিটির উপসম্পাদক ছিলেন। কয়েক মাস আগে ঢাকা কলেজে পুলিশের অভিযানে গুলিসহ আটক হয়েছিলেন তিনি। কিছুদিন জেলও খাটেন।

এ ছাড়া সহসভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদক পদ পাওয়া আরো অনেকেই ইতিমধ্যে ছাত্রত্ব হারিয়েছেন।

পাঁচ সাংবাদিককে কমিটিতে স্থান : ঘোষিত কমিটির শেষ পৃষ্ঠায় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের স্বাক্ষরের ঠিক আগে বিশেষ দ্রষ্টব্য দিয়ে লেখা রয়েছে, ‘উপরিউক্ত কমিটিতে কেউ ব্যবসা বা চাকুরিতে যোগদান করিলে তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতি দেওয়া হবে।’ কিন্তু এ কমিটিতেই স্থান পেয়েছেন পাঁচ সাংবাদিক। তাঁদের চারজনকে সহসম্পাদক ও একজনকে উপসম্পাদক পদ দেওয়া হয়েছে। এঁদের মধ্যে দুজন দুটি জাতীয় দৈনিকের নিজস্ব প্রতিবেদক। পাঁচজনের মধ্যে একজন কেবল ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে আগে থেকেই যুক্ত। অন্যরা ছাত্রলীগের কোনো কর্মসূচিতে কখনো অংশ নেননি।

একপাক্ষিক কমিটির অভিযোগ : গত বছরের সম্মেলনে আলোচিত প্রার্থী ছিলেন সাবেক কমিটির ১ নম্বর যুগ্ম সম্পাদক শামসুল কবির রাহাত। তিনি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপনের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু বয়সের মারপ্যাঁচে সম্মেলনের আগে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এবারের কমিটিতেও রাহাত ও রিপনের অনুসারী কাউকেই পদ দেওয়া হয়নি।

আগের কমিটিতে ছিলেন, কিন্তু এবার বাদ পড়েছেন এমন নেতারা হলেন সাবেক কমিটির স্কুলবিষয়ক সম্পাদক হাসানুল হক বান্না, আইনবিষয়ক উপসম্পাদক পলাশ আহমেদ, বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম সম্পাদক এইচ এম সাদ্দাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক সম্পাদক শামস ই নোমান, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের সভাপতি আবু সালমান প্রধান শাওন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সভাপতি মেহেদী হাসান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসম্পাদক বিপুল, রাকিক আহমেদ ও সদস্য মাহবুব খান।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের মোবাইলে ফোন করা হলেও তাঁরা কেউ ফোন ধরেননি।

আরও পড়ুন