শুধু স্বৈরশাসন ও আন্দোলন দমন-পীড়নের জন্য নয়, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আশির দশক থেকে এখনও আলোচিত-সমালোচিত একাধিক নারীর সঙ্গে তার প্রেম ও জটিল সম্পর্কের কারণে। তবে সদ্য প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘আমার জীবন আমার কর্মে’ তাদের কারও কথাই লেখেননি তিনি। বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মপদ্ধতি ও দলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চললেও স্ত্রী রওশন এরশাদের প্রতি ভালোবাসার কথাই ঘুরেফিরে এসেছে তার এ আত্মজীবনীর পাতায় পাতায়। এ গ্রন্থে সাবেক স্ত্রী বিদিশার নাম একবারও লেখা হয়নি। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত সংবাদে উঠে আসা বিদিশা, জিনাত মোশাররফ, মেরিদের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কথা আত্মজীবনীতে এরশাদ গোপন রেখেছেন নিপুণতার সঙ্গে। তবে অকপটে স্বীকার করেছেন তার জীবনের প্রথম প্রেম ও প্রেমিকার কথা। তবে প্রথম এই প্রেমিকার নাম জানাননি তিনি। আত্মজীবনীতে ‘সেই চিঠি :ভালো লাগার প্রথম অনুভূতি’ অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন তার প্রথম প্রেমের কথা। জানিয়েছেন, ওই সময় রংপুরের কারমাইকেল কলেজে বিএ শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি। তার নিজের ভাষায়, ‘আমার নীচের ক্লাশের একটি মেয়ে একদিন আমাকে একটি চিঠি লেখে। প্রতিদিন ও ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে কলেজে আসতো’ (পৃষ্ঠা :৬৫)।
আবেগঘন ভাষায় এরশাদ জানিয়েছেন, প্রায় ৬৬ বছর আগের সেই সময়ে ছেলেমেয়ের মধ্যে কথা বলার রেওয়াজ ছিল না। চিঠির আদান-প্রদান ছিল অনেক দূরের ব্যাপার। বই দেওয়া-নেওয়া চলত। এরশাদের প্রথম প্রেমিকা চিঠিটি বইয়ের মধ্যে লুকিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ খামে করে দেওয়া চিঠির ভাঁজে ভাঁজে ছড়ানো ছিল গোলাপের পাপড়ি ও বকুল ফুল। এরশাদ লিখেছেন, ‘তরুণ বয়েসে কোন মেয়ের কাছ থেকে চিঠি পেলে হৃদয়ে যে কী রকম অনুভূতি ঢেউ খেলে যেতে পারে, তা কেবল ওই সৌভাগ্যের মুহূর্তটি যাদের জীবনে এসেছে, তারাই অনুভব করতে পারেন, অন্যেরা নয়’ (পৃষ্ঠা :৬৫)।
প্রথম প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চাইলেও পারেননি এরশাদ। সে সময় ছাত্র ও বেকার হওয়ায় এরশাদকে বিয়ে করতে সেই তরুণী রাজি হননি। আত্মজীবনীতে নাম উল্লেখ না করা সেই তরুণী সম্পর্কে তিনি আরও জানিয়েছেন, কলেজের শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার ২০ বছর পর ১৯৭০ সালে বগুড়ায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করার সময় অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্যভাবে তাদের দু’জনের দেখা হয়। ততদিনে ওই নারী বিবাহিত ও গৃহিণী।
১৯৫৫ সালে পারিবারিক পছন্দে গাইবান্ধার এসডিও খান সাহেব উমেদ আলীর বড় মেয়ে রওশনকে বিয়ে করেন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট এরশাদ। বিয়ের পর প্রায় এক বছর বাবার বাড়িতেই ছিলেন তার স্ত্রী। এ সময়টাকে জীবনের ‘সবচেয়ে বিরহের সময়’ বলেছেন এরশাদ। স্ত্রী রওশনকে প্রতিদিন একটি চিঠি লিখতেন তিনি প্রেমময় সম্বোধনে। আত্মজীবনীতে এ সম্পর্কে লিখেছেন তিনি, ‘সেইসব দিনের কথা মনে করে নিজেকে এখন অপরিচিত মনে হয়।’
নয় বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সময় এরশাদকে ঘিরে অনেক নারীর নামই শোনা গেছে। তার শাসনামলের অবসান ঘটলে ছয় বছর জেলে ছিলেন তিনি। ১৯৯৭ সালের ৮ জানুয়ারি জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর জিনাত মোশাররফের সঙ্গে তার ‘প্রেম’ ছিল সর্বস্তরে আলোচনার বিষয়। জিনাত তখন জাতীয় পার্টির এমপি ছিলেন। এর আগে ছিলেন জাতীয় মহিলা পার্টির সভানেত্রী। সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর স্ত্রী জিনাত নামও পরিবর্তন করেছিলেন। এরশাদের সঙ্গে মিলিয়ে ‘জিনাত হুসেইন’ নাম ব্যবহার করতেন তিনি। স্বামীর সঙ্গেও বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তার। ওই সময় জিনাতের সঙ্গে সম্পর্কের কথা খোলাখুলি স্বীকার করলেও আত্মজীবনীতে এ নিয়ে একটি শব্দও লেখেননি এরশাদ।
দ্বিতীয় স্ত্রী বিদিশার সম্পর্কে একটি শব্দও নেই এরশাদের এই আত্মজীবনীতে। ২০০০ সালে এরশাদ আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেন, প্রায় দুই বছর আগে বিদিশা নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেছেন তিনি। তাদের এরিক এরশাদ নামে একটি ছেলে আছে। পুত্রের প্রথম জন্মদিনে বিয়ের কথা প্রকাশ্যে আনেন তিনি। বিদিশার সঙ্গে এই বিয়ের পর থেকেই গত ১৮ বছর রওশন ও এরশাদ পৃথক বাসায় থাকেন।
বিদিশাকেও রাজনীতিতে এনেছিলেন এরশাদ। ২০০৪ সালে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। চুরির মামলা দিয়ে তিনি বিদিশাকে জেলেও পাঠিয়েছিলেন। এরশাদ-বিদিশার বিচ্ছেদ ছিল দেশজুড়ে তখন আলোচনা-সমালোচনার বিষয়। কিন্তু আত্মজীবনীতে এসব ঘটনার কিছুই যুক্ত করেননি এরশাদ। বিদিশার নাম উল্লেখ না করে এক স্থানে তিনি অবশ্য লিখেছেন, ‘আমার জীবনেও ওই বেদনাদায়ক ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার পর রওশন একটি বাক্যও উচ্চারণ করেনি কিংবা আমার কাছে কোনো কৈফিয়তও চায়নি’ (পৃষ্ঠা :৭০)।
আছে প্রথম প্রেমের কথা, নেই অন্য কোনো নারী
যে কোনো সংবাদ জানতে আমাদের ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন।


