ইশরাত জাহান অরনি (১৪) ও তার ভাই আলভি আমিনের (৬) মৃত্যুর পর মর্গে লাশ রেখে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছেন তাদের বাবা-মা। বাবার নাম আমানুল্লা মালেক ও মায়ের নাম মাহফুজা মালেক। আমানুল্লা উত্তর বাড্ডার একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। তাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের আমলাপাড়া নতুন স্কুলের পাশে।
মঙ্গলবার দুপুরের পর কোনো একসময় তারা সন্তানদের লাশ রেখেই পালিয়ে যান। বর্তমানে মৃত ভাই-বোনের লাশ ঢামেক হাসপাতাল মর্গে আছে।
এর আগে মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় মামাতো ভাই ওবায়দুলের কাছে চাবি দিয়ে নিজ বাসা ছেড়ে যান ওই দম্পতি। যাওয়ার সময় তারা ওবায়দুলকে জানান, ‘আমরা মেডিকেলে যাচ্ছি। মেডিকেল থেকে লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি যাবো।’
গতকাল সোমবার বিকেল ৩টায় বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির ৫ তলা বাসায় অরনি-আলভির অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা ঘটে।
মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় গৃহশিক্ষিকা শিউলি আক্তার বনশ্রীর বাসায় তাদের পড়াতে গিয়ে জানতে পারেন- অরনি-আলভির মৃত্যু হয়েছে।
শিক্ষিকা শিউলি আক্তার বলেন, ‘আমি যখন বাসায় আসি তখন ৩টা বাজে। আমি প্রতিদিনিই একই সময়ে পড়াতে আসি। আজকেও যথাসময়ে এসে দেখি- বাসায় কেউ নেই। শুনলাম অরনি-আলভি মারা গেছে।’
এর আগে সোমবার বিকেল ৩টায় ওই শিক্ষিকা বাসায় গিয়ে দেখেন- নুসরাত ও আলভি আমান টিভি রিমোর্ট নিয়ে টানাটানি করছে। তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ ছিলো না। প্রতিদিন তারা পড়ানোর আগেই দুপুরের খাবার খায়। গত ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে আমি ওদের পড়াই। ওরা খুবই শান্ত প্রকৃতির ছিলো।’
তবে সোমবার শিক্ষিকা বাসায় পড়াতে গেলে মাহফুজা মালেক শিক্ষিকাকে বলেন, ‘গতকাল (রবিবার) আমার মেরেজ ডে ছিল। এরা পড়া তৈরি করতে পারেনি। কিছু বলবেন না। আর ওদের প্রতি আরেকটু যত্নশীল হোন।’
শিক্ষিকা বিকাল সোয়া ৪টার দিকে তিনি বাসা ছেড়ে বের হন। শিক্ষিকা বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে সেখানে এক মহিলাকে নামাজ পড়তে দেখেছি। কিন্তু আমি তাকে চিনি না।’
সাভারের বালিয়াপুরে একটি গার্মেন্টেসে কাজ করা মাফুজের ফুফাতো ভাই ওবায়দুল বলেন, ‘আমি খবর পেয়ে রাত ৩টায় আমার ফুফাতো বোন বনশ্রীর বাসায় যাই। আজ দুপুর ১২টায় আমার কাছে বাসার চাবি দিয়ে বোন ও বোনের জামাই বাসা থেকে বের হন। পড়ে আর তারা বাসায় ফিরেনি।’
এদিকে বাসার নিরাপত্তারক্ষী মো. পিন্টু বলেন, ‘আমি এখানে সিকিউরিটি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কোনো ধরনের হইচই বা মারামারির শব্দ টের পাইনি।’ পিন্টুর মতো একই কথা জানালেন বাড়ির মালিক আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিত শিক্ষক মো. আব্দুল কাদের।
আব্দুল কাদের জানান, ‘গতবছরের ১ আগস্ট থেকে ১৯ হাজার টাকায় ওই দম্পতির কাছে বাসা ভাড়া দেয়া হয়। তবে এর মধ্যে তাদের পরিবারে কোনোরকম হইহুল্লোড় বা মারামারির ঘটনা ঘটতে দেখিনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি যে স্কুলে শিক্ষকতা করি সেই স্কুলেরই আরেকজন শিক্ষক শফিকুল ইসলাম ছিলো আমানুল্লা মালেকের বন্ধু। তার পরিচয়েই বাসাটি ভাড়া দেই।’
এদিকে স্থানীয়রা বলছেন, ‘পরিবার বলছে রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে দুই সন্তান মারা গেছে। কিন্তু রেস্টেুরের্টের খাবার খেয়ে মারা গেলেও বাবা-মায়ের মধ্যে সন্তানদের মৃত্যুতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তাদের মধ্যে কোনো সন্তান হারানোর কোনো আহাজারি দেখা যাচ্ছে না। এখানে কোনো একটা রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে।’
এ ব্যাপারে ফরেন্সিক বিভাগের প্রভাষক প্রদীপ বিশ্বাস বলেন, ‘মৃত ভাই-বোনের চোখ ছিলো রক্তবর্ণ। মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত ছিলো। এছাড়া দুজনই জ্বিহবা কামড়ে ধরা অবস্থায় ছিলো। বিষয়টির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চত হওয়া যাবে।’
মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার ডিসি আনোয়ার হোসেন জানান, ‘ঢাকা মেডিকেল ও মৃতের পরিবারের বক্তব্য গুরুত্বের সাথে নেয়া হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে। এ ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। মামলা হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
অপরদিকে, ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এস র্যাব-৩ এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএসপি মোস্তাক আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, ‘ঘটনার সঙ্গে বক্তব্যের যথেষ্ট অমিল রয়েছে। আমরা অনেকগুলো কারণ গুরুত্বের সাথে নিয়ে ঘটনাটি তদন্ত করছি।’
এদিকে সূত্র জানায়, ‘সিকিউরিটি গার্ড পিন্টু এবং শিক্ষিকা শিউলি ও নাম না জানা অপর একজনসহ মোট তিনজন এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
এর আগে রামপুরা থানা পুলিশ পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে ক্যাম্প চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনজনকে থানায় নিয়ে যায়।
ছোট্ট আলভি হলিক্রিসেন্ট নামে একটি ইংলিশ মিডিয়ামে নার্সারি শ্রেণিতে গোলাপ শাখার ৬ নম্বর রোলধারী ছাত্র ছিলো। আলভি সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ বলেন, ‘গতকাল সোমবার ছেলেটা (আলভি) যথারীতি স্কুল করলো। সে প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক ছিলো। কোনো ধরনের মন খারাপের লক্ষণ তার মধ্যে দেখা যায়নি। গতবছরের জানুয়ারিতে এই স্কুলে প্লেতে ভর্তি হয়েছিলো সে। প্লে পাস করে এবার নার্সারিতে ভর্তি হয় আলভি।’ এসময় শিক্ষক-শিক্ষিকাবৃন্দ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
এদিকে স্কুলটির সামনে আলভির মৃত্যুতে শোকবার্তা জানিয়ে ইতোমধ্যে একটি ব্যানার টানিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কয়েকবার চেষ্টা করেও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া অরনির স্কুলের কোনো শিক্ষক-শিক্ষিকার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। বাংলামেইল


