বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি: হ্যাকিং নয় জালিয়াতি

usa-fed_ny_bangladesh_6570সার্ভার হ্যাক নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের টাকা চুরি করা হয়েছে জালিয়াতির মাধ্যমে। এমন ধারণা এখন ক্রমেই তথ্যপ্রমাণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ছায়াতদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন যুগান্তরকে জানিয়েছেন, একটু অপেক্ষা করুন। শিগগির সব জানতে পারবেন। প্রযুক্তিগত গোপন তথ্য বেশিক্ষণ গোপন রাখা যায় না। আর প্রযুক্তি অপব্যবহার করে যেসব অপরাধ সংগঠিত হয় তাও ধরা হয় প্রযুক্তির মাধ্যমেই। এটিই সারা বিশ্বে স্বীকৃত উপায়। তারাও সেই পথে এগোচ্ছেন। তবে এ বিষয়টি নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের স্বাধীনভাবে করার সুযোগ দিতে হবে। কেননা অনেক সময় দেখা যায়, তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়। তারা বলেন, বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। তাই কোনোভাবেই যেন প্রভাবশালী মহলের তদবিরে তদন্ত বাধাগ্রস্ত না হয় সেদিকটিও নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য উদ্ধার করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৪ কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবার গোপনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও তাদের রুমে ডেকে কথা বলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। কারণ রিজার্ভ থেকে টাকা স্থানান্তরের ব্যাপারে ৫টি মেসেজ আসার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘যারা এ কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের নাড়িনক্ষত্র সবই জানতেন।’ সঙ্গত কারণে এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারও না কারও সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি এক রকম নিশ্চিত।
তবে বৃহস্পতিবারও এ অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘মেসেজ আসার পর আমরা কনফারমেশন দেয়ার আগেই টাকা পেমেন্ট হয়ে গেছে। এর বাইরে আর কিছু বলতে চাই না।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হলেই বোঝা যাবে কী ঘটেছিল।
অন্যদিকে অর্থ চুরির ঘটনায় চিহ্নিত ৬ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ। ছয় মাসের জন্য এদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তবে এখনও এদের গ্রেফতার করা হয়নি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারের সব ডাটা তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ফরেনসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছেন। এসব ডাটার একটি কপি র‌্যাবের কাছেও পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি সেক্টর ও গোয়েন্দা ইউনিটের একটি প্রতিনিধি দল র‌্যাবের কাছে ডাটাগুলো সরবরাহ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, র‌্যাবের অত্যাধুনিক ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড ফরেনসিক উইংয়ের তদন্ত অনুবিভাগ ও ফরেনসিক ল্যাব এসব ডাটা খতিয়ে দেখবে।
সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ৪ জন কর্মকর্তাকে বৃহস্পতিবার ব্যাপক জেরা করা হয়েছে। সূত্র বলছে, বাইরের হ্যাকার এ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত হলেও ব্যাংকের ভেতরের কারও না কারও সমর্থন বা সম্পৃক্ততা রয়েছে। আর সে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গতকাল পর্যন্ত তারা জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।
জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা শাখার একটি চৌকস দল কয়েকজনের ওপর কড়া নজরদারি করছেন। তাদের মধ্যে এ চারজন অন্যতম। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছে। সূত্রটি আরও জানায়, তদন্তের স্বার্থে তাদের কাছে প্রযুক্তিগত কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়।
এদিকে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্তে অনেক বিষয়কে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডাটাবেজ বা সার্ভার সম্পর্কে জানে এমন সব প্রতিষ্ঠানকেও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। হ্যাক হওয়ার ঘটনায় কোনো বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে কাজ করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিভাগের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ যুগান্তরকে বলেন, বিশ্বব্যাপী অর্থ স্থানান্তরের তথ্য আদান প্রদানে সুইফট (সোসাইটি ফর ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন্স) কোডের ব্যবহার আবশ্যক। এক্ষেত্রে হ্যাকাররা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরাপত্তা ভেদ করেও ঘটনা ঘটাতে পারে। কিন্তু এখানে সুইফটের যে পাসওয়ার্ড রয়েছে তা এক্ষেত্রে অবশ্যই তৃতীয় পক্ষের জানা ছিল। এভাবেই তথ্য জেনে হ্যাকারদের প্রবেশপথ সহজ করে দেয়া হয়। এখন পর্যন্ত এমন জোরাল ধারণাকে সামনে রেখে তদন্ত চলছে। এখন এই তৃতীয়পক্ষ দেশী না বিদেশী তা বেশিক্ষণ গোপন রাখা যাবে না। আর তৃতীয় পক্ষের সন্ধান নিশ্চিত হওয়া গেলে তার সাহায্যকারী কারা ছিলেন তাও দ্রুত বেরিয়ে আসবে।

এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র আরও জানায়, বাইরের হ্যাকাররা চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্তে অনেকগুলো বিষয় খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে ফিলিপাইন বা শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশী কারও সম্পৃক্ততা আছে কিনা গোয়েন্দাদের এসব খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিভিন্ন সময় যারা প্রশিক্ষণ, কর্মশালা বা সভা-সেমিনারে ফিলিপাইন এবং শ্রীলংকায় গিয়েছিলেন এদেরও একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। এ তালিকায় যারা আছেন তাদের ফিলিপাইন বা শ্রীলংকার কোনো কানেকশন আছে কিনা এসবও তদন্ত করা হচ্ছে। সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্টদের বলা হয়েছে, কারও ব্যাপারে ন্যূনতম সন্দেহ থাকলে তার ওপর কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

অপরদিকে সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভার হ্যাক হওয়ার বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

এখন কোন অ্যাডমিনের আইপিতে হ্যাকার প্রবেশ করেছিল সেটা অল্প সময়ের মধ্যেই জানা যাবে। তবে মনে রাখতে হবে, প্রতিটি এডমিন পরিচালনার দায়িত্বে কোনো না কোনো কর্মকর্তা ছিলেন। আর তাদের জানার বাইরে তথ্য হ্যাক হওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, কম্পিউটারের লগ ফাইল থেকে কীভাবে সব তথ্য গায়েব হয়েছে সে বিষয়টিও রহস্যজনক। তবে আশার কথা, গায়েব হওয়া তথ্য সার্ভার ও হার্ডডিস্কে পাওয়া যাবে। ফরেনসিক পরীক্ষায় তা পাওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুন