রাজধানীর বাসিন্দাদের তথ্য সংগ্রহ নিয়ে তালগোল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনে বাসিন্দাদের তথ্য সংগ্রহের এ উদ্যোগ নেয়া হলেও অনেকে তথ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ তথ্য দিলেও দিচ্ছেন ভয়ে ভয়ে। তবে পুলিশ বলছে, শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণের স্বার্থেই বাসিন্দাদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ তথ্য কোনোভাবেই অপব্যবহার হবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ব্যক্তিগত তথ্য প্রদানে পুলিশকে সহযোগিতার জন্য আইনেই বলা আছে। কিন্তু পুলিশের কিছু সদস্যের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে এই প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা হয়েছে। এছাড়া গত ৮ মার্চ এ বিষয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট দাখিল হয়েছে। তাই অনেকেই বিষয়টিতে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
আগামী ১৫ই মার্চের মধ্যে নাগরিকদের তথ্য দেয়ার কাজ শেষ করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। গত ৮ই মার্চ মহানগর পুলিশের এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনজীবী জ্যোর্তিময় বড়ুয়া উচ্চ আদালতে একটি রিট মামলা দায়ের করেছেন। ফলে এখন পুলিশ ভাড়াটিয়া নিবন্ধন ফরম সংগ্রহের জোর চেষ্টা চালালেও নগরবাসী রিটের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে বিট পুলিশ সদস্যদের।
যদিও বিভিন্ন থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে- সময় ও প্রচারণার অভাব, এ সংক্রান্ত বাজেট অপ্রতুলতা, সাধারণের সচেতনতার অভাব ও কিছু পুলিশ সদস্যের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের ফলে অনেকেই পুলিশকে ব্যক্তিগত তথ্য দিতে আগ্রহী নন। অবশ্য পুলিশ কর্মকর্তারা তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিকে ইতিবাচক আখ্যায়িত করে জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফরম বিতরণ ও তা সংগ্রহে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। এখনও ফরম বিতরণ চলছে এবং তা সংগ্রহও চলছে নিয়মিতভাবে।
রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বেচ্ছায় পুলিশকে তথ্য দিচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৫ ভাগ নগরবাসী। তবে পুলিশ সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ফরম বিতরণ ও পূরণ করে তা সংগ্রহ করায় বেশির ভাগ নগরবাসী বাধ্য হয়ে ওই ফরম পূরণ করছেন। জমা দিচ্ছেন নিজের ছবি। তবে ফরমের ব্যক্তিগত তথ্যের ভুল ব্যবহারে হয়রানির শঙ্কাও কাজ করছে তাদের মধ্যে।
রাজধানীতে ৪৯টি থানা রয়েছে। প্রতি থানায় ২ থেকে ৯টি বিট রয়েছে। মোট বিট ২৮৭টি। একজন করে উপপরিদর্শক ওই বিটের নেতৃত্বে রয়েছেন। এই বিট প্রধানের মাধ্যমে গত নভেম্বর থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ ভাড়াটিয়া ও বাসা মালিকের তথ্য সংগ্রহে মাঠে নেমেছে।
নির্ধারিত ফরমে ভাড়াটিয়া ও বাসা মালিকের নাম, পিতার নাম, জন্ম তারিখ, বৈবাহিক অবস্থা, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, পেশা ও কর্মস্থলের ঠিকানা, ধর্ম, শিক্ষাগত যোগ্যতা, মুঠোফোন নম্বর, ই-মেইল আইডি, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা মেস সদস্যদের নাম-ঠিকানা, গৃহকর্মী, গাড়ি চালক, পূর্ববর্তী বাসা মালিকের নাম, ওই বাসা ছাড়ার কারণ ইত্যাদি ব্যক্তিগত ও অবস্থানগত তথ্য-উপাত্ত জানতে চাওয়া হয়। চাওয়া হয় ছবি।
কিন্তু রাজধানীবাসীর ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত চাওয়ায় প্রথম থেকেই মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে। প্রায় থানায় দুই তৃতীয়াংশের বেশি ফরম বিতরণ করা হলেও পূরণের পর সংগ্রহ হয়েছে অর্ধেক বা এর বেশি। এর মধ্যে অনেকেই ফরম নিয়েছেন বটে, তা পূরণ করে ফেরত দিয়ে আগ্রহী নয়। আবার কিছু কিছু বাসাবাড়িতে ফরমই পৌঁছেনি। এর মধ্যে যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তারা ফরম পূরণ করছে না। শুধু তাই নয়। অতীতে যাদের বিরুদ্ধে জিডি বা মামলা হয়েছে বা আটক, গ্রেপ্তার বা কোন কারণে থানা পর্যন্ত যেতে হয়েছিল তারা তা পূরণ করছে না। ঢাকায় বেড়াতে এসেছে বা নানা অজুহাতে এড়িয়ে যাচ্ছে। ভুল বা মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন ভাড়াটিয়া। অনেকে আবার ফরম জমা দিচ্ছেন না। এক্ষেত্রে পুলিশে কর্মরত বন্ধু-বান্ধবদের পরামর্শও নিচ্ছেন কেউ কেউ। এসব নানা করণে ফরমগুলোর প্রায় অর্ধেক এখনও সংগ্রহ করা হয়নি।
রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় গিয়ে দেখা যায়, ২৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের থানাটিতে আড়াই লাখের বেশি মানুষের বসবাস। ৬ টি বিটে ভাগ করে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ফরম বিতরণ হয়েছে। এর মধ্যে সংগ্রহ হয়েছে ৫৫ ভাগ ফরম। তার মধ্যে কেউ কেউ ফরম পূরণ করছে না। রিটের পর ফরম ফেরত দেয়ার প্রবাহ কমে গেছে। আমজাদ আলী নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, জনকল্যাণের উদ্দেশ্যে তথ্য সংগ্রহ করে তা বজায় রাখতে পারলে আপত্তি নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষ পুলিশের হাতে প্রায় সময় হয়রানির শিকার হওয়ার কারণে আস্থার সংকট রয়েছে। আতঙ্ক ও ভুল ব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে তথ্য দিতে চাইছে না। থানার পাশে তার বাসা হলেও এখনও কোন ফরম হাতে পৌঁছেনি বলেও জানান তিনি।
ধানমন্ডি থানার ৬ নম্বর বিটের নেতেৃত্বে রয়েছেন উপ পরিদর্শক এস এম খায়রুল বাশার বলেন, আসলে নিজ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফরম পূরণ করে জমা দিচ্ছেন মাত্র ২ থেকে ৩ ভাগ নগরবাসী। পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে পূরণ করিয়ে নেয়ায় অর্ধেক মানুষের কাছ থেকে তা আদায় করা যাচ্ছে। আর বাকি অন্তত চল্লিশ ভাগ মানুষের তথ্য দিতে অনিহা রয়েছে। তাদের একাধিকবার বলে বুঝিয়ে সম্মত করে ফরম পূরণ করতে হচ্ছে। অপরাধীরা নানা কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যের কাছেও পরামর্শ নিচ্ছে। রাজধানীর আরও একাধিক থানায় দেখায় দেখা গেছে প্রায় একই চিত্র।
ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নূরে আযম মিয়া বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা তথ্য দিতে চাচ্ছে না। আবার অনেক সচেতন ও হাইঅফিসিয়ালও তথ্য দিচ্ছে না।
১০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের তেজগাঁও থানা এলাকায় বসবাস করে ১ লাখ ৯৯ হাজার মানুষ। ৮টি বিটের মাধ্যমে অন্তত ৮০ ভাগ বাড়িতে ফরম বিতরণ হয়েছে এবং ৬০ ভাগ ফরম সংগ্রহ করা হয়েছে। মাদক, চুরি ও ছিনতাই প্রবণ এই থানারও অনেকটা একই চিত্র। অপরাধীরা যেমন তথ্য দিচ্ছে না। তেমনি ব্যক্তিগত তথ্য দিতে অনিহা প্রকাশ করছেন সাধারণ নগরবাসীরাও। তেজকুনি পাড়ার এক বাসার দারোয়ান আব্দুল কাদির বলেন, তিন মাসে আগে ফরম পূরণ করিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু এলাকায় যারা অপরাধ করছে তারা তো তা পূরণ করছে না। আবার এলাকায় কোন ঘটনা ঘটলেও যদি অপরাধীর পরিবর্তে আমাদের নামে মামলা হয় তখন তো বিপদে পড়ে যাবো।
মিরপুর জোনের মিরপুর, শাহআলী ও দারুসসালাম থানার অন্তর্ভুক্ত ওয়ার্ড ও মহল্লার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বেশ কজন ফ্ল্যাট মালিক ও ভাড়াটিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই এ সংক্রান্ত কোনো ফরম এখনও পাননি। আবার অনেকেই পুলিশকে ব্যক্তিগত কোনো তথ্য দিতে ইচ্ছুক নন। পুলিশকে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে বলে আশঙ্কা তাদের। তারা মনে করেন এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য মূলত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সেই অপরাধীরা পুলিশের সরবরাহ করা এসব কাগজে তাদের নাম, ঠিকানাসহ ব্যক্তিগত তথ্য কৌশলে এড়িয়ে গেছে বা যাচ্ছে। এতে করে অনেক অপরাধী, চিহ্নিত ও দাগী সন্ত্রাসী পুলিশের এ কার্যক্রমের আওতায় আসবে না।
একটি বহুজাতিক বিপণন কোম্পানিতে কর্মরত ও মিরপুর-১ নম্বর এলাকার বাসিন্দা নাজমুল হোসেন বলেন, আপাতদৃষ্টিতে এটি ভালো উদ্যোগ মনে হলেও ব্যক্তিগত তথ্য প্রদানের পর এর অপব্যহারের সুযোগ রয়েছে। তাছাড়া যে সব অপরাধীদের বিষয়টি চিন্তা করে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তারা কিন্তু ঠিকই বিষয়টি এড়িয়ে গেছে। মিরপুর কাজীপাড়া এলাকার বাসিন্দা ওষুধ ব্যসায়ী মো. মমিন মিয়া বলেন, ডিএমপির এ ধরনের উদ্যোগের কথা শুনেছি। কিন্তু ফ্ল্যাট মালিক বা পুলিশের তরফে কোনো কাগজ বা ফরম পাইনি।
মিরপুর মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মোহা. শাহজালাল আলম এ বিষয়ে বলেন, অনেকেই বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও কিছু বাসিন্দা তথ্য সংগ্রহের বিষয়টিকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তথ্য দিতে ভয় পাচ্ছেন তারা। আমরা এ বিষয়ে মাইকিংসহ প্রচারণার ব্যবস্থা করেছি। জনসাধারণকে বুঝিয়েছি যে, জনগণ ও পুলিশসহ সকলের স্বার্থেই এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে করে অপরাধ প্রবণতাও অনেকাংশে কমে যাবে। অনেকেই সাড়া দিলেও কেউ কেউ ব্যক্তিগত তথ্য পুলিশকে দিতে রাজি নন।
তিনি বলেন, এত বড় একটি আয়োজন অথচ বাজেট খুবই অপ্রতুল। এমনও দেখা গেছে ১০ জন নাগরিকের কোন বাসা বা ফ্ল্যাট মালিককে একটি ফরম দিয়ে বাকিদের জন্য ফটোকপি করে নেয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে, ৫টি ফরম সংগৃহীত হলেও বাকিগুলো আর আসছে না। তবে, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। দ্রুত কার্যক্রম শেষ করতে পারবো বলে আশা করি।


