বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে চুরি হওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি-না তা নিয়ে অনেকের মনে সংশয় থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক দৃঢ় আশাবাদী। ব্যাংক বলছে, ফিলিপাইনে নেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যাপারে তারা দৃঢ় আশাবাদী। তবে সময় একটু বেশি লাগতে পারে। কেননা অর্থ ফেরত আনতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানায়, সহজে এ টাকা ফেরত আনা যাবে না। মুদ্রা পাচার বিষয়ে ফিলিপাইনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা স্মারক রয়েছে। এ ছাড়া ফিলিপাইন আন্তরিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে সহযোগিতা করছে। তার পরও সময় বেশি লাগবে কেন_ জানতে চাইলে ওই সূত্র উদাহরণ দিয়ে জানায়, এর আগে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার পরও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে তিন বছরের বেশি সময় লেগেছিল। বাংলাদেশ ও ফিলিপাইনের আদালতের রায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে এলে অর্থ ফেরত পেতে তিন থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছর সময় লাগতে পারে বলে ওই সূত্র মনে করছে।
হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে আট কোটি ডলারের বেশি হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা কোম্পানি ফায়ারআইয়ের ম্যানডিয়েন্ট ফরেনসিক বিভাগের সহযোগিতা নিচ্ছে বাংলাদেশ। অর্থ ফেরতসহ অন্যান্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইরও সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, হ্যাকাররা একাধিক মাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে ঢুকেছিল। এ ধরনের তিনটি মাধ্যম চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে হ্যাকার গ্রুপকে দ্রুত চিহ্নিত করা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি প্রোগ্রামে (এসএআরপি) স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসারে ফিলিপাইনে যাওয়া প্রায় সাড়ে ৬শ’ কোটি টাকার সমপরিমাণ ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। এ জন্য বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন_ দু’দেশের চলমান তদন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা, এ তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক আদৌ অর্থ ফেরত পাবে কি-না বা কোন প্রক্রিয়ায় পাবে তা নির্ধারিত হবে। এর আগে ২০১২ ও ২০১৩ সালে তিন দফায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর সিঙ্গাপুরে পাচার করা প্রায় ২১ কোটি টাকা ফেরত আনা সম্ভব হয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, ফিলিপাইনের ব্যাংকিং রীতি ভঙ্গ করে হ্যাকারদের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তর করে দেশটির রিজাল ব্যাংকিং করপোরেশনের মাকাতি শাখা। ইতিমধ্যে সে সব অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার আদেশ দিয়েছেন ফিলিপাইনের আদালত। রিজার্ভ থেকে চুুরি হওয়া অর্থের লেনদেনের প্রক্রিয়া ও ওইদিন ব্যাংকটির সিসিটিভি বন্ধ থাকায় তাদের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে ওই ব্যাংককে দায়ী করেছে। অবশ্য ওই ব্যাংকে যাওয়া বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে বের হয়ে যাওয়ায় সরাসরি তা আর ব্যাংকিং সিস্টেমে আসবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফিলিপাইনের আইন অনুযায়ী সেখানকার কোনো ব্যাংক থেকে অনিয়ম করে বিদেশি অর্থ বের হয়ে গেলে সে দায় ওই ব্যাংককে নিতে হয়। এ কারণে দেরিতে হলেও পুরো অর্থ ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
হ্যাকাররা ফিলিপাইনে এসব হিসাব খোলে গত মে মাসে। হিসাবগুলো যথাযথ নিয়ম অনুযায়ী খোলা হয়নি। এসব হিসাবে চুরির অর্থ জমা হওয়ার আগ পর্যন্ত কোনো লেনদেনও হয়নি। আকস্মিক বড় অঙ্কের টাকা কীভাবে জমা হলো সেটা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যাচাই করেনি। আইনে ওই ব্যাংক দোষী সাব্যস্ত হলে তাদেরই ওই অর্থ ফেরত দিতে হবে।
জানা গেছে, পুরো তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো পর্যায়ে দায় পাওয়া না গেলে অর্থ ফেরত পেতে প্রথমে মামলা করতে হবে দেশের আদালতে। আর দায় পাওয়া গেলে তার সুরাহা হওয়ার পর আদালতে যেতে হবে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে শুনানি শেষে যে রায় হবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে তা পাঠানো হবে ফিলিপাইনের অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে। সেখান থেকে দেশটির আদালতে বিষয়টি উত্থাপনের পর দীর্ঘ শুনানি শেষে অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে কি-না সে বিষয়ে রায় হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে তিন থেকে ১২ বছর সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান গতকাল শুক্রবার সমকালকে বলেন, ‘চুরি হওয়া অর্থ আমরা ফেরত পাবই। তবে সব প্রক্রিয়া শেষ করে অর্থ ফেরত আনতে হয়তো কিছুটা সময় লাগবে।’ তিনি জানান, এর আগে বিশ্বব্যাংকের এসএআরপির স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করে আরাফাত রহমান কোকোর পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা সম্ভব হয়। এবারও একই প্রক্রিয়ায় অর্থ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা চলছে। এজন্য যে ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা দরকার তা করা হচ্ছে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, হ্যাকিং এখন বিশ্বব্যাপী আর্থিক খাতে বড় উদ্বেগের নাম। প্রায়ই বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও অন্যান্য অর্থ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্ক হ্যাক করে অর্থ চুরির সংবাদ মিলছে। গত দুই বছরে শুধু একটি সাইবার অপরাধী চক্র ৩০ দেশের ১০০ ব্যাংকের অন্তত ১০০ কোটি ডলার চুরি করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। রাশিয়া, চীন ও ইউক্রেনের হ্যাকারদের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ অত্যন্ত সুকৌশলে উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহার করে এ অপরাধ করেছে। তারা বিশ্বব্যাপী আন্তঃব্যাংক পরিশোধের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম ‘সুইফট’ নেটওয়ার্কে ঢুকেও অর্থ চুরি করছে। রাশিয়াভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ক্যাসপারস্কির সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে চুরি হওয়া এসব অর্থের কোনো টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে ওই প্রতিবেদনে কিছু বলা হয়নি।
হ্যাকাররা হঠাৎ করেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরি করেছে তেমন নয়। এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার নেটওয়ার্কের মূল সার্ভারে বিশেষ ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে সব তথ্য চুরির পর গত ৫ ফেব্রুয়ারি অর্থ চুরির অ্যাডভাইস দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্রক্রিয়ায় অ্যাডভাইস পাঠায় ঠিক একই প্রক্রিয়ায় এসব পেমেন্ট অর্ডার দেওয়া হয়। একের পর এক মোট ৩০টি অ্যাডভাইসের মধ্যে প্রথম পাঁচটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন হয়। যার মাধ্যমে ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয় হ্যাকাররা। এর মধ্যে শ্রীলংকায় যাওয়া দুই কোটি ডলার ফেরত আনা সম্ভব হয়েছে। একই দিন আরও প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ ৮৭ কোটি ডলারের অ্যাডভাইস পাঠানো হলেও তা আটকে দেয় ফেডারেল রিজার্ভ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ চুরির ঘটনা ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঘটলেও বিষয়টি জানাজানি হয় ৭ মার্চ একটি দৈনিক পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশের পর।


