বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জাসদ ছিল বঙ্গবন্ধু সরকার বিরোধী একটি মোর্চা

MOHIBUL_Dabluমহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহলম থেকে।

বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারী ১৯৭২ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মাতৃভূমিতে পা রেখে প্রথমেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সেনা সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। ভারত সরকার বঙ্গবন্ধুর এই দাবিকে সহজভাবে না নিলেও সদ্য স্বাধীন প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের অবনতি যাতে না হয় সেই লক্ষে তারা ততক্ষনাত বঙ্গবন্ধুর দাবি মেনে নিয়ে ভারতীয় সেনাদের বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এখান থেকেই মূলত শুরু হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের সাথে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের টানাপড়া। ভারত সরকার মনে করেছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকার চলবে তাদের পরামর্শে। কিন্তু পরিস্থিতি অন্য দিকে মোর নেওয়াতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারেরর সাথে হওয়া কিছু কিছু চুক্তির ভবিষ্যত নিয়ে ভারত সরকার চিন্তিত হয়ে পরে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনচেতা ভুমিকা তাদের নুতন করে ভাবিয়ে তুলে। শুরু হয় বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।

বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রের প্রথম পদক্ষেপ ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মধ্যে ভাঙ্গন। এবেপারে তাত্ত্বিক নেতা বলে পরিচিত সিরাজুল আলম খানকে বেবহার করা হয়। সিরাজুল আলম খানের সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর আগে থেকেই সম্পর্ক ভালো ছিল। এই সম্পর্ক গড়ে উঠে ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বি এল এফ গঠনকালে। বি এল এফ এর সম্পূর্ণ নাম বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স। তবে একে মুজিব বাহিনী বলেই সন্মোধন করা হতো। শেখ মনি , সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ ছিলেন এই বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। এই সিরাজুল আলম খানই ছিলেন ছাত্রলীগকে বিভক্ত করার মূল বুদ্ধিদাতা। তরুণ ছাত্র সমাজ তখন সিরাজুল আলম খানের আবিষ্কৃত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে উঠে। শুরু হয় ছাত্রলীগের মধ্যে নেতৃত্বের লড়াই। একপক্ষ নুর এ আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনের নেতৃত্বে মুজিববাদের আদর্শে ঢাকার সরওয়ার্দি উদ্যানে সন্মেলনের আয়জনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে করে প্রধান অতিথি। অন্যদিকে অপরপক্ষ আ স ম আব্দুর রব ও শাহজাহান সিরাজের নেতৃত্বে ঢাকার পল্টন ময়দানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান অতিথি করে সন্মেলনের আয়োজন করে। অর্থাত দুই পক্ষই বঙ্গবন্ধুকে প্রধান অতিথি করে। সিরাজুল আলম খানের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র আসলে বাস্তবে কিছুই ছিল না। তরুণ ছাত্র সমাজকে বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে কাছে টেনে আনার লক্ষই ছিল এর মূল উদ্দেস্য। বঙ্গবন্ধু সিরাজুল আলমের এই ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিলেন। তাকে এই সন্মেলনে প্রধান অতিথি করার উদ্দেশ ছিল ছাত্রলীগ কর্মীদের বুঝানো আমরা বঙ্গবন্ধু বিরোধী নই। আমরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চাই।

সমালোচকেরা বলেন ভারতের পরামর্শেই মূলত সিরাজুল আলম খান সেদিন ছাত্রলীগে ভাঙ্গন ধরিয়ে ছিলেন। আসল উদ্দেস্য ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি বিরোধী দল প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য প্রয়োজন তরুণ যুব সমাজ। এই তরুণ সমাজকে সাথে আনার লক্ষে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান তুলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু তাদের এই উদ্দেশ্য উপলব্ধি করে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত হওয়া সন্মেলনে যোগদান না করে সেদিন সরওয়ার্দি উদ্যানের সন্মেলনে যোগদান করেছিলেন। ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে আমি সেদিন সেই ঐতিহাসিক সন্মেলনে উপস্থিত ছিলাম। আমার এখনো মনে পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র, ছাত্রলীগ নেতা নুর এ আলম সিদ্দিকীর ভাষণের কথা। দুই হাত সামনে তুলে দেওয়া তার সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের কথা তিনি তুলে ধরেছিলেন। বাংলা ভাষায় তার এত শক্ত দখল ও মুজিববাদের আদর্শের বর্ণনা সেদিন আমার মত অসংখ তরুণ ছাত্রলীগ কর্মীদের মনে নুতন করে প্রাণ শক্তি জাগিয়ে তুলে। ছাত্রলীগের সেদিনের সন্মেলনে শেখ সহিদুল ইসলামকে সভাপতি করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়। এদিকে পুরাণ পল্টনে আ ফ ম মাহবুবুল হককে সভাপতি করে আরেকটি পৃথক ছাত্রলীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়। এখান থেকেই সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ সহ আরো অনেকে বঙ্গবন্ধু বিরোধী একটি নুতন রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার লক্ষে দ্রুত সাংগঠনিক কাজ শুরু করেন। ছাত্রলীগের এই ভাঙ্গনের প্রভাব পরবর্তিতে গিয়ে পরে সারা বাংলাদেশে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুই ছাত্রলীগের মধ্যে শুরু হয় দন্ধ।

পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন সিরাজুল আলম খান ভারতের পরামর্শে জাসদ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করলেও কৌশলে তিনি ভারত বিরোধী স্লোগানকে অস্ত্র হিসেবে বেবহার করেছিলেন। তার এই কৌশলের পেছনে উদ্দেস্য ছিল দুটি, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের সমর্থন আদায় ও সাথে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্টকে আসছে প্রতিষ্ঠিত দলের পক্ষে কাজে লাগানো। তার এই রাজনৈতিক লক্ষে তিনি সফল হয়েছিলেন বলা যেতে পারে। কারণ পরবর্তিতে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান দিয়ে তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠা করলে দলটি জনগনের কাছে খুব সহজেই গ্রহণযোগ্যতা পায়। এমনটিই চেয়েছিল ভারত। তাদের এই উদ্দেশের পেছনেও ছিল দুটো লক্ষ্য। প্রথমত বঙ্গবন্ধু সরকারের জনপ্রিয়তা কমে আসলে দ্বিতীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে পাকিস্থানপন্থী কোনো রাজনৈতিক দল যেন ক্ষমতায় না আসতে পারে। আসলে তা ভারতের জন্য হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে। দ্বিতীয়ত বঙ্গবন্ধু সরকারকে সবসময় একটা চাপ হুমকির মধ্যে রাখা।

জাসদ আসলে কোনো আদর্শিক রাজনৈতিক দল ছিল না ছিল ভারতের সহযোগিতায় ভারতপন্থী একটি মোর্চা। অথচ বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে কৌশলে ভারত বিরোধী বক্তব্য দিয়ে জাসদ রাজনীতির মাঠ গরম করে রেখেছিল। কারণ ঐসময় সরকার বিরোধী অন্য কোনো রাজনৈতিক দল জাসদের মত সংগঠিত হতে পারেনি। তাছাড়া বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতাকারী ও আওয়ামী লীগ বিরোধীরা এমন একটি দল পেয়ে বেপকভাবে সমর্থন দান করে। মেজর এম এ জলিল, মেজর জিয়াউদ্দিন, কর্নেল তাহের সহ সামরিক বাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত আরো অনেকে এই সময় জাসদে যোগদান করেন। তাহের জাসদে যোগদান করেন ৭২ সালের শেষের দিকে। পরবর্তিতে ১৯৭৪ বঙ্গবন্ধু সরকারকে উত্খাত করার লক্ষে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে গঠন করা হয় গণ বাহিনী। এই গণবাহিনীর হাতে ঐসময় আওয়ামী লীগ, যুব লীগ ও ছাত্র লীগের অনেক কর্মী ও নেতা নিহত হয়েছিলেন। এভাবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল ও গোপনে গণবাহিনী প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সারা দেশে ত্রাস সৃষ্টি করে।

পচাত্তরের ১৫ আগস্টের পরবর্তিতে জাসদের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ পায়। দলটি ধীরে ধীরে বিভক্ত হয়ে ছোটো হতে থাকে। নেতৃত্বের কোন্দলে মূল জাসদ থেকে জাসদ বাসদ সহ কয়েকটি দল সৃষ্টি হয়। এভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাসদের শক্তি আর ৭২-৭৫ মতো থাকেনি। যারা একসময় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান তুলে জাসদ প্রতিষ্ঠায় সম্মুখ ভাগে ছিলেন তাদের একজন গিয়ে ঢুকলেন বিএনপিতে। আরেকজন এরশাদের নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় সরকারের সময় হলেন মন্ত্রী। আরেকজন হলেন একটি ইসলামিক দলের নেতা। আর সেই তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খান নাকি ছিলেন এরশাদের বুদ্ধিদাতা? সুতরাং জাসদ এখন নাই বললেই চলে। এখন শুধু টুকরো টুকরো হয়ে নামের মাঝেই সীমাবদ্ধ আছে জাসদ। সম্প্রতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে বিরোধিতা করে আবার ভাঙ্গলো জাসদ। দলটি যে আসলেই কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এখন অক্ষরে অক্ষরে প্রমানিত হচ্ছে জনগনের কাছে জাসদের আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। ঠিকমত নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের সমর্থন ছাড়া জাসদ একটি আসনও পাবে না বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে একদিন জাসদ সোচ্চার ছিল আজ সেই আওয়ামী লীগের দয়ায় করছে রাজনীতি। ইতিমধ্যে অনেকেই জাসদ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগদানও করেছেন। সুতরাং জাসদকে এখন আর কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল হিসেবে গণ্য করা যায় না। তাদের আর সেই অবস্থা নেই। জাসদ আসলেই কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না ছিল ভারতের সহযোগিতায় বঙ্গবন্ধু সরকার বিরোধী একটি মোর্চা যার অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির পথে।

আরও পড়ুন